ফুটবল ম্যাচে গোলকিপারদের কাজ কী? এমন প্রশ্ন করলে একবাক্যে সবাই উত্তর দেবেন গোল বাঁচানো। কিন্তু গোলকিপারদেরও মাঝেমধ্যে গোল করতে দেখা যায়। এমন গোলকিপারও দেখা গেছে যারা প্রায়ই পেনাল্টি বা ফ্রি-কিকও নিয়ে থাকেন। তো হঠাৎ কেন এ আলোচনা তা ভাবতেই পারেন। গোলকিপারদের গোল করা নিয়ে এত কথা বলার কারণ অ্যালিসন বেকার। রবিবার ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে ওয়েস্ট ব্রম ও লিভারপুলের ম্যাচটি ১-১ গোলেই শেষ হচ্ছিল। ম্যাচের ইনজুরি সময়ের শেষ মুহূর্তে কর্নার পায় অল রেডরা। সে সময় প্রতিপক্ষের বক্সে চলে যান বেকার। ট্রেন্ট আলেকজান্ডার-আরনল্ডের নেওয়া কর্নারে দুর্দান্ত এক হেডে গোল করে অল রেডদের গুরুত্বপূর্ণ এক জয় এনে দেন। এতে ইপিএলের শীর্ষ ৪-এ থেকে আগামী মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগ খেলার সম্ভাবনা এখনো টিকে থাকল। ৩৬ ম্যাচে ৬৩ পয়েন্টে পাঁচে উঠে এসেছে লিভারপুল।
গেল ফেব্রুয়ারি মাসে সাঁতার কাটতে গিয়ে পানিতে ডুবে মারা যান ব্রাজিলিয়ান এই গোলকিপারের বাবা অগাস্তিনো বেকার। রবিবার করা গোলটি বাবাকে উৎসর্গ করে বেকার বলেছেন, ‘গেল কয়েক মাসে আমার সঙ্গে যা ঘটেছে তা খুবই আবেগপ্রবণ আমার কাছে, আমার পরিবারের কাছে। কিন্তু ফুটবল হলো আমার মূল জীবন। যতদূর মনে পরে আমি বাবার সঙ্গেই প্রথমে খেলি (ছোটবেলায়)। যদি তিনি আজ থাকতেন এটা দেখার জন্য। কিন্তু আমি নিশ্চিত তিনি এটি সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে বসে দেখেছেন। (গোল) উদযাপনও করেছেন।’ বেকারের গোলের প্রশংসা করে লিভারপুল কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ বলেন, ‘গোলকিপারদের গোলের মধ্যে এটি আমার দেখা অন্যতম সেরা।’
অ্যালিসনের ইতিহাস গড়া গোলের পর সেই গোলরক্ষকদের নামগুলোও নিশ্চয়ই ফুটবলভক্তদের মনে পড়ছে যারা গোলরক্ষার পাশাপাশি গোল করে দলকে জেতাতেও দারুণ পটু ছিলেন। এক-দুবার নয়, কেউ কেউ তো দলের গোল স্কোরিংয়ের অন্যতম অস্ত্র হয়ে উঠেছিলেন।
রেনে হিগুইতা
কলম্বিয়ার এই গোলরক্ষককে সহজে ভুলে যেতে পারবেন না ফুটবলপ্রেমীদের অন্তত কয়েকটি প্রজন্ম। ভাবা যায়, পেশাদারি ক্যারিয়ারে তার ৪১টি গোল আছে। তাকে ‘পাগলা গোলরক্ষক’ বলা হয় তার প্রচণ্ড ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতার কারণে। মাঝেমধ্যে এমন ঝুঁকি নিতেন, যাতে সমর্থকদের আত্মা শুকিয়ে যাওয়ার অবস্থা ঘটত। সুইপার হিসেবে রক্ষণভাগের একজন হয়ে তিনি খেলতেন। অনেক সময় ভূমিকা রাখতেন শেষ রক্ষণসেনার। অচিন্তনীয় সব সেভের জন্য তিনি বিখ্যাত হয়ে উঠেছিলেন। বল হাত দিয়ে গ্রিপ না করে ‘স্করপিয়ান’ স্টাইলে দুই পা পেছনে বাঁকিয়ে গোললাইন থেকে বল ফিরিয়ে দেওয়ার দৃশ্যটি তো ফুটবলের চিরদিনের দৃশ্যগুলোর একটি। ক্যারিয়ারে কোপা লিবার্তাদোরেসসহ অসংখ্য ট্রফি জিতেছেন। তবে হিগুইতা ফুটবল হল অব ফেমে অমর হয়ে থাকবেন আরও একটা মুহূর্তের জন্য। ১৯৯০ বিশ্বকাপে ক্যামেরুনের বিপক্ষে সুইপার ডিফেন্ডারের ভূমিকা রাখার সময় রজার মিলার কাছে বল হারিয়ে দলকে ডুবিয়েছিলেন।
