২০ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলকে প্রবাসী আয়

করোনা মহামারীর মধ্যেও চলতি অর্থবছরের ১০ মাস পার না হতেই রেমিট্যান্স ২ হাজার কোটি (২০ বিলিয়ন) ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। এক অর্থবছরে এত পরিমাণ রেমিট্যান্স এর আগে কখনো দেখেনি বাংলাদেশ। এর আগে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্সের রেকর্ড ছিল ২০১৯-২০ অর্থবছরে। ওই অর্থবছরে ১ হাজার ৮২০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যায়, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে ১ জুলাই থেকে ২২ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২ হাজার ১৯ কোটি (২০.১৯ বিলিয়ন) ডলার। অর্থবছর শেষে রেমিট্যান্স ২৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

ব্যাংকাররা বলছেন, ঈদকে কেন্দ্র করে এখন অনেক ব্যাংক রেমিট্যান্সে সরকারের ২ শতাংশ প্রণোদনার সঙ্গে বাড়তি ১ শতাংশ প্রণোদনা যোগ করে মোট ৩ শতাংশ প্রণোদনা দিচ্ছে। এ ছাড়া ঈদের আগে সাধারণত প্রবাসীরা বেশি করে রেমিট্যান্স দেশে পাঠান। তবে সারা বছরই করোনার মধ্যে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে সাহায্য করেছে সরকার ঘোষিত প্রণোদনা।  

বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি এপ্রিল মাসের প্রথম ২২ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১৫৮ কোটি ডলার। এ ছাড়া চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ১ হাজার ৮৬০ কোটি ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৩৫ শতাংশ বেশি। গত জুলাইয়ে প্রায় ২৬০ কোটি ডলারের রেকর্ড রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। এখন পর্যন্ত এক মাসে এত বেশি রেমিট্যান্স দেশে আসেনি।

এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, প্রবাসী আয় পাঠানোর নিয়ামকানুন সহজ করা, ২ শতাংশ নগদ প্রণোদনাসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্কারমুখী পদক্ষেপ রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছে। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের এ অর্জন দিন দিন বেড়েই চলেছে। আমাদের প্রত্যাশা এটি আরও বাড়বে। এ বিষয়ে সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে এসেছে। কাউকে হয়রানি হতে হয় না, রেমিট্যান্স সময়মতো উপকারভোগীর হাতে পৌঁছে যায়। যে কারণে এটি দিন দিন বেড়েই চলেছে এবং বাড়তেই থাকবে।’

অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১৭৪টি দেশে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখের বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করছেন। যাদের তিন-চতুর্থাংশ কর্মরত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে।

করোনা মহামারী শুরুর পরপরই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশের কর্মীদের দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তবে করোনাভাইরাসের প্রকোপ কিছুটা কমে এলে গত বছরের শেষদিকে অনেক কর্মী আবার বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহে তেমন একটা প্রভাব পড়েনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যানে দেখা যায়, কেবল দুবাই ও ইতালি থেকে রেমিট্যান্স আসা কমেছে। এ ছাড়া অন্যান্য দেশগুলো থেকে রেমিট্যান্স আসা বেড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স বেড়েছে মালয়েশিয়া ও সৌদি আরব থেকে। 

তাছাড়া দেশে রেমিট্যান্স আহরণে ব্যাংকগুলোর মধ্যেও প্রতিযোগিতা বেড়েছে। এক সময় রেমিট্যান্স আহরণে পিছিয়ে থাকা রূপালী ব্যাংক এখন রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধিতে এক নম্বরে আছে। এই ব্যাংকটির রেমিট্যান্স আহরণ বেড়েছে ১২৯ শতাংশ। রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধিতে দ্বিতীয় ইসলামী ব্যাংক, ১০২ শতাংশ এবং তৃতীয় অবস্থানে থাকা অগ্রণী ব্যাংকের রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি ৬১ শতাংশ।  

২০১৯-২০ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা দিচ্ছে সরকার। অর্থাৎ কোনো প্রবাসী ১০০ টাকা দেশে পাঠালে তার সঙ্গে আরও ২ টাকা যোগ করে মোট ১০২ টাকা পাচ্ছেন রেমিট্যান্স প্রেরণকারীর স্বজনরা। এতে করে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহী হচ্ছেন প্রবাসীরা।  

রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শামস-উল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের কিছুটা খরচ বাড়লেও আমরা ঈদকে কেন্দ্র করে রেমিট্যান্সে বাড়তি ১ শতাংশ প্রণোদনা দিতে চেষ্টা করছি। এটা আমাদের প্রবাসী ভাইবোনদের কাষ্টার্জিত অর্থ বৈধপথে দেশে আনতে উৎসাহ জোগাবে।’ 

সর্বশেষ গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১ হাজার ৮২০ কোটি ডলার বা ১৮ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। অর্থবছর হিসাবে যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আহরণ। এর আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১ হাজার ৬৪১ কোটি ডলার রেমিট্যান্স আসে। এর আগের অর্থবছরে (২০১৭-১৮) দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ১ হাজার ৪৯৮ কোটি ডলার।

এদিকে রেমিট্যান্স বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ আবারও ৪ হাজার ৪০০ কোটি (৪৪ বিলিয়ন) ডলার ছাড়িয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার দিন শেষে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৪ হাজার ৪০৭ কোটি ডলার।