আমজনতার বাজেট

বিগত দেড় বছরে করোনা মহামারী মোকাবিলায় বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে বাংলাদেশ অর্থনীতির যে হাল-হকিকত দাঁড়িয়েছে, তাতে সুবর্ণজয়ন্তী বর্ষের বাজেটটি গতানুগতিকতার পরিবর্তে আমজনতার বাজেটে বিবর্তিত হওয়ার যৌক্তিকতা উঠেই আসে। দ্রুত দাঁড়িয়ে যাওয়া উন্নয়নশীল দেশের বাজেট বরাবরই বড়লোকের বাজেটই হয়ে থাকে, আয়বৈষম্য বাড়ানোর উপায় উপাদান সেখানে থাকেই। ‘সকলের কাছ’ থেকে পরোক্ষ কর নিয়ে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া বা দেওয়ানোর ব্যবস্থা না করে আমজনতার সেই করের টাকা মাঝপথে মেরে দেওয়ার ফন্দি-ফিকিরে সময় পারকারী বড়লোক, আমদানি-রপ্তানির পর্যায়ে চালাকির মাধ্যমে টাকা পাচার, আমজনতার কাছ থেকে পথে-ঘাটে দুর্নীতির দ্বারা লুণ্ঠিত অর্থ পাচারকারী বড়লোককে প্রত্যক্ষ করছাড় দেওয়ার যে বাজেট বরাবর তৈরি হয়, ট্রেজারি পক্ষ যদিও সেই বাজেটকে ‘জনগণের বাজেট’ আরেক পক্ষ ‘গরিবের পেটে লাথি মারার’ বলে। আসলে এ দু-এর মধ্যে কোনখানে যে সে থাকে, তা আর দেখা যায় না। সেই বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির তৃপ্তির অতৃপ্তির বাহাসে খোদ জিডিপিই বিব্রত বোধ করে।

কিন্তু চলতি ও আসন্ন বাজেট বর্ষে করোনা-বিধ্বস্ত সার্বিক পরিবেশ পরিস্থিতি সামাল দিতে চিরচেনা শোনা ও জানা পথে পা বাড়ানোর সুযোগ সত্যিই নেই। এখন বাজেটকে হতেই হচ্ছে ‘চাচা আপন বাঁচা’র, ‘জীবন ও জীবিকা’র, ‘জীবন বাঁচাও অর্থনীতি বাঁচাও’ এই ধ্যান ও জ্ঞানের। তবে এটা বলে রাখা ভালো, এ বাজেট জাতীয় বাজেট থেকে আলাদা কোনো বাজেট নয়, এটি হবে যার একটি পরিশীলিত রূপ, বিবর্তিত অবয়ব। যে বাজেটে সবার সক্রিয় অংশগ্রহণে লক্ষ্যমাত্রা (করোনা মোকাবিলায় সক্ষমতা সৃষ্টি, করোনায় বিধ্বস্ত অর্থনীতি গণস্বাস্থ্য জন-শিক্ষা পুনরুদ্ধারের মতো জরুরি বিষয়গুলো প্রাধান্য), যে বাজেটে বরাদ্দকৃত অর্থ প্রকৃত প্রস্তাবে প্রয়োজনীয় খাতে (এ মুহূর্তে যেমন জীবন ও জীবিকা) যথাযথ (ব্যয় সাশ্রয়ী, অর্থায়ন আয় বৃদ্ধি ও কৃচ্ছ্রতা সাধন অর্থে ব্যয় সংকোচন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, সরকারি-বেসরকারি খাত দল-মত-নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধভাবে দুর্যোগ মোকাবিলায়) ব্যবহার এবং আমজনতার ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর মতো কর্মসংস্থান, বেকারত্ব দূর, সবাইকে ন্যায্যমূল্যে খাদ্য সহায়তা সুযোগ সুনিশ্চিত করা এবং সম্পদের সুষম বণ্টন।

বাজেট বাস্তবায়নের দ্বারা সুফলপ্রাপ্তিতে পক্ষপাতিত্ব, এক দেশদর্শিতা, বৈষম্য ও বঞ্চনা বৃদ্ধি কিংবা কর রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রতিপক্ষতার পরিবেশ সৃষ্টির অবকাশ আপাতত এক পাশে থাকবে। নির্বাহী বিভাগ (অর্থ মন্ত্রণালয়) যে নীতি-দৃষ্টিকোণ অবস্থা ব্যবস্থা বাজেটে প্রস্তাব করবেন তা যাচাই-বাছাইয়ে জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী আইন পরিষদের থাকবে তীক্ষণ দায়িত্বশীল দৃষ্টি। বলাবাহুল্য, জনগণের হয়ে জনগণের পক্ষ নিতে আইনপ্রণেতাদের তাদের প্রদত্ত সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার ও দায়িত্ব পালনের এটি মোক্ষম সময়। সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে বাজেট প্রস্তাব প্রণয়ন ও পরীক্ষা এবং বাজেট বাস্তবায়ন উত্তর ‘সম্পূরক বাজেট’ অনুমোদনে জবাবদিহিমূলক পন্থায় না গেলে বাজেট তার সীমাবদ্ধতার বলয় থেকে বের হতে পারবে না। আমজনতার বাজেটে বিবর্তনের পথ এই একটাই।

