বেতন-বোনাস ঝুঁকিতে দুই শতাধিক পোশাক কারখানা

প্রতি বছরের ন্যায় এবারও বেতন-বোনাস ঝুঁকিতে রয়েছে ২ শতাধিক পোশাক কারখানা। এদের অন্তত ১৬০টি কারখানা এখন পর্যন্ত মার্চের বেতনই পরিশোধ করতে পারেনি। এপ্রিলে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। পরিস্থিতি নিয়ে ইতোমধ্যে পোশাক খাতের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর এবং সংশ্লিষ্ট মালিকদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে প্রশাসন। সম্ভাব্য অসন্তোষ ঠেকাতে নেওয়া হচ্ছে প্রস্তুতি। এছাড়া আজ বৃহস্পতিবার শ্রম ভবনে মালিক-শ্রমিক প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠকে বসবে শ্রম মন্ত্রণালয়। এই বৈঠকে ঈদের ছুটি ও বোনাসের বিষয়েও সিদ্ধান্ত আসতে পারে। শিল্প পুলিশ চাইছে, দুর্ঘটনা রোধে ধাপে ধাপে ছুটি দেওয়া হোক।

বিজিএমইএর সভাপতি ফারুক হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা বিষয়টি নিয়ে খুব চিন্তিত। করোনার বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের ব্যবসায়ীরা অনেকেই এখন খাদের কিনারায়। বিষয়টি বিবেচনা করেই আমরা সরকারের কাছে শ্রমিকের বেতন দেওয়ার জন্য প্রণোদনা চেয়ে আবেদন করেছি। সরকার যদি আমাদের প্রণোদনার টাকাটা দিত তাহলে বেতন নিয়ে চিন্তা করতে হতো না। তখন বোনাসটাও সময়মতো দিতে পারতাম। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের সহায়তা ছাড়া বেতন-বোনাস একত্রে পরিশোধ করা অনেক কারখানার পক্ষেই অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে সরকার, কারখানা মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে আমরা আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি।’

বেতন-বোনাস ঝুঁকির বিষয়ে বাংলাদেশ শিল্প পুলিশের শিল্প পুলিশের ডিআইজি মাহবুবুর রহমান গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শ্রমিক অসন্তোষের ঝুঁকি সব সময়ই থাকে। ঈদ এলে সেটা বেড়ে যায়। এবার করোনার কারণে ব্যবসায়ীদের অনেকেরই ঠিকমতো শিপমেন্ট হচ্ছে না। এ কারণে অর্থনৈতিক সংকটে আছে। মার্চের বেতনই তো অনেকে দিতে পারেননি। এ কারণে এবার ঝুঁকিটা আরেকটু বেশি। আমরা সব পক্ষের সঙ্গেই কথা বলছি। চেষ্টা করছি কীভাবে অসন্তোষ এড়ানো যায়। এরপরও সম্ভাব্য সব অসন্তোষ মোকাবিলায় আমাদের সবগুলো উইং প্রস্তুত আছে।’

পোশাক কারখানা মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত বছরের মার্চে দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর থেকেই কারখানা মালিকেরা সংকটে আছেন। গত এপ্রিল-জুলাই পর্যন্ত শ্রমিকের বেতন সরকারের প্রণোদনার মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে। এ জন্য তাদের ওপর তেমন কোনো চাপ পড়েনি। কিন্তু এবার বেতন দিতে হচ্ছে নিজস্ব অর্থায়ন থেকে। অথচ ক্রয়াদেশে চলছে ধীরগতিতে। আবার পণ্যের দামও আগের চেয়ে অনেক কম। এ কারণে অনেক কারখানা মালিক সময়মতো বেতন দিতে পারছেন না। এর সঙ্গে আবার যোগ হয়েছে বোনাস। সবকিছু মিলে এই সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।

