বিশ্ব এখন বাংলাদেশকে দুর্যোগ মোকাবিলার একটা দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশে আরেকটি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে সবাইকে সচেতন ও সতর্ক থাকতে বলেছেন তিনি।
আওয়ামী লীগ মানুষের জন্য রাজনীতি করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় এসেছে মানুষের কল্যাণেই কাজ করেছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে স্বল্পোন্নত দেশে উন্নীত করেছিলেন। আর বর্তমান সরকারের হাত ধরে দেশ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে।’
গতকাল রবিবার মুজিববর্ষ উপলক্ষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় আয়োজিত ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। ভার্চুয়াল মাধ্যমে ১১০টি বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, ৩০টি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র, ৩০টি জেলা ত্রাণ গুদাম-কাম-দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা তথ্যকেন্দ্র ও পাঁচটি মুজিবকিল্লার উদ্বোধন এবং ৫০টি মুজিবকিল্লার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশকে আমরা গড়ে তুলতে চাই শুধু এই দক্ষিণ এশিয়ায় নয়, সারা বিশ্বে একটা উন্নত সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে। জাতির পিতা এই দেশ স্বাধীন করে দিয়ে গেছেন। কাজেই স্বাধীন দেশকে আমরা উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলব।’
তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে যারা ক্ষমতায় আসে তারা তো ঘুমিয়েই কাটাচ্ছিল। নিজেদের সম্পদ গড়তে ব্যস্ত ছিল। দেশের মানুষকে সম্পূর্ণ অবহেলা করেছে। বিপরীতে আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় এসেছে মানুষের কল্যাণেই কাজ করেছে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতির পিতা ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেন, কেউ আমাদের দাবায়া রাখতে পারবে না। বাঙালিকে কেউ দাবায়া রাখতে পারবে না, এটা আমরা বিশ্বাস করি। সঠিক দিক-নির্দেশনা, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য আদর্শ নিয়ে চললে অবশ্যই বাংলাদেশের মানুষকে কেউ কখনো দাবায়া রাখতে পারবে না। আমরা সেভাবেই দেশকে গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। সব দুর্যোগ মোকাবিলা করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। এগিয়ে যাব।’
সরকারপ্রধান বলেন, ‘আজ আমরা ১২ বছর ক্ষমতায়, এর মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশ অর্থাৎ যে কথাটা ২০০৮ সালের নির্বাচনে ঘোষণা দিয়েছিলাম রূপকল্প-২০২১, আমরা তা বাস্তবায়ন করে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, অবকাঠামোর উন্নয়ন করেছি। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছি। ভূমিহীনদের মধ্যে খাসজমি এবং ঘর তৈরি করে দিয়েছি যাতে কোনো মানুষ গৃহহারা না থাকে। এটা জাতির পিতার স্বপ্ন ছিল, আমরা সেটাই বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছি। কাজেই বাংলাদেশের মানুষ গৃহহারা থাকবে না।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘১৯৯৬ সালে যখন ক্ষমতায় আসি তখন বলেছিলাম কোনো কুঁড়েঘর থাকবে না, টিনের ঘর দিলেও দেব, দিয়েছিলাম। এখন সেমিপাকা অথবা দুর্যোগ মোকাবিলায় সহনশীল ঘর তৈরি করে দিচ্ছি; যাতে একটা জায়গা পেলে জীবন রক্ষা পায়। বাংলাদেশ একটা বদ্বীপ, যে কারণে প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হয়। আর তাছাড়া বাংলাদেশে মাঝেমাঝেই মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ আসে। এসব মোকাবিলা করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দুর্যোগ হ্রাসে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে যাতে সতর্কবার্তা পেতে পারি সেই ব্যবস্থা নিয়েছি। দুর্যোগবার্তা পেতে আরও উন্নত ব্যবস্থা করতে হবে এবং আমাদের দ্বিতীয় স্যাটেলাইট যেটা করব, সেটা আরও বেশি শক্তিশালী যাতে হয়, সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দিয়েছি। তাছাড়া নদীভাঙন বা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত যারা হয়, তাদের জন্য বাজেটে আলাদা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস করা এবং দুর্যোগের সময় যেকোনো অবস্থা যাতে মোকাবিলা করা যায়, সেটা আমরা করছি। পাশাপাশি প্রতিবন্ধীদের নিরাপত্তার দিকে নজর রেখে ভবনগুলো তৈরি করা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘আগে প্রাকৃতিক উপায়ে দুর্যোগ মোকাবিলা করা হতো, এটা কিন্তু মানুষ প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। বজ্রপাতে মানুষের যেন মৃত্যু না হয় সেদিকে দৃষ্টি দেওয়া হচ্ছে। তাছাড়া ভূমিকম্প, ভূমিধস, বজ্রপাত বা অগ্নিকাণ্ড সবকিছু থেকে মানুষকে সুরক্ষিত রাখার জন্য যা যা করণীয় সেই ব্যবস্থাগুলো আমরা করে যাচ্ছি। আমরা ইতিমধ্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় ২০২১-৩৫ জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছি। তাছাড়া বাংলাদেশ একটা বদ্বীপ, এই বদ্বীপ অঞ্চলটার সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে আগামী প্রজন্মের জন্য শত বছরের একটা পরিকল্পনা অর্থাৎ ২১০০ সালের জীবনযাত্রা কেমন হবে সেদিকে লক্ষ রেখে ডেল্টাপ্ল্যান করেছি। বদ্বীপ অঞ্চলের মানুষ যাতে সুন্দরভাবে বাঁচতে পারে, নিরাপদে বাঁচতে পারে সেই পরিকল্পনা নিয়েছি। আমাদের লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করব। আল্লাহর রহমতে আজ উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছি।’
সরকারপ্রধান বলেন, ‘আমাদের দুর্যোগ মোকাবিলায় যে সক্ষমতা, সে সক্ষমতা আজ সারা বিশ্বে সমাদৃত। যে কারণে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গ্লোবাল অ্যাডাপটেশন সেন্টারের কার্যালয় বাংলাদেশে স্থাপন করা হয়েছে। আমাদের এত ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও একটা ছোট ভৌগোলিক সীমারেখায় বিশাল জনগোষ্ঠী নিয়ে প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করেও আমরা মানুষের জীবনরক্ষা করতে পারছি।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের ওপর দায়িত্ব পড়েছে এখন সারা বিশ্বে কীভাবে দুর্যোগ মোকাবিলা করা যেতে পারে তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা, মনিটরিং করার। প্রাকৃতিক দুর্যোগ তো বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে আসে, এটা নিয়ে কাজ করার জন্য গ্লোবাল অ্যাডাপটেশন সেন্টারের কার্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। বিশ্ব এখন বাংলাদেশকে দুর্যোগ মোকাবিলার একটা দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখে। এটা বাংলাদেশের জন্য, বাংলাদেশের জনগণের জন্য অত্যন্ত সম্মানজনক বলে আমরা মনে করি।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা এখন একটা দুর্যোগ মোকাবিলা করছি, যেটায় আজ সারা বিশ্ব স্থবির হয়ে আছে। সেটা হচ্ছে করোনাভাইরাস। এই করোনাভাইরাস মানুষের জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করছে। কত আপনজনকে আমাদের হারাতে হলো, কত মানুষের মৃত্যু আজ আমাদের দেখতে হলো। এটা সত্যি খুব দুঃখজনক। আমি সবাইকে অনুরোধ করব, প্রত্যেকে আপনারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবেন। আমরা যেসব নির্দেশনা দিচ্ছি, সেগুলো মেনে চলবেন।’
তিনি বলেন, ‘আমরা জানি কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে আমরা সব ধরনের চেষ্টা করে যাচ্ছি, সেই কষ্টটা লাঘব করতে। তারপরও সবার সহযোগিতা চাই। আপনি নিজে শুধু সুরক্ষিত থাকছেন না, আপনারা আশপাশের মানুষ, পরিবার তাদেরও সুরক্ষিত করছেন। এই কথাটা মনে রেখে স্বাস্থ্যবিধি মেনে আপনারা চলবেন। মাস্ক পরা, এমনকি যারা টিকা নিয়েছেন তাদেরও আমি বলব মাস্ক পরবেন। নিজের বাড়িঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখবেন। আমরা যেন এই দুর্যোগটাও মোকাবিলা করে এগিয়ে যেতে পারি।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি সতর্ক করছি, আরেকটা ঘূর্ণিঝড় কিন্তু আসছে। সেটা কেবল তৈরি হচ্ছে, কতদূর যাবে এখন আধুনিক প্রযুক্তির কারণে আমরা অনেক আগে থেকে জানতে পারি। সেই বিষয়ে যথেষ্ট সতর্কতা আমরা নিতে শুরু করেছি। যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় সবাই সতর্ক থাকবেন, সচেতন থাকবেন।’
অনুষ্ঠানে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন প্রান্তে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুর রহমান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবি তাজুল ইসলাম, মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোহসীনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।