বরাবরের মতো বাজেটে পরোক্ষ কর মূল্য সংযোজন কর ওরফে ভ্যাটকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আনা হলে সব পণ্য ও সেবার ওপর বিভিন্ন স্তরের ভ্যাট আরোপ এবং ‘ক্ষেত্র বিস্তৃতকরণ’ এবং কর আদায় প্রক্রিয়া সহজীকরণের জন্য ভ্যাট হিসাবায়নে প্রেসক্রাইবকৃত ‘নতুন পদ্ধতি’ চালু হতে আরও বিলম্ব হলে, যা অনলাইন পদ্ধতিতে সহজসাধ্য ও নিয়মনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগকে দূরে রেখে তা অর্জন সম্ভব হবে না। ভ্যাটের ওপর গুরুত্ব বাড়াতে গিয়ে প্রত্যক্ষ করের (আয়কর) প্রতি মনোযোগ হ্রাস কোনো মতেই আমজনতার বাজেট এর জন্য হজমযোগ্য হবে না। আয়কর সংস্কার ও আহরণে কার্যকর জোর পদক্ষেপ গ্রহণে গুরুত্ব আরোপের দৃষ্টিভঙ্গি নড়বড়ে হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং সম্পদের বণ্টন-বৈষম্য দূরীকরণে প্রত্যক্ষ কর এর গুরুত্ব লঘু করে পরোক্ষ কর ভ্যাটের ওপর ভরসা করে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া হলে, প্রত্যক্ষ কর বাড়াতে না পারায় পরোক্ষ করের ওপর চাপ বাড়ালে তা হবে আমজনতার বাজেট দর্শন পরিপন্থী।

মোদ্দা কথা, পাবলিক সেক্টরের অদক্ষতা ও দুর্নীতির দায়ভার বেসরকারি সেক্টরের ওপর চাপানো হলে, সমাজ ও অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্তির নামে বিচ্যুতি বিস্তৃত হলে, উন্নয়ন ব্যয়কে দ্রুত বাস্তবায়ন ও সাশ্রয়ী দৃষ্টিতে না আনতে পারলে, বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতায় রশি না টানতে পারলে, বাজেট বাস্তবায়ন লক্ষ্যভেদি না হলে, বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবিরতা কাটাতে না পারলে, আর্থিক খাতের ক্ষয়িষ্ণু রোগের সুচিকিৎসার মাধ্যমে ভগ্ন স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার না হলে, ব্যাংকিং, রেমিট্যান্স এবং রপ্তানি আয় পরিস্থিতি অনুকূলে আনার প্রয়াসে ঘাটতি দেখা দিলে সুবর্ণজয়ন্তী বর্ষের জাতীয় বাজেট করোনা মহামারীকালে বাঞ্ছিত কাক্সিক্ষত আমজনতার বাজেটে বিবর্তিত হবে না।

এ পর্যায়ে অনেকগুলো প্রসঙ্গের মধ্যে একটি প্রসঙ্গের ওপর কিঞ্চিৎ আলো ফেলতে চাই। বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত সমপর্যায়ের অনেক দেশের তুলনায় বেশ কম। সামগ্রিকভাবে বিষয়টি দেখা দরকার। তিন প্রধান কারণে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত অনেক কম। এক. আওতার সীমাবদ্ধতা, পরিধিগত ঘাটতি। সব যোগ্য করদাতা ও খাতকে করজালের মধ্যে আনার দীর্ঘসূত্রতা বা ক্ষেত্রবিশেষে অপারগতা, অক্ষমতা। দুই. ব্যাপক কর ছাড়, কর রেয়াত, কর ফাঁকি, মামলায় আটকানো, কর্তন কিংবা আদায়কৃত কর রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা না হওয়া। তিন. রাজস্ব বিভাগের দক্ষ লোকবলের অভাব, অদক্ষতা, অপারগতা, মনিটরিংয়ের দুর্বলতা, কর আইন ও আহরণ ও প্রদান পদ্ধতির জটিলতা, মনোভঙ্গি পরিবর্তনের আবশ্যকতা।