হোসে লুই চিলাভার্ট
তিনি রেনে হিগুইতারই আরেক সংস্করণ ছিলেন। তবে গোল করায় তিনি ছাপিয়ে গিয়েছিলেন কলম্বিয়ানকেও। প্যারাগুইয়ান এই কিপার তার পেশাদার ক্যারিয়ারে গোল করেছেন ৬৭টি। তার অসাধারণ ব্যাপার ছিল নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা। দলের খেলোয়াড়দের সবার পেছনে থেকেও তিনি ছিলেন সবার চেয়ে এগিয়ে।
ফ্রি-কিক থেকে গোল করাকে তিনি রীতিমতো প্রবাদের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি হ্যাটট্রিকও করেছেন। যে কৃতিত্ব আর কোনো গোলরক্ষকের নেই। ক্যারিয়ারে আটটি আন্তর্জাতিক গোল করে নিজেকে নিয়ে গেছেন কিংবদন্তির কাতারে। গোলরক্ষক হিসেবে তার সেভগুলোরও তুলনা হয় না। অসম্ভব সব সেভ তাকে বানিয়েছে একজন পরিপূর্ণ ফুটবলার।
হোর্হে ক্যাম্পোস
১৯৯৪ বিশ্বকাপে ফুল আঁকা রঙিন বাহারি জার্সিতে ব্যাপক আলোচিত ছিলেন ছোটখাটো গড়নের এই মেক্সিকান গোলরক্ষক। ফুটবল মাঠে গোলরক্ষকদের জার্সিতে বিপ্লবই ছিল তার সেই ফ্যাশন। নব্বইয়ের দশকে যখন প্রায় সব গোলরক্ষকই ফুলহাতা জার্সি পরে খেলতেন, তখন ক্যাম্পোস পরতেন হাফহাতা জার্সি। সে জার্সিও ছিল শরীরের মাপের চেয়ে একটু বড়। বল পায়ে নিয়ে অবলীলায় এগিয়ে যেতেন তিনি। প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের একে একে কাটিয়ে আক্রমণ রচনা করতেন। সেট পিসগুলোতে পোস্ট ছেড়ে প্রতিপক্ষের বক্সে এসে ওঁৎ পেতে থাকতেন গোল করার জন্য। পেনাল্টি বিশেষজ্ঞ হিসেবেও দুভাবেই বিখ্যাত ছিলেন। পেনাল্টি তো ঠেকাতেনই, পেনাল্টি থেকে গোল করতে ডাক পড়ত তারই। মেক্সিকোর হয়ে জিতেছেন আন্তর্জাতিক ট্রফিও।
রজেরিও চেনি
অনেকেই তাকে গোলরক্ষকদের ‘মেসি’ বলতে পছন্দ করেন। ব্রাজিলীয় ক্লাব সাও পাওলোর এই গোলরক্ষক তাদের হয়েই গোল করেছেন ১৩১টি! ২২ বছরের ক্যারিয়ারে ৬০টির বেশি ফ্রি-কিক গোল আর ৭০টি পেনাল্টি থেকে গোল আছে চেনির। গোলরক্ষক হিসেবে গোল করার ব্যাপারে তার সেরা সময় ছিল ২০০৫ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যকার সময়টি।
এ সময় তিনি ৪৫টির বেশি গোল করেছিলেন একাই। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এ সময় সাও পাওলোর মূল স্ট্রাইকারদের গোল সাকুল্যে ১৫টিও ছিল না। চেনিই ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গোল করা গোলরক্ষক। তার ধারেকাছেও কেউ নেই।
দিমিতর ইভানকভ
বুলগেরিয়ান গোলরক্ষক দিমিতর ইভানকভ। জাতীয় দলে এক সময় ১ নম্বর জার্সি নিয়ে তার তীব্র লড়াই হতো অন্যের সঙ্গে। জ্রাদকো জ্রাদকভ নামের সেই গোলরক্ষক পিছিয়ে পড়েছিলেন অনেক জায়গাতেই। যে গোলরক্ষক দলে থাকলে একজন ডিফেন্ডার কিংবা একজন স্ট্রাইকারের অভাব অনুভূত হয় না, সে তো যেকোনো দলের জন্যই সম্পদ। ইভানকভ ছিলেন তেমনই এক গোলরক্ষক। তিনি গোল ঠেকাতেন দুর্দান্ত। গোলও করতেন নিয়মিত। পেশাদারি ক্যারিয়ারে তার গোলসংখ্যা ৪২। পেনাল্টি থেকে গোল করার ব্যাপারে ছিলেন দুর্দান্ত।