দ্বিতীয় দফা কঠোর বিধিনিষেধের শুরু

মহল্লায় চেনা জটলা, বাস ছাড়া সব চলেছে ঢাকায়

প্রথম দফা ‘সর্বাত্মক লকডাউনের’ আদলে আট দিনের কঠোর বিধিনিষেধের সময় শেষ হয়েছে গতকাল বুধবার। আজ বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয়েছে দ্বিতীয় দফায় সাত দিনের কঠোর বিধিনিষেধ। ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু প্রথম দফার শেষ দিনেই গতকাল অনেকটা ভেঙে পড়েছে স্বাস্থ্যবিধি। রাজধানীসহ সারা দেশে রাস্তায় ছিল ছুটির দিনের মতোই স্বাভাবিক পরিস্থিতি। রাস্তায় যানজটের ঘটনাও ঘটেছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঘনবসতির দেশ হিসেবে এবং দরিদ্র মানুষের কথা চিন্তা করলে এ কঠোর বিধিনিষেধ কষ্টকর হলেও ধৈর্য রাখতে হবে। কারণ দেশে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের বিকল্প কিছু নেই। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। অনেক দেশ মাসের পর মাস ‘লকডাউন’ দিয়েছে করোনার উচ্চ সংক্রমণ মোকাবিলায়।বিশেষজ্ঞরা বলেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় প্রথম দুই দফা সাত দিন ও দুদিনসহ মোট নয় দিনের শিথিল বিধিনিষেধ দেয় সরকার। কিন্তু তাতে সম্পূর্ণভাবে স্বাস্থ্যবিধি রক্ষা না হওয়া এবং এর ফলে সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা না কমায় কঠোর বিধিনিষেধের দিকে যায় সরকার। গত আট দিনের বিধিনিষেধের ফলে সংক্রমণের হার যেমন কমছে এবং মৃত্যুর গতিও কিছুটা নিচের দিকে। ফলে দেশের মানুষ যদি আর একটা সপ্তাহ ঘরে থাকে, খুব প্রয়োজন না হলে বের না হয় তাহলে আমরা দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারব। তারা পরবর্তী এক সপ্তাহ জনগণকে বিধিনিষেধ মানতে অনুরোধ জানান।

এর আগে গত ৫ এপ্রিল থেকে দুই দফা ‘শিথিল’ বিধিনিষেধ দেয় সরকার। কিন্তু তারপরও করোনার সংক্রমণ এবং মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় গত ১৪ এপ্রিল ‘লকডাউনের’ আদলে নতুন আট দিনের কঠোর বিধিনিষেধ দেয় সরকার।

জনস্বাস্থ্যবিদ ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা পুরোপুরি কার্যকর না বললেও ৫ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত দুই দফায় নয় দিনের ঢিলেঢালা বিধিনিষেধকে কিছুটা কার্যকর বলছেন। চলমান আট দিনের কঠোর বিধিনিষেধ বা ‘সর্বাত্মক লকডাউন’কে তারা সংক্রমণের গতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কার্যকর বলে মনে করছেন।

প্রথম দফার কঠোর বিধিনিষেধ জারির সময়ই করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সরকারের গঠিত জাতীয় কারিগরি উপদেষ্টা কমিটি ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা টানা ১৪ দিনের ‘লকডাউনের’ সুপারিশ করেছিলেন। সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি আমলে নিলেও বলা হয়েছে, পরিস্থিতি বুঝে সময় বাড়ানো হবে। তারপর পরিস্থিতি দেখে বিধিনিষেধ একবারে না তুলে ধাপে ধাপে শিথিল করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। আর যদি এ দফার পর ‘লকডাউন’ তুলে দেওয়া হয় তাহলে পরিস্থিতি আকার আগের অবস্থানে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করছেন তারা।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, ‘এখানে কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মানানো যায় না। আমি মনে করি, এবারের সাত দিন যদি কঠোরভাবে মানা হয় তাহলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আরও সুফল আসবে। আর মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করতে আরও বেশি ক্যাম্পেইন দরকার। ৫ এপ্রিল থেকে আন্তঃজেলা যোগাযোগ বন্ধ করার সুফলও আমরা পাচ্ছি। কিন্তু সেই ঢিলেঢালা লকডাউন যদি এখনো চলত তাহলে সংক্রমণের হার আরও বেশি হতো।’

করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ মারাত্মক আকার নেওয়ায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকার প্রথমে ৫ এপ্রিল থেকে সাত দিনের জন্য গণপরিবহন চলাচলসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ জারি করেছিল। পরে তা আরও দুদিন বাড়ানো হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় ১৪ থেকে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত আরও কঠোর বিধিনিষেধ দিয়ে ‘সর্বাত্মক লকডাউন’ শুরু হয়। বর্তমানে লকডাউনে সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিস, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। তবে বিমান, সমুদ্র, নৌ ও স্থলবন্দর এবং এ সংক্রান্ত অফিসগুলো এই নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে থাকবে। প্রথমে ব্যাংক বন্ধের ঘোষণা দিলেও পরে তা আবার খোলার সিদ্ধান্ত হয়। আর শিল্পকারখানাগুলো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চালু আছে। এরপর গত দ্বিতীয় দফায় বিধিনিষেধের আরও সাত দিন বাড়িয়ে গত সোমবার প্রজ্ঞাপন দেয় সরকার।

