বিশ শতকের প্রখ্যাত সম্পাদক ও প্রগতিশীল মুসলিমদের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার অন্যতম সংগঠক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন ১৯৯৪ সালের ২১ মে মৃত্যুবরণ করেন। ১৮৮৮ সালে চাঁদপুর জেলার পাইকারদি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তিনি। নাসিরউদ্দীনের তেমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। কিন্তু ব্যক্তিগত পড়াশোনা ও জ্ঞানী-গুণীদের সঙ্গে সাহচর্যের মধ্য দিয়ে তিনি বিশ শতকের শুরুর দিকে বাংলার মুসলিম সমাজের একজন বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক ও বুদ্ধিজীবী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। প্রথম জীবনে একটি ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে চাকরির পর তিনি কলকাতায় পাড়ি জমান এবং সাংবাদিকতা পেশা বেছে নেন। ১৯১৮ সালে তিনি ‘সওগাত’ নামে একটি সচিত্র সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করেন। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে ১৯২২ সালে সাময়িকীটির প্রকাশনা স্থগিত হয়ে যায়। ১৯২৬ সাল থেকে পুনরায় ‘সওগাত’ প্রকাশ শুরু হয় এবং ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত অব্যাহতভাবে চলতে থাকে। ১৯২৬ সালেই তিনি ‘সওগাত সাহিত্য মজলিস’ প্রতিষ্ঠা করেন। কাজী নজরুল ইসলাম, বেগম রোকেয়া, শামসুন্নাহার মাহমুদ, সুফিয়া কামালসহ আরও অনেক লেখক-সাহিত্যিক সওগাতে তাদের প্রগতিশীল ও ভিন্নমত প্রকাশ করার মধ্য দিয়ে সমাজে আলোড়ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হন। গোঁড়া মুসলিমদের ব্যাপক প্রতিবাদ সত্ত্বেও মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন লেখক, সাহিত্যিক, ইতিহাসবিদ ও শিক্ষিত মুসলিম নারীদের ছবি সওগাতে ছাপান। কার্টুনের মাধ্যমে সমাজের অব্যবস্থাকে তিনি তীব্রভাবে ব্যঙ্গ করেন। ১৯৩৩ সালে তিনি কলকাতায় ‘সওগাত কালার প্রিন্টিং প্রেস’ প্রতিষ্ঠা করেন। নারী স্বাধীনতার পক্ষে জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে নাসিরউদ্দীন ১৯৪৬ সালে ‘বেগম’ নামে একটি সচিত্র সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেন। দেশ বিভাগের পর নাসিরউদ্দীন পূর্ব বাংলায় চলে আসেন এবং ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ১৯৫৪ সালে ঢাকা থেকে ‘সওগাত’ আবারও নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে। নাসিরউদ্দীন ‘বাংলা একাডেমি পুরস্কার’, ‘একুশে পদক’ ও ‘স্বাধীনতা পদক’সহ বহু সম্মাননা ও পুরস্কারে ভূষিত হন। ১৯৮৯ সালে জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনকে জাতীয়ভাবে সংবর্ধিত করা হয়।