সীমান্ত ১৪ দিন বন্ধ

প্রতিবেশী দেশ ভারতে করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নেওয়ায় দেশটির সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। আজ সোমবার থেকে স্থলপথে চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। এই ঘোষণা ১৪ দিনের জন্য বলবৎ থাকবে। এর আগে থেকেই দেশটির সঙ্গে আকাশপথে চলাচল বন্ধ হয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন গতকাল রবিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে স্থলপথে আগামীকাল (আজ) থেকে যাত্রী চলাচল ১৪ দিন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আমরা যাত্রী চলাচল আপাতত বন্ধ রাখছি। তবে দুই দেশের মধ্যে পণ্য বাণিজ্য অব্যাহত থাকবে।’ করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার পর ১৪ এপ্রিল থেকেই ভারতের সঙ্গে আকাশপথে যাত্রী চলাচল বন্ধ রয়েছে বলে জানান তিনি।

গতকাল সরকারের উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে ভারতের সঙ্গে সীমান্ত ১৪ দিন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠক সূত্র জানায়, ভারতের নতুন  ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং কভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সুপারিশ নিয়ে বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সীমান্তে কড়াকড়ি রেখে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়, সীমান্ত খোলা থাকলে দ্রুত ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ঢুকে পড়তে পারে। তাদের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ঢুকলে পরিস্থিতি খারাপ হবে। স্বাস্থ্য খাত চরম ঝুঁকিতে পড়বে। তাই অন্তত ১৪ দিনের জন্য সব বন্ধ রাখা উচিত।

ভারতে গত কয়েক দিনে মহামারী পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি হওয়ায় এবং সেখানে শনাক্ত করোনার নতুন ধরন প্রবেশ ও ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে সীমান্ত বন্ধের অনুরোধ ছিল বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞদের। গত মঙ্গলবার কভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সভায়ও ভারতে সংক্রমণ পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত সীমান্ত বন্ধ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছিল।

এদিকে গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ভারতের সঙ্গে ১৪ দিনের জন্য সীমান্ত বন্ধ করা হয়েছে। তবে সে দেশে অবস্থানরত যেসব বাংলাদেশির ভিসার মেয়াদ ১৫ দিন বা তারও কম রয়েছে, তারা যথাযথ অনুমোদন সাপেক্ষে বেনাপোল, আখাউড়া ও বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে দেশে প্রবেশ করতে পারবেন। এক্ষেত্রে তাদেরকে ১৪ দিন প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে।

এতে আরও বলা হয়, ওই তিন বন্দর দিয়ে বাংলাদেশিদের প্রবেশের জন্য দিল্লি, কলকাতা ও আগরতলা মিশন থেকে অনুমোদন নিতে হবে এবং প্রবেশের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে করোনা নেগেটিভ টেস্ট রিপোর্ট থাকতে হবে। ওই তিন বন্দর ছাড়া অন্যসব বন্দর দিয়ে চলাচল বন্ধ থাকবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গতকাল পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনের সভাপতিত্বে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (পূর্ব), ভারতের হাইকমিশনার এবং প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ‘সোমবার (আজ) সকাল ৬টা থেকে ৯ মে পর্যন্ত স্থল সীমান্ত দিয়ে কেউ চলাচল করতে পারবেন না। তবে বাণিজ্যিকভাবে আমদানি পণ্য সঠিক উপায়ে জীবাণুনাশক স্প্রে করে দেশে ঢোকানো যাবে। সংশ্লিষ্ট ড্রাইভার ও হেলপারদের করোনা প্রটোকল মেনে চলতে হবে। এ ছাড়া রেলপথে আমদানি-রপ্তানি করার জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে।

দিল্লি, কলকাতা ও আগরতলায় অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলো ভারতীয় কর্র্তৃপক্ষকে এ সংক্রান্ত তথ্যাদি সরবরাহ করবে।’

গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘আজ (রবিবার) সিদ্ধান্ত হয়েছে ভারতের সঙ্গে আমাদের সব সীমান্ত বন্ধ থাকবে। যারা আসার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেছেন বা এসে পড়বেন, তারা যশোর বর্ডার এবং বর্ডার এলাকায় ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনে থাকবেন।’ আজও (গতকাল) যারা দেশে ঢুকবেন তাদেরকেও ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে বলে জানান তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ভারতে স্বাভাবিক যাতায়াত বন্ধ থাকবে। তবে সীমান্ত দিয়ে বাণিজ্য ব্যবস্থা চলমান থাকবে।’

এ বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব (পূর্ব) মাশফি বিনতে শামস জানান, আগামী ১৪ দিন বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত বন্ধ থাকাকালে শুধু যেসব বাংলাদেশি নাগরিকের ভিসার মেয়াদ শেষ হতে চলেছে তারা ভারতের কলকাতা মিশন থেকে বিশেষ অনুমতি নিয়ে ও নেগেটিভ টেস্ট রিপোর্ট দেখানো সাপেক্ষে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারবেন। এ ছাড়া কেউ প্রবেশ করতে পারবেন না।

ভারতের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের বিষয়ে কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অবশ্যই ভালো সিদ্ধান্ত হয়েছে। এখন সীমান্তে নজরদারিটা রাখতে হবে। পণ্যবাহী পরিবহনের লোকজনকে স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী ঢুকতে দিতে হবে।’

এর আগে গতকাল সকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক আবুল বাশার খুরশীদ আলম বলেন, ‘আর কোনো বিপর্যয় এড়াতে এখন ভারতের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ রাখা উচিত। এ বিষয়ে আমাদের মতামত আমরা যথাযথ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। যদিও সরকারের ওপরের মহল থেকেই এ সিদ্ধান্ত আসবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘দেশে ভারতের ভ্যারিয়েন্টের উপস্থিতি আছে কি না, এমন কোনো নিশ্চিত খবর আমাদের কাছে নেই। তবে দেশে নাইজেরিয়ার ভ্যারিয়েন্ট পাওয়ার কথা গণমাধ্যমেই জেনেছি।’

ভারতে গত তিন দিনে প্রায় ১০ লাখ মানুষের করোনা শনাক্ত হয়েছে। গত শনিবার পর্যন্ত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়েছে ৩ লাখ ৪৬ হাজার ৮৮৬ জন। একই সময়ে এ ভাইরাসে প্রাণ হারিয়েছে ২ হাজার ৬২৪ জন। ভারতের রাজধানী দিল্লির হাসপাতালগুলোয় কভিড রোগীদের অক্সিজেন সরবরাহে টালমাটাল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের চার হাজার কিলোমিটারের বেশি সীমান্ত রয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ও বৈশ্বিক করোনা সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত মূল্যায়ন করে একদল বিশ্লেষক বলেছেন, করোনাভাইরাসের ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট বা ধরন বাংলাদেশে প্রবেশ করলে পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা আছে। ওই বিশ্লেষক দলের প্রধান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের শিক্ষক ড. শাফিউন নাহিন শিমুল গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বাংলাদেশের বিশাল সীমান্ত ভারতের সঙ্গে। তাই আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ যতই বন্ধ থাকুক, তাতে সেখানকার ভাইরাস আসবে না এই নিশ্চয়তা নেই। ভারতে এর ব্যাপকভাবে বিস্তার হচ্ছে এবং সেখানে ভাইরাসের ডাবল ভ্যারিয়েন্টের কথা বলা হচ্ছে। তিনি জানান, ভারতে শনাক্ত করোনাভাইরাসের একটি ভ্যারিয়েন্ট বা ধরন এখন সারা বিশ্বের বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখছেন। এটা এখনো জানা যায়নি যে কভিডের এই ভ্যারিয়েন্ট আসলে কতটা ছড়িয়ে পড়েছে এবং ভারতে এখন সংক্রমণের যে ভয়াবহ ‘দ্বিতীয় ঢেউ’ চলছে, তার জন্য নতুন শনাক্ত এই করোনাভাইরাস কতটা দায়ী।