মহল্লায় চেনা জটলা, বাস ছাড়া সব চলেছে ঢাকায় : প্রথম দিকে কিছুটা ‘কড়াকড়ি’ থাকলেও করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ‘সর্বাত্মক লকডাউনের’ মধ্যে ঢাকার রাস্তাঘাটে মানুষ ও যানবাহনের চলাচল আরও বেড়েছে। অলি-গলিতে মানুষের জটলা যেমন বেড়েছে, তেমনি সড়কেও বেড়েছে ব্যক্তিগত ও ভাড়ায় চালিত যানবাহন। গতকাল বুধবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, একমাত্র বাস ছাড়া সবই চলছে ঢাকার রাস্তায়। তবে সরকারি নির্দেশনা মেনে বন্ধ রয়েছে শপিং মল-বিপণিবিতানগুলো। মহল্লা বা কাঁচাবাজারসংলগ্ন দোকানপাট ছাড়া বন্ধ রয়েছে অন্যান্য দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।

গতকাল মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, আসাদ গেট, কারওয়ান বাজার, বাংলামোটর, কাকরাইল, বিজয়নগর, রামপুরা, বাড্ডার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ঢাকায় সাধারণ মানুষের চলাচল বেড়েছে। অন্যান্য দিনের চেয়ে রাস্তায় যানবাহনের সংখ্যাও ছিল তুলনামূলক বেশি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পর্যবেক্ষণও ছিল শিথিল। কিছু কিছু চেকপোস্টে পুলিশ সদস্যদের অলস বসে থাকতে দেখা গেছে।

গত মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় ‘লকডাউনের’ সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। চলতি মাসে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা শতকের ঘর পার হলে চলমান ‘লকডাউনের’ মেয়াদ তৃতীয় দফায় আরও এক সপ্তাহ বাড়িয়ে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। লকডাউনে সার্বিক কার্যক্রম ও চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ১২ এপ্রিল প্রজ্ঞাপন দেয় সরকার। এ সময়ে কী করা যাবে এবং কী করা যাবে না, তা উল্লেখ করা হয়েছে প্রজ্ঞাপনে। ২২ থেকে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত সেই প্রজ্ঞাপনে দেওয়া ১৩ দফার বিধিনিষেধগুলোই কার্যকর থাকবে।

তবে গতকালের অবস্থা দেখে অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দ্বিতীয় দফার সাত দিনের লকডাউনে কী হবে তা নিয়ে। গতকাল গণপরিবহন না চললেও ব্যক্তিগত গাড়ি এবং মোটরসাইকেলের দখলে রাস্তাঘাট। আন্তঃজেলা বাস চলাচল বন্ধ থাকলেও অনেককেই দেখা যায় কাভার্ড ভ্যান বা মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহন ব্যবহার করে ঢাকা ছাড়তে।

যাত্রীরা বলছেন, যান চলাচল বন্ধ থাকলেও তারা ভেঙে ভেঙে গন্তব্যে পৌঁছাবেন। রিকশা, ভ্যান, প্রাইভেট কার এমনকি ছোট পিকআপ ভ্যানেও বাড়তি ভাড়ায় চলছে অনেকেই।

শুধু প্রাইভেট কার, রিকশা আর মোটরসাইকেলই নয়, রাস্তায় অবাধ চলাচল সাধারণ মানুষের। বের হওয়ার নানা অজুহাত তাদের। অনেকে আবার বিধিনিষেধ ও সংক্রমণ ভয় তুচ্ছ করে বেরিয়েছেন জীবিকার তাগিদে।

তাদের একজন বলেন, কত দিন আর বসে থাকা যায় বলেন। টানা ১৫ দিন বাসায়। আজকে বের হলাম। ঘরে খাবার শেষ, এখন আমরা কী করব, না খেয়ে মারা যাব। 

মোহাম্মদপুরে দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ইদানীং লোকজন অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে। অনেকেই বের হচ্ছে। চেকপোস্ট বসছে, অভিযান চালাচ্ছি। সবাই ইমার্জেন্সি জানাচ্ছে।

এদিকে নিষেধাজ্ঞা অমান্য, লাইসেন্স ব্যতীত ও লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করে ব্যবসা করা, মাস্ক না পরা এবং স্বাস্থ্যবিধি না মানায় ১৭ মামলায় ২৮ হাজার ২০০ টাকা জরিমানা আদায় করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ভ্রাম্যমাণ আদালত। বুধবার ডিএনসিসি এলাকার অঞ্চল-৩-এর ১৯ নম্বর ওয়ার্ডে বনানী ১১ নম্বর রোড এলাকায় ৫টি মামলায় ১০ হাজার ৩০০ টাকা, অঞ্চল-৯-এর ৪০ নম্বর ওয়ার্ডে ভাটারা, ছোলমাইদ, নয়ানগর উত্তর ও দক্ষিণ এলাকায় ৭টি মামলায় ৩ হাজার ৯০০ টাকা এবং অঞ্চল-১০-এর ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডে মধ্যপাড়া, মোল্লাপাড়া, উত্তরবাড্ডা এলাকায় ৫টি মামলায় ১৪ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়।