বিধানসভার ভোটে বিজেপি তথা কেন্দ্র সরকারের চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে বিশাল জয় পেয়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তৃণমূল কংগ্রেস। নিজের আসনে হেরে গেলেও পরিষদীয় দলের নেত্রী নির্বাচিত হয়ে রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আগামীকাল বুধবার তৃতীয়বারের মতো মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিতে যাচ্ছেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে করোনায় বিপর্যস্ত দেশে রাজ্য শাসন করা আগের চেয়ে কঠিন হয়ে উঠবে তার জন্য। বিশেষ করে ভোটের ইশতেহারে তিনি যে দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, শিল্পখাতে উন্নয়ন, শিক্ষা ও শিক্ষকদের উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবার মান বৃদ্ধি এবং খাদ্য সহায়তা জোরদারের যে আশ্বাস তিনি দিয়েছিলেন তা বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে তাকে। তবে ভোটে জয়ের পরদিনই মমতা তার দলের নেতাকর্মীদের স্মরণ করিয়েছেন সে কথা। তিনি বলেছেন, ‘বিধায়ক হয়ে গিয়েছি বলে অহঙ্কার করলে চলবে না। জিতেছেন মানে, দায়িত্ব বেড়েছে।’
পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়েছে, গতকাল সোমবার কালীঘাটে দলীয় কার্যালয়ে বৈঠকের পর দলের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায় জানান, পরিষদীয় দলের নেত্রী নির্বাচিত হয়েছেন মমতাই। আগামীকাল ৫ মে (বুধবার) মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন তিনি। ৬ ও ৭ মে শপথ নেবেন বাকি বিধায়করা।
এছাড়া বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বিধানসভার স্পিকার হবেন বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়ই। স্পিকার নির্বাচনের দিন দায়িত্ব পালন করবেন সুব্রত মুখোপাধ্যায়।
পার্থ জানান, কারা মন্ত্রী হবেন সেই বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। মমতা ঠিক করবেন কারা মন্ত্রী হবেন। তবে তার ইঙ্গিত এবার হয়তো তরুণরাই জায়গা পাবেন মন্ত্রিসভায়।
সোমবারের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে জয়ী বিধায়করাও। সূত্রের বরাতে খবরে বলা হয়েছে, বৈঠকে বিধায়কদের মমতা বলেছেন, বিধায়ক হয়ে যাওয়ার পরে অহংকার করলে চলবে না। জিতে যাওয়ায় দায়িত্ব আরও বেড়েছে। আপনারা যোগ্য জবাব দিয়ে জিতেছেন। আমাদের জয়ে সারা দেশের মানুষ খুশি হয়েছেন। দেশের বিরোধীরা খুশি হয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
এর আগে কালীঘাটে মমতা বলেন, মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নেওয়ার পরে তার সরকারের প্রধান কাজ হবে রাজ্যে করোনা পরিস্থিতির মোকাবিলা করা। তার পরেই বিজয় উৎসব করবেন তারা।
এদিকে শপথ অনুষ্ঠানের বিষয়ে আলোচনা করতে ও মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করতে ওইদিনই সন্ধ্যায় রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড়ের সঙ্গে দেখা করেন মমতা। রাজ্যপালের হাতে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি। রাজ্যপাল ধনকড় সেই পদত্যাগপত্র গ্রহণও করেন।
আনন্দবাজার বলছে, বিধানসভা ভোটের দিন ঘোষণার হলেই রাজ্য সরকার কেয়ারটেকার সরকারের ভূমিকা নেয়। সোমবার সেই কেয়ারটেকার সরকারেরর মুখ্যমন্ত্রিত্ব থেকেই পদত্যাগ করলেন তৃণমূলনেত্রী।
সংবাদমাধ্যমটি জানাচ্ছে, আপাতত এই বৈঠকের দুটি বিষয় স্পষ্ট। প্রথমত, প্রথা মেনে রাজ্যপালের কাছে নিজের (মমতার) পদত্যাগপত্র জমা দেওয়া। এ ছাড়া ভোটে জয়ী বিধায়কদের তালিকাও রাজ্যপালকে দেওয়ার কথা তৃণমূলনেত্রীর। নতুন মন্ত্রিসভা এবং সরকার গঠনের জন্য আবেদনও জানানোর কথা রাজ্যপালের কাছে। পাশাপাশি রাজ্যপালের তরফেও পাল্টা চিঠি দিয়ে সরকার গঠন করার আহ্বান জানানো হবে তৃণমূলের দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে।
মমতার সামনে ৫ চ্যালেঞ্জ : রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিজেপির চ্যালেঞ্জে সহজে জয় পেলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে অপেক্ষা করছে আরও অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিশ্রুতি পূরণের চ্যালেঞ্জ। ভোটের আগে যে ইশতেহার তিনি দিয়ে ছিলেন সে তালিকাটা রীতিমতো দীর্ঘ। আগামী পাঁচ বছরে যদি তিনি সেই প্রতিশ্রুতি পালন করতে পারেন, তাহলে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বিপুলভাবে উপকৃত হবেন। কিন্তু তা কতটুকু পারবেন মমতা?
