মহামারীকালে পাটশিল্পে সুখবর

বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতির দেশ। আর এক সময় এদেশে অর্থকরী কৃষিপণ্য বলতে পাটই ছিল প্রধান। রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত ছিল পাট। পাটকে ঘিরে গ্রামীণ অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙ্গা ছিল। মূলত নদীপথই ছিল পাট পরিবহনের অন্যতম মাধ্যম। জন্মসূত্রে আমার বেড়ে ওঠা ঐতিহ্যবাহী চিলমারী বন্দরে। খরস্রোতা ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে ছিল চিলমারী বন্দরের ব্যবসা-বাণিজ্য। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান। ষাট-সত্তরের দশক। নিজের চোখে দেখেছি সেই চিলমারী বন্দরের পাটের রমরমা ব্যবসার বাস্তব চিত্র! ছিল হিন্দু মাড়োয়ারি খ্যাত ব্যবসায়ীদের পাটের সুবিশাল গুদাম। শুধু মাড়োয়ারিরাই নয়, সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে ব্যবসায়ীদেরও ছিল বড় বড় পাটের গুদাম। পাটের গুদামগুলোয় ছিল কাঁচাপাট বেল করার মেশিন। দিন-রাত সে কী এক কর্মব্যস্ততার মহাযজ্ঞ! সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই বসত পাট কেনা-বেচার বিরাট হাট। পাটচাষিরা সকালের মধ্যেই হাটে এসে পাট বিক্রি করতেন। দামও ভালো ছিল। আর নিত্যপণ্যের দামও ছিল কম। ফলে এক মণ পাট বিক্রি করে সপ্তাহের পুরো খরচ সেরে নিয়ে পাটচাষিরা বাড়ি ফিরতেন। মূলত তখন মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সংখ্যাও ছিল অনেক বেশি। আর একটি রাষ্ট্রের সচল অর্থনীতির মূল কারিগর হলেন মধ্যবিত্ত শ্রেণি। কারণ যে দেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণি বড়, সে দেশের অর্থনীতিও তত সমৃদ্ধ। বলা হয়, উন্নয়নের প্রতীক মধ্যবিত্ত শ্রেণি। কারণ উদ্যোক্তাদের সৃষ্টি হয় মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে।

পাটের রাজধানী খ্যাত নারায়ণগঞ্জসহ দেশ-বিদেশে পাটের বিশাল বিশাল পানশি নৌকায় পাট আনা-নেওয়া হতো। ফলে চিলমারী বন্দরে ব্রহ্মপুত্রে ছিল ছোট-বড় সারি সারি নৌকা। শুধু চিলমারী বন্দরই নয়, পার্শ্ববতী উলিপুর ও কুড়িগ্রাম তৎকালীন মহুকুমা শহরেও ছিল পাটের রমরমা ব্যবসা। আজ সে সব শুধুই স্মৃতি। কালের বিবর্তনে ও ক্ষমতাসীনদের ভ্রান্তনীতির কারণে পাট হারিয়েছে তার অতীত ঐতিহ্য। এক সময় পাট কৃষকের গলার ফাঁসে পরিণত হয়। উপযুক্ত মূল্যের অভাবে পাটচাষিরা পাটচাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।

স্বপ্ন ছিল, দেশ স্বাধীন হলে পাটশিল্পের উত্থান হবে। পাটকে ঘিরে স্থাপিত হবে নানামুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান। দুর্ভাগ্য, বাঙালি জাতি মহান স্বাধীনতা অর্জন করলেও পাট খাতের সমৃদ্ধি তো আসেনি। উল্টো একে একে পাটশিল্পকে ধ্বংস করা হয়েছে। বিদেশি প্রেসক্রিপশনে এশিয়ার সর্ববৃহৎ পাটকল আদমজীকে বিএনপি-জামাতের চারদলীয় জোট সরকার ধ্বংস করে হাজার হাজার শ্রমিক-কর্মচারীকে বেকার করেছে। শুধু বেকারই নয়, আদমজীর মতো পাটকল ধ্বংসের মধ্য দিয়ে পাটশিল্পকেও ধ্বংস করা হয়েছে। তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা আদমজী বন্ধের তীব্র বিরোধিতা করে ঘোষণা করেছিলেন, তার সরকার ক্ষমতায় গেলে পাটশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, শেখ হাসিনার সরকার দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ করে তৃতীয় মেয়াদে দেশ শাসন করছে। কিন্তু পাটশিল্পের সমৃদ্ধি আর ফিরে আসেনি। উল্টো শেখ হাসিনার সরকার এক সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত সর্বশেষ ২৫টি পাটকল বন্ধ করে পাটশিল্পকে বিরাষ্ট্রীকরণ করেছে। দেশে আজ কোনো রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল নেই। অথচ স্বাধীনতা অর্জনের পর ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ মহামান্য রাষ্ট্রপতির আদেশে ব্যক্তিমালিকানাধীন ও পরিত্যক্ত পাটকলসহ সাবেক ইউপিআইডিসি-এর মোট ৬৭টি পাটকলের তদারকি, পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন বা বিজেএমসি গঠিত হয়।

