নতুন মাদকে উদ্বেগ

বাংলাদেশে মাদকাসক্তির সমস্যা যত প্রকট, সমাধানে জাতীয় উদ্যোগ সে তুলনায় একেবারেই কম। সারা দেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ ভয়ানক আসক্তির শিকার। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হাফিজুর রহমানের মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে মাদক সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে এসেছে পুলিশের তদন্তে। আইনশৃখলা রক্ষাকারী বাহিনীর তরফে বলা হয়েছে, তদন্ত করতে গিয়ে এলএসডি (লাইসার্জিক অ্যাসিড ডাইথ্যালামাইড) নামের নতুন এক ধরনের মাদকের সন্ধান পাওয়া গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অনলাইন ফার্মাসিউটিক্যাল এনসাইক্লোপিডিয়া ড্রাগস সূত্রে জানা যায়, লাইসার্জিক অ্যাসিড থেকে তৈরি করা হয় এলএসডি। এই অ্যাসিড বিভিন্ন দানাদার শস্যে থাকা এরগোট ছত্রাকে পাওয়া যায়। ১৯৩৮ সালে বিভিন্ন উপাদানের মিশ্রণে প্রথম এলএসডি তৈরি হয়। এটি এতই শক্তিশালী যে, এর ডোজগুলো সাধারণত মাইক্রোগ্রাম হিসেবে নেওয়া হয়। এটি মনের ওপর প্রভাব ফেলে। কখনো কখনো এর প্রভাবে ভীতিকর অনুভূতি তৈরি হয়। এমনটা ঘটলে একে ‘ব্যাড ট্রিপ’ বলা হয়। এটি স্বচ্ছ, গন্ধহীন একটি পদার্থ। যা পাউডার, তরল, ট্যাবলেট বা ক্যাপসুলের আকারে পাওয়া যায়। এলএসডিকে ‘সাইকাডেলিক’ মাদক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এ ধরনের মাদকের প্রভাবে সাধারণত মানুষ নিজের আশপাশের বাস্তবতাকে ভিন্নভাবে অনুভব করে এবং কখনো কখনো অলীক বস্তু প্রত্যক্ষ করে।

গত ১৫ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য বিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের ছাত্র হাফিজুর রহমানের লাশ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পেছন থেকে উদ্ধার করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি থেকে পুলিশ জানিয়েছে, হাফিজ নিজেই এক ডাব বিক্রেতার দা দিয়ে গলা কেটে ফেলেন। গলা কাটার পরও তিনি ছিলেন ভাবলেশহীন। প্রকাশ্যে জনসমাগমের স্থলে এভাবে নিজের গলায় ধারালো দা দিয়ে আঘাতের ভয়ংকর ঘটনার একটি ভিডিওচিত্র অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে। নিজের গলায় দায়ের আঘাতের সময়ে আশপাশের লোকজনের এগিয়ে না আসা নেতিবাচক বার্তা দেয়। এর আগে মাদকাসক্ত হয়ে পরিবারের সদস্য ও পথচারীদের হামলার ঘটনা ঘটলেও নিজের গলায় আঘাত করে মৃত্যুর ঘটনা এটাই প্রথম। পুলিশের তদন্তে যে ‘এলএসডি’র কথা জানা গেছে, তার প্রভাব কতটা সর্বগ্রাসী হতে পারে এ ঘটনা তার উদাহরণ। এলএসডি বিক্রির জন্য ফেইসবুকে গ্রুপ খোলা হয়েছে। অ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ করে নেদারল্যান্ডস থেকে এ মাদক সংগ্রহ করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। বিদেশ থেকে মাদক আমদানি করতে তারা ডিজিটাল মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করে আসছিল। এ থেকে বোঝা যায়, প্রযুক্তির সহায়তায় অপরাধীরা তাদের অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছিল।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে ইয়াবা ছড়িয়ে পড়ার খবর বেশ আলোচিত হয়েছে। দেশে ইয়াবার প্রবেশ ঠেকাতে সরকার মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়েছিল। সরকারের মাদকবিরোধী অভিযান অল্পকিছু বিতর্কিত ঘটনা ছাড়া প্রশংসা পেয়েছিল। ইয়াবা প্রবেশের জন্য প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমারের সমুদ্র সীমান্তে কড়া নজরদারি রাখা হয়েছিল। পরে জানা গেল চট্টগ্রামে ইয়াবার কারখানা তৈরি করা হয়েছে। দেশের মধ্যেই ইয়াবা উৎপাদনের খবর সে সময়ে বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। এখন নতুন যে মাদক এলএসডির কথা বলা হচ্ছে, সেটি প্রচলিত যেকোনো মাদকের চেয়েও ব্যয়বহুল। এর প্রভাবও তুলনামূলক দীর্ঘস্থায়ী। এটি বিদেশ থেকেই দেশে প্রবেশ করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আলোচনায় আসা এলএসডি দেশে কতটা ছড়িয়ে পড়েছে, সেটি খুঁজে বের করাও এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব। ভবিষ্যতে যাতে দেশে কোনো নতুন মাদক প্রবেশ করতে না পারে সে বিষয়েও সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। সীমান্তকে শতভাগ নিñিদ্র করতে হবে। চোরাইপথে মাদকদ্রব্য আনা এবং দেশের ভেতরে ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনে এক বা একাধিক শক্তিশালী চক্র কাজ করে। এ চক্রগুলো শনাক্ত করে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে হবে। অভিযোগ আছে, প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, পেশাদার অপরাধবৃত্তির সঙ্গে জড়িত লোকজন এসব চক্রের অন্তর্ভুক্ত। চিহ্নিত ‘মাদকসম্রাট’ বা মাদক ব্যবসা জগতের রুই-কাতলাদের স্পর্শ না করে খুচরা মাদক বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে স্থায়ী সুফল আশা করা যায় না।

মাদকাসক্তি যে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুতর জাতীয় সমস্যা এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এই সমস্যা থেকে জাতিকে মুক্ত করার সরকারি প্রয়াস কতটা আন্তরিক, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। সরকার আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছে, কিন্তু মাদকদ্রব্যের অবৈধ ব্যবসা ও সেবন একটুও হ্রাস পাচ্ছে না, উল্টো দেশে নতুন মাদক প্রবেশ করছে এটা স্বাভাবিক নয়।