দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এর নবনির্মিত ছয়টি ঘরের টিনের চালা উড়ে গেছে, ভেঙে পড়েছে পিলার। অন্যভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশ কয়েকটি ঘর। ঘণ্টায় মাত্র ৩১ কিলোমিটার গতিবেগের ঝড়ো বাতাসে ঘরগুলোর এই অবস্থা হওয়ায় এর নির্মাণ প্রক্রিয়া ও সামগ্রীর মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সামান্য ঝড়েই ঘরের এই বেহাল দশা হওয়ায় উপকারভোগীরা পড়েছেন চরম আতঙ্কে। তবে উপজেলাপ্রশাসনের দাবি, উপহার গ্রহীতারা ঘরে না থাকলেও জানালা-দরজা খুলে রাখায় এই ঘটনা ঘটেছে। তারপরও সরকারি অর্থেই তা মেরামত করে দেওয়া হবে।
গত সোমবার দিবাগত রাতে ফুলবাড়ী উপজেলার আলাদীপুর ইউনিয়নের বাসুদেবপুর জয়বাংলা পল্লীর আশ্রয়ণ প্রকল্পে এই ঘটনা ঘটেছে। সোমবার দিবাগত মধ্যরাতে বৃষ্টির সঙ্গে বয়ে যাওয়া ঝড়ো হাওয়ায় ওই এলাকার আশপাশের কোথাও কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হলেও আশ্রয়ণ প্রকল্পের পাঁচটি ঘরের বারান্দাসহ ঘরের ছাউনির টিন ও বর্গা উড়ে যায়। ভেঙে যায় ঘরের বারান্দার পিলার।
অথচ দিনাজপুর আবহাওয়া অফিসের তথ্য বলছে, ওই রাতে এলাকাটিতে বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় মাত্র ৩১ কিলোমিটার। আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন গতকাল দেশ রূপান্তরে বলেন, সোমবার রাতে যে ঝড়ো হাওয়া হয়েছে তাকে সাধারণত ঝড় বলা যায় না। এতে গাছপালা উপড়ে বা ঘরবাড়ি ভেঙে পড়ার কথা না।
এদিকে শুরুতেই ঘর ভেঙে পড়ায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন সেখানকার বাসিন্দারা। উপহারের ঘর পাওয়া বিউটি বেগম (৪৫) বলেন, ‘মোক সরকার ঘর দিল কিন্তু এটা কেংকা ঘর? এনা বাতাসোত মোর ঘরের চালা উঁড়ি গিয়া পুখুরোত পড়ল। ছোলপোল নিয়া আল্লাহকে ডাকিছুনু। আল্লাহ রহম কর, প্রাণে বাঁচি গেলে মুই আর ওই ঘরোত থাকিম না। মোর ছোলপোলকে রক্ষা কর। মুই মনোত নিসো, মাঠোতে থাকিম তাও এঙ্কা ঘরোত যাম না আর। মুই মোর ছোলপোলকে হারাতে চাও না। এগলা মানসোক মারার জন্য করসে।’
চাল উড়ে যাওয়া অন্য ঘরের মালিক আর্জিনা বেগম, মতিয়ার রহমান, জাকির হোসেন বলেন, ‘সামান্য ঝড়ে ঘরের চাল সব উড়ায় নিয়ে গেছে। এই ঘরগুলোত থাকা ঝুঁকিপূর্ণ। রড কাঠ উড়ায় গেছে, কাম করছে নিম্নমানের। আশপাশের সব ঘরের চাল নড়বড়ে।’
সখিনা বেওয়া নামের এক সুফলভোগী জানান, গত ২১ বছর আগে স্বামী তালাক দিয়ে অন্যত্র বিয়ে করে। সেই থেকেই দুস্থ বাবার ঝুপড়ি ঘরেই এক মেয়েকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন ছিল তার। ভূমিহীন হওয়ায় জমিসহ পাকা ঘর উপহার পাওয়ার খবরে আনন্দের জোয়ার এসেছিল। কিন্তু সেই আনন্দই এখন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামান্য ঝড়েই ভেঙে গেছে তার বারান্দার পিলার। উড়ে গেছে স্বপ্নের লাল টিন। তার শঙ্কা কোনোদিন হয়তো এই স্বপ্নের পাকাবাড়ির ইটের নিচেই চাপা পড়ে থাকবে তার নিথর দেহ।
সুফলভোগী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী দিয়ে দায়সারাভাবে কাজ সমাপ্ত করা হয়েছে। পিলারে কোনো রড না থাকায় একটু বাতাসেই দুলছে ঘরগুলো। ঘরের অনেক স্থানেই ফাটল ধরেছে। এছাড়াও ঘরে নেই পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা। রাস্তা থেকে বহুদূর জমির মাঝখানে এসব ঘর নির্মাণ করা হলেও চলাচলের মতো রাস্তাও নেই। শুরু থেকেই ভালো মানের কাজের দাবি করে এলেও সুফলভোগীদের সেই দাবি রাখেনি কেউ।’
কিন্তু ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিয়াজ উদ্দিনের ভাষ্য, যারা পেয়েছেন তারা ঘরগুলোতে উঠছেন না। আমরা যে ছোট ছোট তালা লাগিয়ে দিয়েছি তা খুলে তারা দরজা-জানালা খুলে রাখেন। এ কারণে ঝড়ের সময় ঘরে বাতাস ঢুকে চালাসহ উড়ে গেছে। তিনি জানান, সরকারি অর্থেই ঘরগুলোর মেরামত কাজ শুরু হয়েছে। দুই একদিনের মধ্যে সেগুলো ঠিক হয়ে যাবে।
উপজেলায় প্রথমে খাস জমি শনাক্ত করে ভূমি অফিস। পরে ওই খাসজমিতে আধাপাকা বাড়ি নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করে উপজেলা প্রশাসন। উপজেলার মোট ৭৬৯টি আধাপাকা বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে।