‘সর্বাত্মক লকডাউনে’র মধ্যে খুলে দেওয়া মার্কেট-শপিং মলে ক্রেতার চাপ কিছুটা বেড়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি মেনে বেড়েছে দোকান খোলা রাখার সময়ও। তবে গণপরিবহন বন্ধ থাকা ও নতুন করে এক সপ্তাহের ‘লকডাউনের’ ঘোষণায় হতাশা প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা। গতকাল সোমবার মার্কেট-শপিং মল খোলার দ্বিতীয় দিনে ব্যবসায়ীরা জানান, আগের দিনের তুলনায় বিক্রি একটু বেড়েছে। কিন্তু ফের ‘লকডাউনের’ ঘোষণায় তারা আতঙ্কিত। তাদের ভাষ্য, গণপরিবহন না চললে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখা মানে উল্টো লোকসান।
গতকাল বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বেচাকেনা নাই। তবে গতকালের তুলনায় বিক্রি একটু বেড়েছে। দোকান খোলা রাখার সময় বাড়ানোও স্বস্তির বিষয়। কিন্তু ফের “লকডাউনের” কারণে স্বস্তি পাচ্ছি না।’ সরেজমিন দেখা যায়, পুরান ঢাকার মার্কেটগুলোতে নেই বেচাকেনার ব্যস্ততা। ইসলামপুরের কোনো কোনো দোকানে বেচাকেনা নেই বললেই চলে। বড় শপিং মলগুলোতেও জমেনি বেচাবিক্রি। বেশিরভাগ ব্যবসায়ীকে অলস সময় পার করতে দেখা যায়।
ইসলামপুরে একরাম উদ্দীন প্লাজার ব্যবসায়ী নাদিম শিকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, শুনলাম, লকডাউন নাকি আবার বাড়িয়ে দিবে। তাইলে সরকার কেন শুধু শুধু দোকানগুলো খুলতে দিল। ক্রেতারা গণপরিবহন না পেলে আমাদের এখানে কীভাবে মাল কিনতে আসবে। সরকারের উচিত গণপিরবহনগুলো চালু করে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা।’
গণপরিবহন না খোলায় বিক্রি নেই বলে পাইকারি ব্যবসায়ীদের অভিযোগের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘দেশের পরিস্থিতি খুবই খারাপ। আমরা দুটো ডাল-ভাত খেয়ে বেঁচে থাকতে পারলেই হবে। অযৌক্তিক কথা বললে তো হবে না।’
সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে নিউ সুপার মার্কেটের সভাপতি মো. শহীদুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘টাইম বাড়ানো হয়েছে, কালকের থেকে আজকে বেচাকেনা একটু বাড়ছে। কিন্তু বাস-টাস, গণপরিবহন বন্ধ। অনেক ক্রেতাই আসতে পারছে না।’
এভাবে চলতে থাকলে ঈদের আগে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘না, সময় তো আরও বাড়াইতে হবে। ঈদের বাজার মিনিমাম রাত সাড়ে ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত বাড়াইতে হবে।’ তবে সরকার ক্রমান্বয়ে সমস্যা সমাধানের ব্যবস্থা করবে বলে আশা প্রকাশ করে এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ‘এখন যে অবস্থা চলুক এভাবে। দেখা যাক।’
বাংলাদেশ রেডিমেট গার্মেন্টস মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুল মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গাড়িঘোড়া বন্ধ, কেউ আসতে পারে না। খুইলা বইসা রইছি, বেচাকেনা নাই। কালকে বেচা হয় নাই। আইজ কিছু হইছে। টাইম বাড়ানোয় উপকার হইছে, কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত গাড়ি না খুলবে, দোকান খোলা আর না খোলা সমান কথা। মানুষের তো আসতে পারতে হইব, খালিই চলতে পারে না তো মাল কিনা যাইব কীভাবে, আইব কীভাবে।’ সিদ্দিকবাজার, গুলিস্তান, ফুলবাড়িয়া, বঙ্গবাজার ক্ষুদ্র গার্মেন্টস সংগঠনের এই নেতা বলেন, ‘ঢাকার আশপাশের ব্যবসায়ীরা ঢাকায় ঢুকতে পারে না। বিক্রি কার কাছে হবে?’
