ঈদ সামনে রেখে দেশের বিপণিবিতানগুলোয় কেনাকাটায় অস্বাভাবিক ভিড় ও স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণে দেশে করোনার সংক্রমণ আবারও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। মন্ত্রী বলেন, মার্কেটে যে পরিমাণ ভিড় দেখতে পাচ্ছি, মানুষ কেনাকাটা করতে স্বাস্থ্যবিধি না মেনেই যেভাবে মার্কেটে যাচ্ছে, এতে সংক্রমণ বাড়বে বলে আমার ধারণা। একটা ঈদে জামাকাপড় না কিনলে কী হয়? সরকার লকডাউন দিয়েছে। তা সংক্রমণ কমাতে বেশ ‘কার্যকর’ ছিল। তবে লকডাউন দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। সরকার মার্কেট খুলে দিয়েছে, যাওয়া না যাওয়া আমাদের বিষয়। অনেক নারী ও শিশু মাস্ক পরছে না। সবকিছু তো সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। লোকজন সেভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানছে না।
গতকাল বৃহস্পতিবার ‘কভিড-১৯-এর দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় করণীয় এবং অক্সিজেনসংকট ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন এ সভার আয়োজন করে। সভাপতিত্ব করেন অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মুবিন খান। বক্তব্য দেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুর রহমান, স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আলী নূর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম, বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব আনোয়ার হোসেন খান এমপি, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজ, ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. টিটো মিয়াসহ দেশের বিভিন্ন প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, চেয়ারম্যানসহ অন্যান্য হাসপাতালের প্রতিনিধি।
অনুষ্ঠানে সরকারের সচেতনতামূলক ‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস’ স্লোগান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তৈরি দাবি করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, এটা খুব কাজে দিয়েছে। এই স্লোগানে সচেতনতা বেড়েছে। বিশ্বের অনেক দেশ এটা অবলম্বন করছে। এটা আমাদের এখান থেকে শুরু করেছি।
গত বছরের লকডাউনের পর মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানেনি উল্লেখ করে জাহিদ মালেক বলেন, ‘ফলে অক্সিজেনের জন্য কীভাবে দাপাদাপি হয়েছে, সেটা আমরা দেখেছি। অ্যাম্বুলেন্সে, হাসপাতালের বারান্দায় কী হয়েছে, সেটা দেখেছি। ভারতেও এমনটা হয়েছে। এ বিষয়গুলো আমাদের মনে রাখতে হবে। আমরা ভুলে যাই। এটা খুবই অন্যায়।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে অক্সিজেন, সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্ল্যান্ট, টিকার সংকট কাটাতে বিভিন্ন উদ্যোগসহ করোনা মোকাবিলায় সরকারি-বেসরকারি ব্যবস্থাপনার সর্বশেষ তথ্য জানান।
মজুদ ৯০০ টন অক্সিজেন : স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দেশে বর্তমানে সাধারণ ও কভিড রোগী মিলে ৭০-৮০ টন অক্সিজেন প্রয়োজন। করোনার চলমান দ্বিতীয় ঢেউয়ের পিকের সময় সর্বোচ্চ অক্সিজেন চাহিদা ছিল ২১০ টন পর্যন্ত। এই মুহূর্তে দেশে দৈনিক অক্সিজেন উৎপাদনে সক্ষমতা রয়েছে ২২০ থেকে ২৩০ টন। তবে আমাদের পাশর্^বর্তী দেশ ভারতে অক্সিজেন সংকটের কারণে বর্তমানে ভয়াবহ অবস্থা চলছে। যেকোনো সময় একই রকম অবস্থা যাতে আমাদের দেশে না হতে পারে, সে জন্য সরকারিভাবে আপৎকালের জন্য এই মুহূর্তে দেশে প্রায় ৯০০ টন অক্সিজেন মজুদ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের অন্যান্য সরকারি হাসপাতালে আরও ৪৫০ টন অক্সিজেন মজুদ রয়েছে। আগামী মাসে একটি বেসরকারি সংস্থা ৪০ টন অক্সিজেন সরবরাহ করবে। জুলাই মাসে অন্য একটি বেসরকারি সংস্থা আরও ৪০ টন অক্সিজেন সরবরাহ করবে। ফলে দেশে কভিডকালীন তৃতীয় ঢেউয়ের মাত্রা স্বাভাবিক থাকলে তা মোকাবিলা করতে কোনো সমস্যা হবে না।
