জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকাণ্ডের রায়ে যুক্তরাষ্ট্রের একজন পুলিশ কর্মকর্তা দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের রাজনীতিক, সুশীল সমাজের ব্যক্তিবর্গ এবং আইন বিশেষজ্ঞরা। এক প্রতিবেদন বিষয়টি জানায় বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাসিমা বেগম বলেন, এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। একটি ঐতিহাসিক রায়। আমরা একে স্বাগত জানাই। বর্ণবৈষম্য নিরসনে এটি একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেন, যৌক্তিক সময়ের মধ্যে বিচারটি হয়েছে। আমাদের যেমন ধারণা ছিল এখানে শুধুমাত্র জনগণের বা পাবলিক অপিনিয়নের চাপে আদালত বিচার করছে, তা কিন্তু নয়। যেভাবে ফ্লয়েডকে কাঁধের ওপর পা দিয়ে চেপে ধরা হয়েছে, এ কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে এবং বৈজ্ঞানিকভাবেও সেটা প্রমাণিত হয়েছে। এ কারণে জুরি এবং আদালত একই ভাষ্যে উপনীত হয়েছে। পুলিশ অফিসার দায়ী। সে নর হত্যা করেছে। এখানে ন্যায় বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলার কোনো বিন্দুমাত্র সুযোগ নাই। এতে বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ে।
তিনি বলেন, এখানে আমদের অনেক কিছু শেখার আছে। একটা হচ্ছে যে পুলিশ হলেই যে, যেনতেনভাবে একজন অপরাধীর সঙ্গে ব্যবহার করবে এবং সেটাকে সে দায়িত্বপালন করতে গিয়ে সরল বিশ্বাসে সে এমনটা করেছে বলে এর জন্য কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা গ্রহণযোগ্য নয়।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মানুষকে রক্ষার বদলে হত্যা করা রাষ্ট্রের এবং সমাজের জন্য দুর্ভাগ্যজনক ও লজ্জাজনক। আইনের শাসন ও জাত-পাত সমতার সমাজ প্রতিষ্ঠায় এই রায় যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে। শুধু আমেরিকায় নয়, গোটা পৃথিবীতে এটি শিক্ষণীয় রায় হিসেবে থাকবে। এত বিচার বিভাগ যে স্বাধীন এবং গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ সেই উদাহরণও সৃষ্টি হলো।
ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ বলেন, ফ্লয়েডের হত্যাকাণ্ড অত্যন্ত মর্মান্তিক। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর এ রকম শতশত হত্যাকাণ্ড ঘটে। সেগুলোর বিচার হয় না। ফ্লয়েডের হত্যাকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্রে শুধু নয় সারা বিশ্বকে নাড়া দিয়েছে। এই বিচার মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। শুধু জর্জ ফ্লয়েডের বিচার নয় এর পাশাপাশি অন্যান্য বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার হলে এটা প্রমাণ হবে যে যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকারের ক্ষেত্রে অনেক বেশি সচেতন।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. কাজী আকতার হামিদ বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও যে জবাবদিহি থাকা দরকার সেটিই এই রায়ের মাধ্যমে পাওয়া গেল। রায় শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই নয় পুরো বিশ্বের জন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরশেদ বলেন, জর্জ ফ্লয়েড হত্যার ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পীড়াদায়ক ছিল। এটি বিশ্বব্যাপী আলোচিত ঘটনা। এ ঘটনায় সেখানে বর্ণবাদের সুস্পষ্ট প্রকাশ। ঘটনাটি ঘটার পর বর্ণবাদ ও মানবাধিকার নিয়ে শঙ্কিত ছিলাম। রায়টি ঘোষণার পর স্বস্তি পাচ্ছি। যুক্তরাষ্ট্রের সরকার সেখানে বিদ্যমান বর্ণবাদ ও বৈষম্য নিরসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপে নিতে সম্প্রতি একটি কমিটি গঠন করে দিয়েছে, যেটি ইতিবাচক। তিনি বলেন, প্রত্যেক সোসাইটিতে খারাপ কার্যক্রম রয়েছে। তাই তা মোকাবিলা ও নিয়ন্ত্রণে সরকারগুলোকে সতর্ক থাকতে হবে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। এই রায় তারই প্রতিফলন।
মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনিয়াপোলিস শহরে গত বছরের ২৫ মে জর্জ ফ্লয়েডকে (৪৬) নয় মিনিট ২৯ সেকেন্ড ঘাড়ে হাঁটু চেপে ধরে হত্যা করেন শোভিন (৪৫)।
নির্মম এই হত্যাকাণ্ডের ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। একপর্যায়ে ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ শিরোনামে এ আন্দোলন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে যায়।