করোনা মহামারীর মধ্যে ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড ব্যবসার ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। জামানতবিহীন এই ঋণপণ্যের খেলাপি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় আগের মতো ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করছে না ব্যাংকগুলো। ফলে গত এক বছরে ক্রেডিট কার্ড ইস্যু প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে ব্যাংকগুলোর ইস্যু করা ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১৭ লাখ ১৪ হাজারে।
এর মধ্যে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশের ব্যাংকগুলো তাদের গ্রাহকদের নামে ১ লাখ ২৯ হাজার ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করে।
এর আগের এক বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ব্যাংকগুলো মোট ২ লাখ ২৮ হাজার ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করে।
অর্থাৎ এই এক বছরে ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করার হার প্রায় ৪৪ শতাংশ কমেছে।
করোনা মহামারীর সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির মধ্যে অনেকেই সময় মতো ক্রেডিট কার্ডের বিল পরিশোধ করতে পারেননি। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিষেধাজ্ঞা থাকায় এর জন্য কোনো ‘লেট পেমেন্ট ফি’ দিতে হয়নি গ্রাহকদের। দেরিতে বিল পরিশোধ করায় অতিরিক্ত সুদ গুনতে হয়েছে।
এ বিষয়ে শীর্ষস্থানীয় একটি ব্যাংকের কার্ডের প্রধান নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ক্রেডিট কার্ডের ব্যবসাই আসে দেরিতে পেমেন্ট করা বা গ্রাহক সময় মতো বিল পরিশোধ না করতে পারলে। কিন্তু করোনা মহামারীর মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে একের পর এক নির্দেশনা দেওয়া হয়, লেট পেমেন্ট ফি নেওয়া যাবে না, দ- সুদ নেওয়া যাবে না।’
এ কারণে অনেকের হাতে টাকা থাকলেও সময় মতো বিল পরিশোধ করেননি গ্রাহকরা। করোনা মহামারীর মধ্যে কার্ডের টাকা আদায় করাও কঠিন হয়ে পড়ে। এসব কারণে ক্রেডিট কার্ড ইস্যু কমে এসেছে বলে মনে করেন তিনি।
তবে আলোচ্য সময়ে ক্রেডিট কার্ডের লেনদেন সামান্য বেড়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহকরা মোট ২৪ লাখ ৮৪ হাজার বার লেনদেন করেছেন। টাকার অঙ্কে লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা।
২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ২২ লাখ ৮৭ হাজার বার লেনদেন হয় ক্রেডিট কার্ডে। লেনদেনকৃত অর্থের পরিমাণ ১ হাজার ২১৮ কোটি টাকা।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, করোনায় অনেক গ্রাহকের আয় কমেছে। এ কারণে হয়তো তাদের ক্রেডিট কার্ডের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়াতে হয়েছে। নইলে যেখানে ক্রেডিট কার্ড ইস্যু কমেছে, সেখানে লেনদেন বাড়ছে কী করে? যাদের হাতে কার্ড রয়েছে তারা আগের থেকে বেশি লেনদেন করছেন।’
গত বছরের এপ্রিল থেকে দেশের ব্যাংক খাতের সব ধরনের ঋণের সুদহার ৯ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা হলেও ক্রেডিট কার্ডকে এর বাইরে রাখা হয়েছে।
বর্তমানে দেশের ব্যাংকগুলো ১৪ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত সুদ নিচ্ছে ক্রেডিট কার্ডে। এর মধ্যে বেশির ভাগ ব্যাংকেরই ক্রেডিট কার্ডের সুদের হার ২০ শতাংশ।
ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ক্রেডিট কার্ডের খেলাপির হার তুলনামূলক অনেক বেশি। তাছাড়া এ ধরনের কার্ডের ব্যবসা পরিচালনার পেছনে ব্যাংকের খরচ অনেক বেশি করতে হয়। এ কারণে ক্রেডিট কার্ডের ঋণের সুদহার একটু বেশি।
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘কেবল বাংলাদেশেই নয়, সারা বিশ্বেই ক্রেডিট কার্ডের সুদের হার বেশি। এটা একটি লাইফস্টাইল প্রোডাক্ট। তাছাড়া নগদ টাকার ব্যবহার কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ক্রেডিট কার্ডের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে।’