জরুরি নির্দেশনা মানলে তৃতীয় ঢেউ মোকাবিলা সম্ভব : স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, কভিডে আক্রান্তের মাত্রা নিয়ন্ত্রণহীন হলে এবং মানুষ অস্বাভাবিকভাবে আক্রান্ত হলে শুধু সে ক্ষেত্রেই বড় রকম সমস্যা হতে পারে। আর সে রকম বিপর্যয় যাতে না হতে পারে তার জন্যই সরকারকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে লকডাউনসহ জরুরি কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ করা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও কভিডকালীন ১৮টি জরুরি নির্দেশনাসহ বেশ কিছু ঘোষণা দিয়েছেন। দেশের মানুষ সরকারের জরুরি নির্দেশনাগুলো মেনে চললে এবং আসন্ন ঈদ সামনে রেখে মানুষ বেপরোয়া চলাফেরা, কেনাকাটা, ভ্রমণ না করলে আশা করা যায় করোনার তৃতীয় ঢেউ দেশে এলেও বাংলাদেশ তা ভালোভাবেই মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে।
সরকারি ১৩০টি হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন : বর্তমানে দেশের হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেন ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, করোনা চিকিৎসায় রোগীর খারাপ অবস্থা হলে তখন অক্সিজেন মূল ভূমিকা পালন করে। এ কারণে অতিদ্রুত দেশের সরকারি ১৩০টি হাসপাতালে এখন সেন্ট্রাল অক্সিজেনব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এসব হাসপাতালে এখন প্রায় ১৬ হাজার শয্যায় কভিড রোগীদের অক্সিজেন দেওয়া যাচ্ছে। ঢাকা নর্থ সিটি করপোরেশনের ১০০টি আইসিইউ বেডে মানুষ এখন কভিড চিকিৎসা নিচ্ছে। খুব শিগগির সেখানে আরও ১০০টি আইসিইউ বেড স্থাপন করা হচ্ছে। এই উদ্যোগগুলো দেশে কভিড চিকিৎসায় বিরাট অবদান রাখবে।
দ্রুত টিকার সংকট কেটে যাবে : করোনার টিকা প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে আমাদের ৩ কোটি ডোজ ভ্যাকসিনের চুক্তি থাকলেও সে দেশের বর্তমান ভয়াবহ অবস্থার কারণে চুক্তি অনুযায়ী সব ভ্যাকসিন পাওয়া যাচ্ছে না। তবে ভ্যাকসিন নিতে রাশিয়ার সঙ্গে সরকারের কথা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে শিগগির চুক্তি হবে আমাদের। পাশাপাশি চীন ১২ মের মধ্যে ৫ লাখ ভ্যাকসিন দিচ্ছে। চীন সরকারের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। দ্রুতই চীনের ভ্যাকসিন নিয়ে একটি সিদ্ধান্ত চলে আসবে। একই সঙ্গে অ্যাস্ট্রেজেনেকার ভ্যাকসিন ভারত ছাড়া বিশ্বের অন্য যে দেশগুলো উৎপাদন করছে, আমরা সেই দেশগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ করছি। সব মিলিয়ে আশা করা যায়, খুব দ্রুতই ভ্যাকসিন সংকট কেটে যাবে।
গ্যাস অক্সিজেন বেশি ব্যবহারের নির্দেশ : করোনা রোগীদের চিকিৎসায় তরল অক্সিজেনের চেয়ে গ্যাস অক্সিজেন বেশি ব্যবহারের নির্দেশ দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, লিকুইড ব্যবহার না করে গ্যাস অক্সিজেন ব্যবহার করলে সুবিধা হবে। কারণ, গ্যাস অক্সিজেনের উৎপাদন ভালো অবস্থায় আছে। প্রায় ৫০টি হাসপাতালে বলে দিয়েছি গ্যাস অক্সিজেন ব্যবহার করব আমরা। কভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালে শুধু লিকুইড অক্সিজেন ব্যবহার করব।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, দেশে সাধারণ সময় অক্সিজেনের চাহিদা ৫০ থেকে ৬০ টন। এর মধ্যে অর্ধেক মেডিকেলে, বাকি অর্ধেক শিল্পে। বর্তমানে লাগছে ৭০ থেকে ৮০ টন। করোনাভাইরাসের চূড়ান্ত বিপর্যয়ে অক্সিজেন দরকার ছিল ২১০ টন।
অন্য বক্তরা যা বলেন : ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান বলেন, করোনা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে বেশি মানুষকে টিকা দিতে হবে। সরকার যাতে দ্রুতই ভ্যাকসিন আমদানি করতে সক্ষম হয়, সে জন্য সরকারের সব বিভাগ সক্রিয় রয়েছে।
বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মুবিন খান বলেন, দেশের ক্রান্তিলগ্নে যখনই সরকার ডেকেছে, তখন দেশের প্রাইভেট মেডিকেল এগিয়ে এসেছে। আগামীতেও যখনই সরকার ডাকবে, প্রাইভেট মেডিকেলগুলো সেভাবেই সরকারের পাশে দাঁড়াবে। করোনাকালীন এই দুর্যোগেও সরকারের অনুরোধে প্রায় অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতাল কভিড ডেডিকেটেড শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি করেছে।