মমতার প্রথম চ্যালেঞ্জটি দারিদ্র্য বিমোচন এবং কর্মসংস্থান বাড়ানো। ভোটের আগে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আগামী পাঁচ বছরে ৩৫ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যরেখার থেকে ওপরে তোলা হবে। তার মানে বছরে সাত লাখ অত্যন্ত গরিব মানুষ একটু স্বাচ্ছন্দ্যের মুখ দেখবেন। কিন্তু কীভাবে এই কাজ করা হবে, তার কোনো রূপরেখা এখনো নেই। এছাড়া প্রতি বছর পাঁচ লাখ বেকারের কর্মসংস্থানের আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। কিন্তু রাজ্যটিতে এখনই বেকারের সংখ্যা ২১ লাখ। প্রতি বছর নতুন বেকার যুক্ত হবে। তাই যথাযথভাবে সে প্রতিশ্রুতি রাখাও চ্যালেঞ্জের হবে তার জন্য।
মমতার দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হবে শিল্পখাতের উন্নয়ন। তার প্রতিশ্রুতি ছিল রাজ্যে প্রতি বছর ১০ লাখ ছোট ও মাঝারি শিল্প হবে। পাঁচ বছরে বড় শিল্পের দুই হাজারটি ইউনিট যুক্ত হবে। আর বিনিয়োগ হবে পাঁচ লাখ কোটি রুটি। তবে অতীত অভিজ্ঞতার নিরিখে এই তিনটি প্রতিশ্রুতি রূপায়ণ করা রীতিমতো কঠিন।
শিক্ষা ও শিক্ষকদের উন্নয়ন ঘটানোই হবে তৃণমূল সরকারের তৃতীয় চ্যালেঞ্জ। মমতা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন প্রতিটি ব্লকে একটি করে মডেল আবাসিক স্কুল হবে। পার্শ্ব-শিক্ষকদের বছরে বেতন তিন শতাংশ করে বাড়বে, অবসরের পর তারা তিন লাখ টাকা করে পাবেন। কিন্তু করোনার ধাক্কা সামলিয়ে এই অর্থ কোথায় পাবেন তা নিয়ে রয়েছে সংশয়।
অর্থ সংকটের কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে ডাক্তার, নার্সদের সংখ্যা দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতিও। মমতার আশ্বাস ছিল প্রতিটি জেলায় মেডিকেল কলেজ, অতিরিক্ত সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল এবং ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সংখ্যা দ্বিগুণ করা হবে। এছাড়া সব পরিবারকে স্বাস্থ্য সাথীর আওতায় নিয়ে আসার আশ্বাস দিয়েছিলেন তিনি। করোনার জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে গিয়ে প্রথম বছরেই এ খাতের আশ্বাস পুরণে ধাক্কা খেতে পারেন মমতা।
ভোটের আগে মমতা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, রাজ্যের ৫০টি শহরে মা ক্যান্টিন খোলা হবে। যেখানে পাঁচ টাকায় ডিম-ভাত পাওয়া যাবে। সেই সঙ্গে রেশন বাড়িতে পৌঁছে দেবে সরকার। গরিব পরিবারের কর্ত্রীরা মাসে ৫০০ টাকা ও তফসিল জাতি ও উপজাতির ক্ষেত্রে হাজার টাকা পাবেন। বছরে দুইবার ‘দুয়ারে সরকার’ পরিকল্পনা নেওয়া হবে।
ইশতেহারের আলোচ্য বিষয়গুলো বাস্তবায়ন খুব সহজ হবে না মমতার জন্য। প্রবীণ সাংবাদিক শুভাশিস মৈত্রের মতে, কয়েকটা কাজ মমতা করবেন। স্বাস্থ্য সাথী বা পাঁচ লাখ টাকার বীমা প্রকল্প করবেন। মানুষকে বিনা পয়সায় ভ্যাকসিন দেবেন। গরিব পরিবারের মেয়েদের ৫০০ টাকা দেওয়া বা মা ক্যান্টিন করা এসবও করবেন। কিন্তু শিল্প আনা থেকে শুরু করে বাকি কাজগুলোর জন্য প্রচুর অর্থ লাগবে। এই অর্থ সংগ্রহ অসম্ভব না হলেও তা খুবই কঠিন হবে তার জন্য।
এ ছাড়া কেন্দ্রে যেহেতু তার পরাজিত প্রতিপক্ষ, তাই সেখান থেকেই খুব বেশি সাড়া পাবেন বলে মনে করছেন না অনেকে। তাই বিজেপির বিরুদ্ধে ভোটের ময়দানে জয় পেলেও রাজ্য শাসনে মমতা ঠিকই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছেন।