ঠিক কোন শব্দ দিয়ে এককথায় পশ্চিমবঙ্গের এখন যা পরিস্থিতি তা বোঝানো যাবে সেটা ভেবেই গায়ে জ্বর আসছে। জ্বর আসছে না বলে গলদঘর্ম হচ্ছি বললেও বিষয়টির গুরুত্ব কিছু কমে না। অবস্থা এমনই জটিল ও সংকটজনক। একদিকে করোনার হাল খুব খারাপ। এমন কোনো পরিবার নেই যেখানে কেউ না কেউ এই অসুখে ভুগছেন না বা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি নেই। সুস্থ হচ্ছেন এটা যেমন সত্যি, পাশাপাশি এটাও ঠিক যে চেন-অচেনা অসংখ্য মানুষ রোজ চলে যাচ্ছেন এই মারণব্যাধিতে। ভ্যাকসিন পাওয়া যাচ্ছে না। যেটুকু যা মিলছে তার জন্য রাত থেকে লাইন। অক্সিজেন অমিল। হাসপাতালে বেড নেই। বেসরকারি হাসপাতালে এক-দুদিন থাকলেও বিল হচ্ছে লাখ টাকা। এর মধ্যে শুরু হয়েছে লকডাউন। ফলে সমাজের সব স্তরেই অর্থনৈতিক সংকট প্রবল। যাদের টাকা-পয়সা আছে তারা তবু একটু-আধটু সামলে নিচ্ছেন। সব থেকে মুশকিল গরিব ও মধ্যবিত্তের। এটা তো অন্ধকারের একটা দিক মাত্র। তবু একরকম ঠেকনা দিয়ে চলছিল। এরমধ্যে আবার রাজনৈতিক পরিস্থিতি যে দিকে যাচ্ছে তা যথেষ্ট উদ্বেগের।
আপনারা সবাই জানেন মাত্র দিন কয়েক আগে সিবিআই আচমকাই ভোর রাতে তৃণমূলের চার হেভিওয়েট নেতা ফিরহাদ হাকিম, সুব্রত মুখোপাধ্যায়, মদন মিত্র ও শোভন চট্টোপাধ্যায়কে নারোদা মামলায় গ্রেপ্তার করার পরে এ রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ অন্য এক বাঁক নেয়। সুব্রত মুখোপাধ্যায় দলের প্রবীণ নেতা। গ্রাম পঞ্চায়েত মন্ত্রী। বস্তুত এবারের কঠিনতম পরিস্থিতিতে মমতার গ্রামীণ ভোট ব্যাংক অনেকটাই অটুট রাখার কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃতীয়বারের মতো মুখ্যমন্ত্রী হয় জিতে আসার পর, মন্ত্রী, বিধায়কদের শপথ নিতে না নিতে পরিস্থিতি যেদিকে গড়াচ্ছে তাতে আশঙ্কা হচ্ছে যে, আগামী দিনে কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রপতির শাসন জারি করলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। ফিরহাদ হাকিম কলকাতার মেয়র ছিলেন। এবারের নির্বাচনে মমতা ব্রিগেডের অন্যতম দক্ষ সেনাপতি ছিলেন ফিরহাদ বা ববি। মদন মিত্র দীর্ঘদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশ্বস্ত সৈন্য। একদা নেত্রীর ঘনিষ্ঠ শোভন চ্যাটার্জি এখন রাজনীতি থেকে ব্যক্তিগত কারণে সরে থাকলেও ইদানীং কানাঘুষো শোনা যাচ্ছিল যে শোভন ফের কালীঘাট বৃত্তে ফিরতে চলেছেন।
ফলে এরকম এক অপ্রত্যাশিত ধাক্কায় বেসামাল বঙ্গরাজনীতি। করোনা বিধি শিকেয় তুলে খোদ কলকাতা ও অন্যান্য জেলায় তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মী-সমর্থকদের বিজেপির ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ চরিতার্থ করার বিরুদ্ধে একেবারে পথে নেমে পড়তে হলো। রাজনীতির চাপে করোনা পরিস্থিতি পেছনে চলে গিয়ে সামনে চলে এলো নির্বাচিত মমতা সরকার আদৌ নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারবে কি না সেই প্রশ্ন। যে নারোদা মামলা নিয়ে এ রাজ্যের রাজনীতি এত টালমাটাল সেটা ছ’বছর আগের। নারোদা ওয়েব সাইটের মুখ্য সাংবাদিক ম্যাথু স্যামুয়েল এক স্ট্রিং অপারেশন করে একাধিক রাজনৈতিক নেতা সরাসরি তার হাত দিয়ে টাকা, যা আসলে ঘুষ নিচ্ছেন তা প্রকাশ্যে জানিয়ে দেওয়ার পরেই সেসময় ধুন্ধুমার কান্ড বেধে গেছিল। এই ঘটনা ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগের। নাম জড়িয়ে ছিল আজ যাদের সিবিআই ধরেছে তারা-সহ আরও কয়েকজন হেভিওয়েট তৃণমূল নেতার। কাকলি ঘোষ দস্তিদার, অপরূপা পোদ্দার, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মুকুল রায় ও শুভেন্দু অধিকারী। বলা বাহুল্য যে মুকুল ও শুভেন্দু ঘটনাচক্রে এখন বিজেপিতে। শুভেন্দু ভোটের ঠিক আগে আগে দল বদলে নন্দীগ্রামে প্রার্থী হয়ে স্বয়ং মমতাকে হারিয়ে এখন বিরোধী দলের নেতা।
