গঙ্গায় ভাসছে লাশ, চর জুড়ে সমাধি

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পবিত্রতম নদী গঙ্গায় যেন গত কিছুদিন ধরে লাশ উপচে পড়ছে। শত শত লাশ গঙ্গার স্রোতে ভেসে এসেছে অথবা এর তীরে বালিতে চাপা দেওয়া অবস্থায় পাওয়া গেছে। খবর বিবিসি।

ভারতের উত্তর প্রদেশের যেসব জায়গায় নদী তীরে এই দৃশ্য দেখা গেছে, সেখানকার মানুষের ধারণা এগুলো করোনায় মারা যাওয়া মানুষের লাশ।

এই ভয়ংকর চিত্র প্রথম প্রকাশ পায় গত ১০ মে যখন ৭১টি লাশ বিহার সীমান্তের কাছে চাউসা গ্রামের নদী তীরে ভেসে আসে।

গ্রামটি বাক্সার জেলায়, সেখানকার পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট নীরাজ কুমার সিং বলেন, পচে যাওয়া এসব লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে, এগুলোর ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে এবং এরপর নদী তীরের গর্তে এগুলো কবর দেওয়া হয়েছে।

কর্মকর্তারা বলছেন, নদীতীরে লাশ দাহ করার পর যেসব দেহ খণ্ড পড়ে ছিল, সেগুলোই হয়তো নদীতে ভেসে গিয়েছিল, কিছু দেহাবশেষ হয়তো এ রকম কিছু। তবে তাদের সন্দেহ লাশগুলো হয়তো নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। এ রকম ভেসে আসা আরও লাশ আটকানোর জন্য পুলিশ নদীতে একটি জালও পেতেছে।

এর একদিন পর, চাউসা গ্রাম হতে ছয় মাইল দূরে উত্তর প্রদেশের গাজিপুর জেলার গাহমার গ্রামের কাছে নদী তীরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অবস্থায় পাওয়া যায় একেবারে পচে যাওয়া কয়েক ডজন বিকৃত লাশ। বেওয়ারিশ কুকুর ও কাকের খাদ্য হয়ে উঠেছিল এসব মৃতদেহ।

স্থানীয় লোকজন জানান, কয়েক দিন ধরেই নদী তীরে এ রকম লাশ ভেসে আসছিল, এখান থেকে যে পচা গন্ধ ছড়াচ্ছিল সেটির ব্যাপারে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তাদের অভিযোগ আমলে নেননি। এরপর যখন গঙ্গার ভাটিতে বিহারে অনেক লাশ পাওয়ার খবর সংবাদ শিরোনাম হলো, তখনই কেবল কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসলো।

পাশের জেলা বালিয়াতেও ঘটেছে একই ঘটনা। সেখানে গ্রামবাসীরা যখন গঙ্গায় সকালে গোসল করতে গেলেন, তখন দেখলেন ডজন ডজন পচে ফুলে ওঠা লাশ নদীতে ভাসছে। ভারতের হিন্দুস্থান পত্রিকার খবর অনুযায়ী পুলিশ ৬২টি লাশ উদ্ধার করে।

এ দিকে কান্নাউজ, কানপুর, উন্নাও ও প্রয়াগরাজে নদীর তটে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বহু অগভীর কবর। কান্নাউজের মেহন্দি ঘাটে ধারণ করা এক ভিডিওতে দেখা যায় , মানুষের শরীরের আকৃতির সমান বহু ঢিবি। অনেকগুলো দেখতে নদীর চড়ায় ফুলে ওঠা কিছুর মতো, কিন্তু এগুলোর প্রতিটিতেই লুকিয়ে আছে একটি করে মৃতদেহ। কাছের মাহদেভি ঘাটে অন্তত ৫০টি দেহ খুঁজে পাওয়া গেছে।

এসব কবর ও পচা লাশ পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। তাদের আশঙ্কা এসব লাশ থেকে হয়তো তাদের মধ্যে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়বে।

ভারতে হিন্দু ধর্মীয় রীতিতে সাধারণত মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেলা হয়। তবে অনেক সম্প্রদায়ের মধ্যে ‘জল প্রবাহ’ বলে একটি রীতিও প্রচলিত। শিশু, অবিবাহিত মেয়ে কিংবা সংক্রামক রোগে বা সাপের কামড়ে মারা যাওয়া কোন ব্যক্তির লাশ নদীর জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয় এই রীতিতে।

অনেক দরিদ্র পরিবার লাশ দাহ করার আর্থিক সামর্থ্য রাখে না। কাজেই তারা প্রিয়জনের দেহ সাদা মসলিন কাপড়ে মুড়ে নদীতে ফেলে দেয়। অনেক সময় লাশের সঙ্গে পাথর বেঁধে দেওয়া হয় যাতে এটি পানিতে ডুবে যায়। কিন্তু অনেক লাশ এমনিতেই পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। স্বাভাবিক সময়েও গঙ্গায় লাশ ভেসে আসার ঘটনা বিরল কোন দৃশ্য নয়।

তবে যেটা বিরল, তা হলো এত অল্প সময়ের মধ্যে এত বেশি সংখ্যায় লাশ ভেসে আসার ঘটনা। কানপুরের একজন সাংবাদিক জানিয়েছেন, কভিড-১৯ এ মৃতের সরকারি সংখ্যার সঙ্গে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যায় একটা বিরাট গরমিল আছে, এসব মৃতদেহ তারই প্রমাণ।

তিনি বলেন, সরকারি হিসেবে কানপুরে ১৬ এপ্রিল হতে ৫ মে পর্যন্ত ১৯৬ জন মারা গেছে, কিন্তু সাতটি ক্রিমেটোরিয়ামের হিসেব থেকে দেখা যাচ্ছে, সেখানে ৮ হাজার লাশ দাহ করা হয়েছে।

প্রয়াগরাজের একজন সাংবাদিক বলেন, তার বিশ্বাস বেশির ভাগ লাশ সেরকম মানুষের, যারা ঘরে কভিড-১৯ এ মারা গেছেন কোন রকমের পরীক্ষা ছাড়া, অথবা যারা গরিব, লাশ দাহ করার সামর্থ্য পর্যন্ত নেই।

গঙ্গার উৎপত্তি হিমালয়ে, এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় নদীগুলোর একটি। হিন্দুদের কাছে এই নদী খুবই পবিত্র। তাদের বিশ্বাস এই নদীর পানিতে গোসল করলে তাদের পাপ ধুয়ে যায়। এই নদীর পানি তারা ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালনের জন্যও ব্যবহার করে।

গত বুধবার রাজ্য সরকার এরকম ‘জল প্রবাহ’ নিষিদ্ধ করেছে। একই সঙ্গে যেসব গরিব পরিবার লাশ দাহ করার সামর্থ্য রাখে না, তাদের জন্য অর্থ বরাদ্দ করেছে। অনেক জায়গাতেই পুলিশ নদী হতে লাঠি দিয়ে লাশ টেনে তুলছিল এবং নদীতে মাঝিদের সাহায্য নিয়ে এসব লাশ তীরে টেনে আনছিল। সেখানে এসব লাশ খাদে ফেলে কবর দেওয়া হয় অথবা চিতায় তুলে দাহ করা হয়।

ভারতে এ পর্যন্ত আড়াই কোটি মানুষের সংক্রমণ ধরা পড়েছে এবং মারা গেছে ২ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতে এই ভাইরাসে মোট মৃত্যুর সংখ্যা আসলে এর কয়েকগুণ বেশি। যার প্রমাণ হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে এ সব লাশ।