কারখানার বেতন নিয়ে যখন ইতিমধ্যে চাপা উত্তেজনা চলছে তখন বোনাসের হার নিয়েও শ্রমিকের মধ্যে কিছুটা আশঙ্কা কাজ করছে। গত বছর শ্রম মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী যাদের সক্ষমতা নেই তাদের অর্ধেক বোনাস নগদ ও অর্ধেক পরবর্তীতে পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এতে অনেক শ্রমিকই বোনাসের পুরো টাকা পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষকরে যেসব শ্রমিক ঈদের পরে কর্মস্থল পরিবর্তন করেছিলেন তাদের অধিকাংশই বোনাসের টাকা পাননি। তাই শ্রমিকেরা এবার পুরো বোনাসের টাকা একত্রে পরিশোধের দাবি জানিয়েছেন।

গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানার শ্রমিক ইমন গাজী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এবার তো আর কোনো কারখানা বন্ধ নাই। তাই এবার যদি বোনাস ভাগ কইরা দিতে চায় তাইলে তা মানুম ক্যা (মানবো কেন)? আমাদের পুরো বেতনই দিতে হবে। বোনাসও পুরোটাই একত্রে দিতে হবে।’

বিকেএমইএর সহসভাপতি ফজলে শামীম এহসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা সত্যি, গত এক বছরে পণ্যর দাম ও ক্রয়াদেশ কমে গেছে। এতে ধুকে ধুকে অনেক কারখানাই সক্ষমতা হারিয়েছে। সরকার যদি একটু সহায়তা দিত তাহলে এই ঝামেলাটা এড়িয়ে যাওয়া যেত। এরপরও আমরা সবাইকে নির্দেশ দিয়েছি, শ্রমিকের সঙ্গে আলোচনা করেই বেতন-বোনাসের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে। এ ছাড়া আমরাও ঝুঁকিপূর্ণ কারখানার তালিকা প্রণয়নের কাজ শুরু করছি।’

এদিকে ঈদের ছুটি কয়দিন হবে? শ্রমিকেরা আদৌ গ্রামে যেতে পারবে কিনা তা নিয়ে এক প্রকার অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। কারখানা মালিকেরা বলছেন, তাদের পক্ষ থেকে ছুটি প্রদানে কোনো আপত্তি নেই। প্রতিটি কারখানা তাদের ঘোষণা অনুযায়ী উৎসব ছুটি দেবেন। অনেক কারখানা কাজ কম থাকায় বাড়তি ছুটি দেওয়ার জন্যও প্রস্তুত। শ্রমিকরাও গ্রামে যাওয়ার বিষয়ে খুব আগ্রহী। কিন্তু সমস্যা দেখা দিয়েছে করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকারের বিধিনিষেধ কত দিন বলবৎ থাকে তার ওপর। যদিও কয়েক দিন আগে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবয়াদুল কাদের বলেছেন, ঈদে মানুষ গ্রামে যাওয়ার জন্য বিধিনিষেধ শিথিল করা হবে। কিন্তু করোনার বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই অবস্থান আদৌ থাকবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। গতকালই সরকার বিধিনিষেধ আরও এক সপ্তাহ বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।

অন্যদিকে শিল্প পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশ চাইছে, সরকার যদি শ্রমিকদের গ্রামে যেতে দেয়ও তাহলে ধাপে ধাপে ছুটি ঘোষণা করা হোক। এতে করে একদিকে যেমন দুর্ঘটনা ঝুঁকি কমবে; সড়কের ওপর চাপও কমবে। আবার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রেও অনেকটা সুবিধা হবে। তবে পুরো বিষয়টি নির্ভর করছে করোনা পরিস্থিতির ওপর। আজকের বৈঠকে হয়তো একটা প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি উন্নতি না হলে শ্রমিকদের গ্রামে যেতে না দেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

এহসান বলেন, ‘আমরা সরকারে দিকে তাকিয়ে আছি। তারা যে সিদ্ধান্ত দেবেন তাই ফলো করবো। ধাপে ধাপে ছুটির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটা তেমন একটা কার্যকর সিদ্ধান্ত না। এর অন্যতম কারণ হলো, একই পরিবারের সদস্য ভিন্ন ভিন্ন কারখানায় কাজ করেন। অনেকে আবার এলাকাভিত্তিক বাস ভাড়া করে একসঙ্গে বাড়িতে যান। সব কারখানার শিপমেন্ট শিডিউলও এক থাকে না। সুতরাং ধাপে ধাপে ছুটি দিলেও সবাই একসঙ্গেই গ্রামে যাবে। অতীত অভিজ্ঞতা তাই বলে।’