দেশের কৃষিপণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাবের কারণে উৎপাদক ও ভোক্তা পর্যায়ের দামের মধ্যে বড় ধরনের ফারাক তৈরি হচ্ছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক জরিপে দেখা গেছে, খামার বা উৎপাদন পর্যায় থেকে খুচরা বাজারে পৌঁছাতে কাঁচা মরিচের দাম বেড়েছে ১১৬ শতাংশ। একই সময়ে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ৮৭ শতাংশ। এছাড়া ডালের ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধি ৭৮ শতাংশ এবং বেগুনে ৭২ শতাংশে পৌঁছেছে।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) রাজধানীর ধানমণ্ডিতে নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত ‘২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাংলাদেশ অর্থনীতি: উত্তরণকালীন সময়ে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানায় সংস্থাটি।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। এতে আরও উপস্থিত ছিলেন সংস্থাটির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান ও গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
সিপিডির ২০২৬ সালের বাজার জরিপের ভিত্তিতে এই বিশ্লেষণ তৈরি করা হয়েছে। এতে প্রায় এক হাজার অংশগ্রহণকারীর তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যেখানে কৃষক থেকে শুরু করে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ের অংশীজন ছিলেন। জরিপে চাল, ডাল, পেঁয়াজ, আলু, কাঁচা মরিচ, বেগুন, ডিম, গরুর মাংস, মাছ ও ব্রয়লার মুরগিসহ মোট ১০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, উৎপাদক থেকে খুচরা পর্যায়ে পৌঁছাতে দামের সর্বোচ্চ বৃদ্ধি কাঁচা মরিচে—১১৬ শতাংশ। এরপর পেঁয়াজে ৮৭ শতাংশ, ডালে ৭৮ শতাংশ এবং বেগুনে ৭২ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। সিপিডির মতে, দীর্ঘ সরবরাহ ব্যবস্থা এবং উৎপাদক ও ভোক্তার মাঝখানে একাধিক মধ্যস্বত্বভোগীর উপস্থিতিই এই মূল্যবৃদ্ধির মূল কারণ।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘সরবরাহ ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা যত বেশি, ভোক্তাকে তত বেশি দাম দিতে হয়। বর্তমান বাজার কাঠামোয় কিছু অংশীজন সংগ্রহ ও খুচরা দামের ওপর অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করতে পারছেন।’
সংস্থাটি জানায়, পেঁয়াজ, আলু, শাকসবজি, ডিম ও মাছ বিপণনের ক্ষেত্রে শহরভিত্তিক আড়তদারদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। খুচরা বিক্রেতারা পণ্য সংগ্রহে তাদের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল থাকায় বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যাচ্ছে এবং আড়তদারদের প্রভাব আরও বাড়ছে।
সিপিডির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, এই নির্ভরশীলতা বাজারে কাঠামোগত দুর্বলতা তৈরি করছে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াচ্ছে। সীমিত সংখ্যক মধ্যস্বত্বভোগীর হাতে বাজারক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ায় প্রতিযোগিতা কমে যাচ্ছে, ফলে অপ্রতিযোগিতামূলক আচরণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এতে লাভের বড় অংশ মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে চলে যাচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে দামের চাপ বাড়াচ্ছে।
অন্যদিকে ডিম, ব্রয়লার মুরগি, গরুর মাংস ও মাছের মতো তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত সরবরাহ শৃঙ্খল থাকা পণ্যে উৎপাদক ও খুচরা পর্যায়ের দামের ব্যবধান অপেক্ষাকৃত কম দেখা গেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কয়েকটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২৬ সালের ১৪ মে পর্যন্ত গরুর মাংসের দাম কেজিপ্রতি ৭৯০ টাকায় পৌঁছেছে, যা ২০১৯ সালের পর সর্বোচ্চ। একই সময়ে রুই মাছ বিক্রি হয়েছে কেজিপ্রতি ৩৬৫ টাকা এবং ব্রয়লার মুরগির দাম ছিল কেজিপ্রতি ১৯০ টাকা।
হাওর অঞ্চলে বন্যায় ফসলের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে সিপিডির জরিপে দেখা গেছে, এ বছরের বন্যায় মোট ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৪৪৯ মেট্রিক টন চালের সমপরিমাণ ফসলের ক্ষতি হয়েছে। তবে সরকারি হিসেবে এ ক্ষতির পরিমাণ ২ লাখ ১৪ হাজার মেট্রিক টন চাল এবং এতে প্রায় ৪৯ হাজার হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানানো হয়।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, গত ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত হাওরাঞ্চলের নিম্নভূমিতে মাত্র ১৫ শতাংশ ধান কাটা সম্ভব হয়েছিল। ফলে বন্যা শুরু হওয়ার সময় প্রায় ৮৫ শতাংশ ফসল মাঠেই ছিল। ওই সময় পর্যন্ত হাওরাঞ্চলে মোট ২ লাখ ১৮ হাজার হেক্টর জমির ধান কাটা হয়নি।
সিপিডির জানায়, বন্যায় নিম্নাঞ্চলের ৯৫ হাজার ৬০৬ হেক্টর, মধ্যাঞ্চলের ২৫ হাজার ৫৭১ হেক্টর এবং উচ্চাঞ্চলের ৮৩৯ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ২২ হাজার মেট্রিক টন ধান, যা চালের হিসাবে প্রায় ৩ লাখ ৩৯ হাজার মেট্রিক টনের সমান। ২০১৭ সালের বন্যার ক্ষেত্রেও প্রাথমিক হিসাবের তুলনায় চূড়ান্ত ক্ষতির পরিমাণ ৩৭ শতাংশ বেশি ছিল। এবারও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যেতে পারে বলে মনে করছে সিপিডি।
