চার কারণে ঈদে কন্টেইনার জট নেই চট্টগ্রাম বন্দরে

করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি ও ঈদের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেইনার ও জাহাজ জটের আশঙ্কা করা হলেও এবার কোনো ধরনের জট লাগেনি। বন্দর ইয়ার্ডে কন্টেইনার রয়েছে স্বাভাবিক সময়ের মতো। বহির্নোঙরে পণ্যবাহী জাহাজের সংখ্যাও খুব বেশি নেই। পণ্য উঠানামা ও ডেলিভারিও চলছে নিয়মিত।

বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত বছর এই সময়ে বন্দরে নজিরবিহীন অচলাবস্থা থাকলেও এবার বন্দর কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন কৌশল ও সরকারের সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের কারণে করোনা পরিস্থিতি ও ঈদে অপারেশনাল কার্যক্রম থেকে শুরু করে সবকিছু ছিল স্বাভাবিক।

চট্টগ্রাম বন্দরের পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, বন্দরের সবগুলো ইয়ার্ড মিলে কন্টেইনারের ধারণ ক্ষমতা রয়েছে ৪৯ হাজার ১৮টিইইউস। এর বিপরীতে গত বছর ১০ মে বন্দরে কন্টেইনারের পরিমাণ ছিল ৪৫ হাজার ৬৯৭ টিইইউস। আর চলতি বছর ১০ মে কন্টেইনার পরিমাণ হচ্ছে ৩৬ হাজার ৬৩২ টিইইউস।

বন্দর কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমানে বন্দর ইয়ার্ডে যে কন্টেইনার রয়েছে তা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশি নয়।

প্রতি বছর ঈদ আসলেই কন্টেইনার জট নিয়ে দুর্ভাবনায় পড়েন বন্দর কর্মকর্তারা। ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে অনেকটা শূন্যের কোটায় নেমে আসে ডেলিভারি।

গত বছর ঈদের ছুটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি। মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছিল বন্দর থেকে কন্টেইনার ডেলিভারি। এর ফলে অনেকটা অচল হয়ে পড়েছিল বন্দর।

বন্দর সংশ্লিষ্টদের মতে, এবার ঈদে চট্টগ্রাম বন্দরে জট সৃষ্টি না হওয়ার পেছনে রয়েছে প্রধান চার কারণ।

এগুলো হল- বন্দরের কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রবৃদ্ধি হ্রাস, সিঙ্গাপুর ও কলম্বো বন্দরে জাহাজ জটের কারণে ঈদের পূর্বে কন্টেইনার জাহাজ কম আসা, পোশাক কারখানাগুলো খোলা রাখা ও সড়কপথে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা নির্বিঘ্ন থাকা।

সাম্প্রতিক বছরগুলোকে চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ে ৭-৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও বৈশ্বিক বাণিজ্যে করোনার প্রভাবের কারণে তা নেমে এসেছে মাত্র আড়াই শতাংশে। এই প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া এবারের ঈদে বন্দরে কন্টেইনার জট না হওয়ার অন্যতম কারণ।

আমদানি-রপ্তানি সংশ্লিষ্টরা জানান, গত মার্চ থেকে সিঙ্গাপুর ও কলম্বো বন্দরে চলছে জাহাজ জট। সেখানে বেড়ে গেছে জাহাজের গড় অবস্থান সময়। ঈদের আগে চট্টগ্রাম বন্দরে আসার মত অন্তত ১০ হাজার কন্টেইনার এখনো আটকে আছে বন্দর দু’টিতে। যে কারণে এখানে কন্টেইনার চাপ পড়েনি।

বন্দর সংশ্লিষ্টদের মতে, গত বছর কভিড পরিস্থিতিতে সব ধরনের কল কারখানা বন্ধ ছিল। যে কারণে পোশাক শিল্পের জন্য আমদানি করা কাঁচামাল ডেলিভারি না হয়ে পড়েছিল বন্দর ইয়ার্ডে।

এবার সরকার লকডাউনের মধ্যেও পোশাক কারখানা খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বন্দর থেকে কন্টেইনার ডেলিভারি ছিল পুরোপুরি স্বাভাবিক।

এ ছাড়া, অন্যান্য বছর ঈদকে কেন্দ্র করে পোশাক কারখানাগুলোতে ঈদের আগে ও পরে লম্বা ছুটি থাকলেও এবার করোনা সংক্রমণ মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে মাত্র তিন দিনের ছুটির নির্দেশনা দেয়ায় পোশাক কারখানাগুলো নিজেদের প্রয়োজনে বন্দর থেকে আমদানি করা কাঁচামাল ডেলিভারি নিয়ে যাচ্ছে।

যে কারণে করোনাকালীন ২৪/৭ বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম চালু থাকলেও কোন ধরনের কন্টেইনার জটের সৃষ্টি হয়নি।

অন্যান্য বছর ঈদের সময় সড়ক দুর্ঘটনা এড়াতে মহাসড়কে পণ্যবাহী গাড়ি চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হতো। যে কারণে পণ্য ডেলিভারির গতি কমে যেতো। এবার ঈদে করোনা সংক্রমণ মোকাবিলার অংশ হিসেবে যাত্রীবাহী গাড়ি চলাকালে বিভিন্ন্ বিধিনিষেধ থাকলেও পণ্যবাহী গাড়ি চলাচল করছে নির্বিঘ্নভাবে। বন্দর থেকে কন্টেইনার ডেলিভারি স্বাভাবিক থাকার পেছনে এটাও অন্যতম কারণ।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (ট্রাফিক) এনামুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, এবার করোনা পরিস্থিতি ও ঈদের মৌসুমে আমরা অতীত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েছি। বন্দরে যাতে কন্টেইনার জট সৃষ্টি না হয় সে জন্য আমরা শুরু থেকেই স্টেক হোল্ডারদের সঙ্গে বসে করণীয় বিষয়ে আলাপ আলোচনা করেছি। কন্টেইনার ডেলিভারিতে গতিশীলতা ধরে রাখতে আমরা চার দিনের মধ্যে কন্টেইনার ডেলিভারি না নিলে পেনাল রেন্ট আরোপের সিদ্ধান্তের কথা আমদানিকারকদের জানিয়ে দিয়েছি।

এর ফলে আমদানিকারকরাও যথাসময়ে পণ্য ডেলিভারি নেওয়ার ব্যাপারে সজাগ ছিলেন।

তিনি জানান, সিঙ্গাপুর-কলম্বো বন্দরে সৃষ্ট জটের কারণে আমদানি পণ্যবাহী অনেক কন্টেইনার ঈদের আগে বন্দরে এসে পৌঁছায়নি। এর ফলে এখানে আমদানি পণ্যবাহী কন্টেইনারের চাপও অন্যান্য সময়ের মতো ছিল না। সব মিলে এবার ঈদে বন্দরে জাহাজ জট কিংবা কন্টেইনার জট সৃষ্টির আর কোনো আশঙ্কা নেই বলা যায়।