ইতিমধ্যেই আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করেছি। সময়ের অংকে যা ৫০ বছর। অথচ এই ৫০ বছরে বিজেএমসি’র নিয়ন্ত্রণাধীন ৮২টি পাটকলের একটিও আজ আর অবশিষ্ট নেই। ১৯৮২ সালের পর ৮২টি পাটকলের মধ্যে ৩৫টি পাটকল বিরাষ্ট্রীকরণ, ৮টি মিলের পুঁজি প্রত্যাহার, ১টি পাটকলকে অন্য পাটকলের সঙ্গে একীভূত করে বিজেএমসি নিয়ন্ত্রণাধীন মিল সংখ্যা ৮২টি থেকে কমে ৩৮টিতে এসে দাঁড়ায়। আর এরপর চার দশকে আজ বিজেএমসি বিলুপ্ত না হলেও বিজেএমসি নিয়ন্ত্রণাধীন কোনো পাটকলই আর চালু নেই। একে একে সব বন্ধ হয়ে গেছে।

অন্যদিকে, পাটের বদলে নায়লন, সিনথেটিকের উত্থান গোটা বিশ্বের পরিবেশকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। আজ মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। মানুষ বেঁচে থাকার তাগিদেই পরিবেশ বিধ্বংসী পলিথিন, সিনথেটিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে পরিবেশবান্ধব পাটজাত পণ্য ব্যবহারের দিকেই ঝুঁকে পড়েছে। আমাদের দুর্ভাগ্য, এখন এই সুযোগ কাজে লাগাতে আমাদের দেশে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলও নেই বরং বেসরকারি খাতে পাটশিল্পকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। যারা নানা প্রতিকূলতাকে মোকাবিলা করে পাটজাত পণ্য উৎপাদন করে দেশে-বিদেশে বিপণন করছেন। যারা আয়ও করছেন আশানুরূপভাবে।

গোটা দুনিয়া আজ করোনা মহামারীর ছোবলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য কলকারখানা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এর বিরূপ প্রভাবে রপ্তানি আয়ের সব খাতই আজ ধাক্কা খেয়েছে। এর মাঝেও বাংলাদেশ পাট রপ্তানি করে পূর্ববর্তী বছরের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত ৯ মাসে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে আয় করেছে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বা ১০০ কোটি টাকা। এই অংক গত অর্থবছরের পুরো সময়ের চেয়েও ৮ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। আর যা আগের অর্থবছরের জুলাই মার্চ সময়ের চেয়ে প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি। গত ১৪ এপ্রিল রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত আয়ের হালনাগাদ তথ্যে দেখা গেছে, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে অর্থাৎ জুলাই-মার্চ পর্যন্ত পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ ৯৫ কোটি ৩৫ লাখ ৭০ হাজার ডলার আয় করেছে। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছরে পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে রপ্তানি আয় অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ১৩০ কোটি ডলারে পৌঁছবে বলে আশা করছেন রপ্তানিকারকরা।

উল্লেখ্য, ২০১৯-২০ অর্থবছরে পাটশিল্প খাত থেকে বাংলাদেশ আয় করেছিল ৮৮ কোটি ২৩ লাখ ডলার। আর চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি থেকে ১১৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা ছিল। সে হিসাবে জুলাই-মার্চ এই ৯ মাস সময়ের জন্য লক্ষ্যমাত্রা ধরা ছিল ৮৬ কোটি ১৮ লাখ ডলার। অথচ ইতিমধ্যেই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আয় বেড়েছে ১০ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত অর্থবছর থেকেই বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যে চামড়া খাতকে ছাড়িয়ে দ্বিতীয় স্থান দখলে নিয়েছে পাট খাত। পক্ষান্তরে রপ্তানি আয় কমেছে, পোশাক, চামড়া ও হিমায়িত মাছ রপ্তানিতেও। বাংলাদেশ পাটপণ্য রপ্তানিকারক সমিতির (বিজেজিইএ) চেয়ারম্যান এম সাজ্জাদ হোসাইন সোহেল এ প্রসঙ্গে বলেন, বিশ্ববাজারে দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় টাকার অংকে আমাদের রপ্তানি বেড়েছে সত্য, কিন্তু পরিমাণে খুব একটা বাড়েনি। তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ইতিমধ্যেই অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ভালো অর্ডার পেতে শুরু করেছি। বিশেষ করে কভিড-১৯ এর কারণে পরিবেশ নিয়ে মানুষ উদ্বিগ্ন। ফলে পুরাতন কার্পেটের বদলে নতুন কার্পেটের চাহিদা ইতিমধ্যেই বেড়ে গেছে। আর মানুষও পরিবেশ রক্ষায় পাটজাত পণ্য ব্যবহারের দিকেই বেশি করেই ঝুঁকছে। এতে পাটের একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তিনি মনে করেন এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে পাট ফিরে পেতে পারে সোনালি আঁশের সেই অতীত ঐতিহ্য।

লেখক : কৃষিবিষয়ক লেখক