সিবিআই কিন্তু শুভেন্দু অধিকারী আর মুকুল রায়কে বাদ রেখে অন্যদের বিরুদ্ধে মামলা আনল। ফলে বাজারে আওয়াজ উঠল যে এটা এক্কেবারে নির্লজ্জের মতো কেন্দ্রীয় সরকারের তোষণ। আর কেন্দ্রের জিততে না পারার প্রতিশোধ। শুধু জনমনে নয় এই প্রথম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই প্রশ্নে সঙ্গে পেলেন বিরোধী দল, এমনকি তার ঘোর ‘শত্রু’ সিপিএম’কেও। সিপিএম সোজাসাপটা জানিয়ে দিল যে এখন এই ভয়ংকর মহামারীকালে সিবিআই রাতের অন্ধকারে যেভাবে প্রভাবশালী মন্ত্রী নেতাদের ধরেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই যে এ কাজ কেন্দ্রের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ ছাড়া আর কিছুই নয়। মুশকিল হচ্ছে, গোটা বিষয়টি এমন হাস্যকরভাবে ঠিক নির্বাচনী বিজয়ের পরপরই সিবিআই ঘটাল, তাতে নারোদা মামলায় টাকা বা দুর্নীতি প্রসঙ্গ পেছনে চলে গিয়ে জনমনে মমতার বিরুদ্ধে কেন্দ্রের প্রতিহিংসার তত্ত্বই প্রাধান্য পেল।
সুতরাং, এই মুহূর্তে ভোটে জেতার পাশাপাশি আইনি মারপ্যাঁচে গণতন্ত্রের প্রশ্নেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপিবিরোধী রাজনীতির আইকন। সমস্যা হচ্ছে আমাদের কেন্দ্রীয় সরকার, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শা দুজনেই যে গণতন্ত্রের ধার মারান না এটা ক্রমেই শুধু বাংলা নয়, সারা দেশের কাছেই স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া একটু-আধটু মোদি বা সরকারের মৃদু সমালোচনা করলেও যে অবধারিতভাবে তাকে ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা দিয়ে জেলে ঢোকানো হবে এটা এখন আসমুদ্র হিমালয়, মণিপুর, ছত্তিশগড়, কাশ্মীর হয়ে গুজরাট, উত্তর প্রদেশ, কেরল, তামিলনাড়ু, পাঞ্জাবসহ সব রাজ্যের সব মানুষ বুঝে গেছে। এ যেন রাখালের পালে বাঘ পড়ার গল্পের মতো। বাঘ বাঘ বলে রোজ মানুষকে মিথ্যে বিভ্রান্ত করার কারণে রাখাল যেদিন সত্যি বাঘের কবলে পড়ল সেদিন আর একজনও তাকে বাঁচাতে এগিয়ে এলো না। কেন্দ্র রোজ এত মিথ্যে বলে, ফলে এখন যদি সত্যিই নেতারা দুর্নীতি করেও থাকেন বা সিবিআই যথাযথ কারণেই আইনের পথে এগোচ্ছে এমন ধারণাও বিশ্বাসযোগ্যতার তলানিতে, ফলে নিঃসন্দেহে এই মুহূর্তে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে টক্কর দেওয়ার খেলায় ফের ল্যাজেগোবরে। লিখতে লিখতে খবর পেলাম যে চারজন হেভিওয়েট নেতাকে হাইকোর্টের নির্দেশে জেলবন্দি না করে গৃহবন্দি করে রাখা হবে। ঠিক যেমনটি ব্রিটিশ করেছিল নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোসকে। তার এলগিন রোডের বাড়িতে। আপাতত মামলায় পিছু হটলেও সিবিআই এ মামলা সহজে ছাড়বে না এটা বোঝা যাচ্ছে।
এ নাটকের দ্বিতীয় দৃশ্য দেখার জন্য তৈরি থাকুন। এই নাটক কিন্তু বহুমাত্রিক। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক বা দেশের ফেডারেল কাঠামোর ভবিষ্যৎ। কেন্দ্র যেভাবে সংঘাতের পথ বেছে নিচ্ছে তাতে রাজ্যপালের পরামর্শে আগামী কোনো সময়ে রাষ্ট্রপতির শাসন জারি হতেই পারে। আর কে না জানে যে, আমাদের মাননীয় রাজ্যপাল ধনকড় নামেই সংবিধান প্রধান। আদ্যন্ত তিনি আরএসএস ম্যান। আসলে নরেন্দ্র মোদি সরকারের কাছে বৈদেশিক কারণেও ছলেবলে কৌশলে পশ্চিমবঙ্গ দখল করার নীতি গণতন্ত্রের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি কায়েম করতে প্রতিবেশী বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করা কতটা আশু প্রয়োজন তা ভোটের আগে নরেন্দ্র মোদির বেছে বেছে বাংলাদেশের নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সফরের সময়েই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ডামাডোল স্রেফ রাজ্যের সংকট নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিবিধ আন্তর্জাতিক কূটনীতিও।
লেখক : ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক
sdastidar27@gmail.com