আর লকডাউন চায় না সরকার

জনগণকে মাস্ক পরিধানে বাধ্য করা ও স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণে অভ্যস্ত করে লকডাউন তুলে দিতে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় এখন থেকে লকডাউনের বিকল্প মাস্ক ও স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণে জনগণকে অভ্যস্ত করে সামনে এগোতে চান।

সরকারের একাধিক মন্ত্রী দেশ রূপান্তরকে বলেন, জনগণের চলাচলে মাস্ক পরিধান ও স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণে বিন্দু পরিমাণ ছাড় দেওয়া যাবে না। অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের আর্থিক দণ্ড দেওয়াসহ কঠিন কিছু বিধিবিধান আরোপ করা হবে। এ ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিশেষ যত্নশীল থাকার পরামর্শ দেওয়া হবে। মন্ত্রীরা আরও বলেন, নো মাস্ক, নো সার্ভিস এ স্লোগানকে কার্যকর করতে হবে। মাস্ক না পরে যদি কেউ সেবা দেন তাকে কীভাবে দণ্ডের আওতায় আনা যায় তা নিয়ে আলোচনা চলছে। মন্ত্রিসভার দুই সদস্য বলেন, লকডাউনের ব্যাপারে কারিগরি কমিটির ইতিবাচক পরামর্শ থাকলেও দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত রাখতে ও ব্যবসায়ী মহল, দরিদ্র, নিম্ন আয় এবং দিনমজুরদের জীবনের কথা মাথায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লকডাউন আর নয় বলে মনস্থির করেছেন। মন্ত্রিসভার সদস্যরা আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী একক সিদ্ধান্তে লকডাউনের ব্যাপারে নেতিবাচক অবস্থান নিয়েছেন। তবে শতভাগ মানুষের মুখে মাস্ক পরিধান নিশ্চিতকরণে কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। লকডাউনে জনজীবনে বিরূপ প্রভাব ফেলছে এবং তা উদ্বেগের ব্যাপার হতে শুরু করেছে মনে করে লকডাউন আর দীর্ঘ করতে রাজি নন প্রধানমন্ত্রী। তিনি মনে করেন, লকডাউন এখন মানুষও আর চায় না।

সরকারের নীতিনির্ধারক মহল মনে করেন, লকডাউন স্বাভাবিক চলাচলে জনগণের মধ্যে একধরনের প্যানিকও তৈরি করছে। মানুষের মনের জোর বৃদ্ধি করতে এবং করোনাভাইরাস মোকাবিলায় মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করার জন্যও লকডাউনের বিকল্প ব্যবস্থায় যেতে ইতিবাচক সিদ্ধান্তের দিকে যেতে হচ্ছে সরকারকে।

এ প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনাভাইরাস বৈশ্বিক মহামারী। বিশ্বের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদের মতে এর থেকে পরিত্রাণ পেতে অনির্দিষ্ট সময় আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু লকডাউন থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে অর্থনৈতিক ভিত্তি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়বে। তিনি বলেন, বিশ্বের সব দেশ ধীরে ধীরে এ ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে বিকল্প উপায় বের করতে হবে মহামারী মোকাবিলায়। কৃষিমন্ত্রী আরও বলেন, তাই বিকল্প পথ বেছে নেওয়ার অংশ হিসেবে জনগণকে মাস্ক পরতে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে। চলাচলে স্বাস্থ্যবিধি মানতে সচেতন করে তুলতে হবে। তিনি বলেন, জনগণ মাস্ক পরিধানে অভ্যস্ত হলে সিংহভাগ মানুষ করোনাভাইরাস আক্রান্ত হওয়া থেকে মুক্তি পাবে। তাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাস্ক পরিধান ও স্বাস্থ্যবিধি মানতে বাধ্যতামূলক করে লকডাউন পদ্ধতি থেকে বের হয়ে আসতে চান।

এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোও লকডাউনের বিকল্প উপায় খুঁজছে। করোনাভাইরাস মহামারী মোকাবিলা করতে লকডাউনই একমাত্র সমাধানÑ এখন আর কোনো দেশের সরকারপ্রধানরা মনে করেন না। মাস্ক পরিধান নিশ্চিত করে স্বাস্থ্যবিধি মানা বাধ্যতামূলক করে ব্যবসা-বাণিজ্য, উৎপাদন শিল্প, অফিস-আদালত সবকিছুই স্বাভাবিক করে দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, সরকার শতভাগ মানুষের মুখে মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করবে। এজন্য প্রচার-প্রচারণা, জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। নো মাস্ক, নো সার্ভিস এটি সর্বস্তরে কার্যকর করতে মনিটরিং ব্যবস্থা রাখা হবে। মাস্ক ছাড়া ব্যক্তিকে যিনি সার্ভিস দেবেন তিনিও অপরাধী হিসেবে গণ্য হবেন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, কিছু করণীয় নির্ধারণ চলছে। চূড়ান্ত হলে ২৮ এপ্রিলের আগেই তা প্রকাশ করা হবে।

তিনি বলেন, লকডাউন দীর্ঘ করার পরিকল্পনা নেই সরকারের। আওয়ামী লীগও সরকারের এ চিন্তাকে সমর্থন করছে। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবউল আলম হানিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনাভাইরাস মোকাবিলায় জনগণের সতর্ক ও সচেতনতার বিকল্প নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে মাস্ক পরিধান করে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করে সাধারণের চলাচল স্বাভাবিক করতে হবে। দেশের মানুষরা এখনো মাস্ক পরা ও স্বাস্থ্যবিধি মানতে সচেতন ও সতর্ক নয়। সরকারকে জনগণের মধ্যে সচেতনতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন হলে কঠোর কিছু বিধিবিধান আরোপ করতে হবে। দলগতভাবে আওয়ামী লীগ মনে করে লকডাউন ব্যবস্থা থেকে সরকারকে বের হয়ে আসতে হবে দেশের অর্থনৈতিক দিক চিন্তা করে। ব্যবসা-বাণিজ্য, দিনমজুর ও দরিদ্র এবং খেটে খাওয়া মানুষের জীবন-জীবিকার কথা চিন্তা করে। সব মানুষের ভ্যাকসিন গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। মানুষকে করোনাভাইরাসের সঙ্গে লড়াই করার মানসিকতা তৈরি করে স্বাভাবিক চলাচলে ফিরে আসতে হবে। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, শতভাগ মাস্ক পরিধান নিশ্চিত করার নির্দেশনা দিয়ে এবং এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করার মধ্য দিয়ে লকডাউন থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।