করের আওতা সীমিত, জুরিসডিকশন আসলে বাঞ্ছনীয়ভাবে বাড়ছে না। অর্থাৎ, সক্ষম সব করদাতা এবং প্রযোজ্য সব খাত করজালের আওতায় আসেনি। ফলে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়েনি। যেকোনো দেশে জিডিপির অন্তত ১৫-১৬ শতাংশ কর হিসেবে আহরিত হয়। কিন্তু আমাদের কর জিডিপির অনুপাত ১০-১১ শতাংশের মধ্যে দীর্ঘদিন ঘোরাফেরা করছে। এ বছর নানা সংগত কারণে এটি ৭-এ নেমে এসেছে। জিডিপিতে কৃষির অবদান এখনো বেশি। বেশ কয়েক বছর ধরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। এই প্রবৃদ্ধিতে সার্বিকভাবে কৃষির অবদানই বেশি। গত আট-দশ বছরে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় হোক, বন্যা হোক বা ব্যাপক ফসলহানি হোক এ রকম ঘটনা ঘটেনি। সিডর বা আইলা বা আম্ফান ছাড়া বড় ধরনের অঘটন ঘটেনি। ফলে জিডিপিতে কৃষি অব্যাহতভাবে ঊর্ধ্বমুখী অবদান রেখে যাচ্ছে। সেখানে মনোযোগ সহায়তা কমে যাচ্ছে। সেখান থেকে ভ্যালু এডিশনভেদে করের আওতা বাড়ানোর সুযোগ অমনোযোগিতার শিকার।

আওতার ব্যাপারে আরেকটি কথা হলো, এই অর্থনীতি হঠাৎ করে বড় হচ্ছে। এটি ধারাবাহিকভাবে গ্রো করেনি। নব্বই দশক থেকে হঠাৎ বড় করে হচ্ছে অর্থনীতি। আর বড় হচ্ছে যেসব খাত তা হলো তৈরি পোশাক, সেবা, বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ, আর্থিক খাত, টেলিকম, ওষুধ, প্রভৃতি। আরও কিছু খাত উঠতি। এসব খাতে অনেক মুনাফা হচ্ছে, মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। অথচ এদের অনেকে করের আওতায় ভালো করে আসছে না। কর অবকাশের তালিকা দীর্ঘতর হচ্ছে, শিল্প উৎপাদনক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় আসতে কর অবকাশের সুযোগ ব্যবহার ইতিবাচক প্রবণতায় আসতে বিলম্ব হচ্ছে। রপ্তানিমুখী শিল্পের নাম করে পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা এখনো নানা ধাঁচের কর রেয়াত সুবিধা নিচ্ছেন এবং যথেষ্ট কম কর দিচ্ছেন। শুল্ক ও কর রেয়াতের মাধ্যমে উল্টো প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। শহরের বাড়িগুলো জরিপ করার উদ্যোগ বারবার নেওয়া হয়। প্রত্যেক বাড়িওয়ালাকে করের আওতায় আনার কাজ শেষ হয়েও এখনো শেষ হয়নি এবং অনেককেই করের আওতায় আনা হয়নি। যেখানে যেখানে অর্থনীতি দৃশ্যমান হচ্ছে বা বড় হচ্ছে, সেগুলো আসলে করের আওতায় আনার ব্যাপারে দায়িত্বশীল কর্র্তৃপক্ষের প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার দুর্বলতা বা অপারগতার সুযোগে রাজস্ব আয় অর্জিত হচ্ছে না। তার ওপর এই খাতে কালোটাকা কর বঞ্চিত করে স্বল্পহারে কর দিয়ে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। আওতার ক্ষেত্রে সাম্প্রতিকে একটি বিষয়ে অবশ্য অনেক উন্নতি হয়েছে, চাকরিজীবীদের সবাই করের আওতায় এসেছেন। আওতার আরেকটি সীমাবদ্ধতা হলো, যাদের আয় বেশি এমন বড় বড় প্রফেশনের লোকজন ‘ন্যায্য দেয়’ করের আওতায় নেই। চিকিৎসক, প্রকৌশলী, উকিলসহ পেশাজীবী গোষ্ঠীর এখনো অনেকেই কর দেন না, আবার যারা বা দেন, সঠিক বা ন্যায্য পরিমাণে দেন না।

এখানে করদাতা এবং কর আহরণকারী উভয় পক্ষের দায়-দায়িত্ব যথাযথভাবে পরিপালিত হচ্ছে না। দেশ থেকে বিদেশিরা গড়ে ৭/৮ বিলিয়ন রেমিট্যান্স নিয়ে যাচ্ছেন। বিদেশি কর্মীদের করের আওতায় আনার বেলায় অপারগতা জবাবদিহিবিহীন থেকে যাচ্ছে। ভ্যাট পণ্য বা সেবা গ্রহণকারীর কাছ থেকে কাটা করের টাকা, কিন্তু সেটি রাষ্ট্র পাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে কর ব্যবস্থাপনাকে জবাবদিহিমূলক করা যাচ্ছে না। আওতা-সংক্রান্ত ওপরে উল্লিখিত জটিলতা বা সীমাবদ্ধতার কাদায় কর আয়ের বিপুল সম্ভাবনা আটকে যাচ্ছে, অপারগতার অবয়বে লাপাত্তা হচ্ছে। জবাবদিহিবিহীন অবয়ব অবকাঠামোকে স্ব-শাসিত, স্বয়ংক্রিয় ও স্বপ্রণোদিত করা যাচ্ছে না। জাতীয় বাজেটকে আমজনতার বাজেটে বিবর্তনে এসব বিষয়ে কিছু কিছু করে হলেও পরিবর্তনের পথে উঠতে হবে।

লেখক সাবেক সচিব ও সাবেক চেয়ারম্যান এনবিআর