রাজধানীর শাহবাগ আজিজ সুপার মার্কেটের দেশীয় ফ্যাশন হাউজ ‘নোঙর’র স্বত্বাধিকারী মৃণাল হাওলাদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখনো ক্রেতা সমাগম নেই। আসলে গণপরিবহন চালু হলে বিক্রি একটু বাড়বে। এখনো তো কঠোর বিধিনিষেধ চলে।’
নিজেদের অবস্থার করুণ পরিস্থিতি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো ঝুঁকির মধ্যে আছি। দেশীয় পোশাক নিয়ে যারা কাজ করে তাদের একটা পোশাকের সঙ্গে অনেক লোক জড়িত। ক্রেতারা একটা কমপ্লিট পোশাক দেখে। কিন্তু এর পেছনে একজন ব্লক কারিগর, একজন অ্যাম্ব্রয়ডারি, কারিগর একজন ডিজাইনার, এ রকম একটা কমপ্লিট চেইন হয়ে একটা পোশাক আসে। এই মানুষগুলোর রুটি-রুজির বিষয় আছে। গত বছর বোনাস দেওয়া হয়নি, এবার তো তারা সেটা আশা করেছিল।’
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ঘোষিত প্রণোদনা পেয়েছেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এগুলো আসলে ঘোষণা হলেও আমরা এগুলো পাই না। ব্যবসায়ীদের যে বড় বড় শীর্ষ সংগঠন, প্ল্যাটফর্ম আছে তারা বা ব্যবসায়ীদের মধ্যে যারা মাফিয়া আছে, তারে এগুলো পেয়ে থাকে। এগুলোর প্রসিডিউরও আমরা জানি না।’
এলিফ্যান্ট রোডের জুতা ব্যবসায়ী মমিনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গণপরিবহন চালু হলে বেচাকেনা ভালো হবে। বড় গাড়ি তো ঢাকায় ঢুকতে পারতেছে না, এ কারণে কাস্টমারও পাচ্ছি না।’
একই এলাকার আলপনা প্লাজার জেন্টস পোশাকের দোকান ল্যান্ডমার্কের বিক্রেতা শাহীন বলেন, ‘আমাদের এলিফ্যান্ট রোডে যখন বাস চলে, তখন জমজমাট থাকে। এখন হইল ভারী গাড়িগুলো চলে না, না চললে এ রকম থাকবে। গত বছরও লকডাউনে এ রকম দেখছি।’
গাউছিয়া মার্কেটের সামনের কাপড় বিক্রেতা ইমন বলেন, ‘বেচাকেনা নাই একদমই। গাড়ি না চললে তো কাস্টমারই আসবে না, কার কাছে বেচাকেনা করুম।’
মাল্টিপ্ল্যান মার্কেটের সামনে কথা হয় আবু সুফিয়ান জুয়েলের সঙ্গে। করোনা সংক্রামক ঝুঁকির মধ্যে মার্কেটে কেন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘জরুরি প্রয়োজনে সিপিইউ নিয়ে মার্কেটে আসতে হয়েছে। ঝুঁকি তো অবশ্যই আছে কিন্তু জরুরি প্রয়োজন তো সারতে হবে।’
এদিকে অনেককেই পরিবার পরিজন নিয়ে মার্কেটে আসতে দেখা যায়। তেমনই এক পরিবারের কর্তা ব্যাংকার আফরান মাহমুদ। করোনা সংক্রমণের মধ্যে পরিবার নিয়ে মার্কেটে কেন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ছোট মেয়ের জন্য কিছু পোশাকের প্রয়োজন ছিল, তাই ঝুঁকির মধ্যেই আসা। জীবন তো আর থেমে থাকবে না, সবকিছুই চলছে।’
সদরঘাট ইস্ট বেঙ্গল মার্কেটের একতা পাঞ্জাবি শো রুমের ইনচার্জ আহসানুল সৈকত বলেন, সরকারের নির্দেশনা অনুয়ায়ী আমরা এখানে বেচাকেনা করছি। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে এখানের মালিক সমিতিগুলো বারবার আমাদের সতর্ক করছে। কিন্তু এখনো পাঞ্জাবির মার্কেটগুলো জমে ওঠেনি। আমরা আশাবাদী এখন না হলেও কদিন পর ঠিকই জমে উঠবে ব্যবসা।’
মগবাজার থেকে ইসলামপুরে পাইকারি থ্রিপিস নিতে এসেছেন নুসরাত বেগম নামে এক নারী। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মগবাজার এলাকার আশপাশে বাসাবাড়িতে থ্রিপিস বিক্রি করি। এখানে এসেছি পাইকারি দামে কিছু থ্রিপিস নিতে। কিন্তু গণপরিবহন না পাওয়ায় মালামাল ভালোভাবে নিতে পারছি না।’
শরীয়তপুর থেকে আসা মেহেদী নামের আরেক ক্রেতা জানান, অনেক কষ্ট করে এ পর্যন্ত আসলাম। আগের থেকে তিন গুণ বেশি ভাড়া দিয়ে আসতে হলো এই মার্কেটে। এখন মালামাল কিনে কীভাবে কী করব, সেই দুশ্চিন্তায় আছি।’
করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় সরকার জনসমাগম এড়াতে প্রথমে ৫ থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত নানা বিধিনিষেধ আরোপ করে। পরে এই নিষেধাজ্ঞা আরও দুদিন বাড়িয়ে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত করা হয়। তবে সে সময় সরকারি-বেসরকারি অফিস, শিল্পকারখানা, গণপরিবহন চালু ছিল। এরপর ১৪ এপ্রিল থেকে এক সপ্তাহের জন্য সব ধরনের অফিস ও পরিবহন বন্ধের পাশাপাশি বাজার-মার্কেট, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। তবে উৎপাদনমুখী শিল্প কারখানায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে কাজ চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়।