রোজা অপরের কষ্ট উপলব্ধি করতে শেখায়

পবিত্র রমজানকে বলা হয় প্রশিক্ষণের মাস। দীর্ঘ এক মাস বিভিন্ন নিয়মানুবর্তিতার মধ্য দিয়ে চলতে হয়। শেষ রাতে সাহরি খাওয়া, নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পানাহার ও জৈবিকাচার বন্ধ রাখা, সন্ধ্যায় নির্দিষ্ট সময়ে ইফতার ও তারাবির নামাজ আদায় করতে হয় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে। এভাবে এক মাস কঠোর নিয়মানুবর্তিতার মধ্যে কাটাতে হয়, এটা একটি প্রশিক্ষণ বটে। এ প্রশিক্ষণ জীবনের ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করে পূর্ণাঙ্গ মুমিন হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার। রমজানের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে যে ব্যক্তি জীবনের গুনাহ মাফ করাতে ব্যর্থ হয়েছে, তার মতো দুর্ভাগা আর কেউ নেই। এ কথা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন নবী মুহাম্মদ (সা.)। তিনি বলেছেন, ‘মাহে রমজানে সিয়াম সাধনার সুবর্ণ সুযোগ লাভ করা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি নিজেকে জাহান্নামের আগুনবিমুক্ত হতে সক্ষম হলো না, সে প্রকৃতপক্ষেই দুর্ভাগা।’ এ দুর্ভাগ্যের বোঝা মাথায় নিয়ে যারা নিজেদের জীবনকে তিলে তিলে নিঃশেষ করে দিতে চায় তাদের শুধু এই কথাটি স্মরণ করিয়ে দেওয়া দরকার, এক দিন সবাইকেই আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। এই সীমাহীন যাত্রাপথের পাথেয় সিয়াম সাধনার মাধ্যমে অর্জন করে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। জ্ঞান ও বিবেকসম্পন্ন মানুষ কল্যাণ এবং মঙ্গলময় জীবনযাপনে আনন্দ পায়, শান্তি পায়। এ শক্তিই হোক সবার কামনার ধন।

রমজান মাস শেষে একজন রোজাদার সম্পূর্ণ নিষ্পাপ শিশুর মতো নতুন জীবনের অধিকারী হবেনÑ এটাই রমজান মাসের দাবি। ব্যুৎপত্তিগত দিক থেকে রমজান মানে দহন। তো এই দহনের একটা জ্বালা তো অবশ্যই রয়েছে, যা সহ্য করতে হয় প্রত্যেক রোজাদারকে। সেই সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অভুক্ত থাকার একটা কষ্ট তো রোজাদারকে সইতেই হয়। মনোদৈহিক দিক থেকে এই কষ্ট সহ্য করাটা খুবই জরুরি। কারণ, এভাবেই রমজান আমাদের অপরের কষ্ট উপলব্ধি করতে শেখায় এবং নিঃসন্দেহে তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করে। এটাই রোজার মাহাত্ম্য, ইসলামের স্বতন্ত্রতা ও বৈশিষ্ট্য।

সমাজে অনেক রোজাদার রয়েছেন, যাদের রোজার বিনিময়ে শুধু ক্ষুধা ও পিপাসা ছাড়া আল্লাহর কাছে আর কিছুই পাওয়ার থাকে না। কিন্তু একটু চেষ্টা করলে, রমজানের রোজা রেখে আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন জীবনযাপন সম্ভব।

বস্তুত রমজান মাস হলো, ব্যক্তিগত ও সামাজিক নীতিনৈতিকতা, আচার-ব্যবহার ইত্যাদি পরিবর্তনের সুবর্ণ সময়। রোজার একটা ইতিবাচক প্রভাবই হলো, অযৌক্তিক এবং রূঢ় আচার-ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষাকে দৃঢ়তা দেওয়া। চরিত্রহীনতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা। সুতরাং কথাবার্তা, কাজকর্ম, আচার-আচরণ, চলন-বলন ও ব্যবহার ইত্যাদিতে মধ্যমপন্থা অবলম্বনের মাধ্যমে রমজানের প্রকৃত ফায়দা হাসিল করা সম্ভব। পরিবর্তনের এই চেষ্টাই হোক এবারের রমজানের লক্ষ্য।

লেখক : সিনিয়র পেশ ইমাম, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