নারীবান্ধব স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশ

মোছা. সুরাইয়া আক্তার কর্মপরিবেশে নারী ও পুরুষের জন্য ওয়াসের (ওয়াটার, স্যানিটেশন অ্যান্ড হাইজিন) চাহিদা ভিন্নতর। কিন্তু নারীর জন্য বিশেষত মাঠপর্যায়ের কর্মপরিবেশ নির্মাণের ক্ষেত্রে নারীদের বিশেষ চাহিদার কথা যেমন বিবেচনায় নেওয়া হয় না, তেমনি এসব কাজে নারীর যথাযথ প্রতিনিধিত্বও থাকে না। ফলে এসব ক্ষেত্রে যে উদ্যোগই নেওয়া হোক না কেন, সেসব কতটুকু নারীবান্ধব ও স্বাস্থ্যসম্মত হয়, সেটা সহজেই অনুমেয়।

কিন্তু গত কয়েক দশকে দেশের কর্মশক্তির বিকাশ এবং আর্থসামাজিক উন্নয়নে নারীর অগ্রগতি বেশ উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৫ কোটি ৪১ লাখ কর্মজীবীর মধ্যে ১ কোটি ৬২ লাখ নারী। তবে একসময় নারীর পেশা ছিল বেশ গতানুগতিক। কিন্তু বর্তমানে মাঠপর্যায়ে পুলিশ, আলোকচিত্রী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জিক পেশায়ও নারীদের অংশগ্রহণ দিন দিন বাড়ছে। তবে এ ধরনের চ্যালেঞ্জিং পেশায় নারীদের অংশগ্রহণের হার এখনো আশানুরূপ নয়। অন্যদিকে, যারা এ পেশাগুলোতে আছেন তাদের দৈনন্দিন মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে দেশের নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং মাঠপর্যায়ের কর্মপরিবেশ কতটা সহায়ক সে প্রশ্ন করাটা জরুরি।

মাঠপর্যায়ে কর্মপরিবেশ কতটা নারীবান্ধব ও স্বাস্থ্যসম্মত সে বিষয়ের প্রকৃষ্ট উদাহরণ মেলে দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্মিত পাবলিক টয়লেটগুলোতে। বলাবাহুল্য, এর অধিকাংশই যেমন নারীবান্ধব নয়, তেমনি স্বাস্থ্যসম্মতও নয়। ফলে মাঠপর্যায়ে যেসব নারী কাজ করেন তারা নিত্যদিনের প্রয়োজনে এই টয়লেটগুলো ব্যবহার করতে পারেন না। মাঠে কাজ করা নারীদের এজন্য পোহাতে হয় কষ্ট, যা আরও বেড়ে যায় তাদের মাসিককালীন পরিস্থিতিতে।

২০১৭ সালে ট্রাফিক সার্জেন্ট হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে রাজপথে কাজ করতে শুরু করেন দেশের নারী-পুলিশ সদস্যরা। প্রথম দফায় ২৮ জন নারী সার্জেন্ট হিসেবে নিয়োগ পান। বর্তমানে শুধু ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগে কাজ করছেন ১৭৬ জন নারী (বাংলা নিউজ ২৪, ২০২০)। নারী ট্রাফিক পুলিশের সংখ্যা দিনে দিনে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও তাদের স্যানিটেশনসহ কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টি এখনো যথাযথ কর্তৃপক্ষের মনোযোগে আসেনি। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণকারী নারী-পুলিশ সার্জেন বা কনস্টেবলকে সাধারণত সকাল ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত দুই শিফটে দায়িত্ব পালন করতে হয়। এই দীর্ঘ সময়ে স্বাভাবিকভাবেই তাদের একাধিকবার টয়লেটে যাওয়ার প্রয়োজন পড়তে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ ট্রাফিক বক্সে টয়লেটের ব্যবস্থা থাকে না। তাহলে এই ৮ ঘণ্টা একজন ট্রাফিক নারী দায়িত্ব পালনের সময়ে কীভাবে শৌচাগারের প্রয়োজন মেটাবেন? কিংবা মাসের বিশেষ দিনগুলোতে এমন পরিবেশে এই নারীরা কীভাবে কাজ করবেন?

এ প্রসঙ্গে কথা হয়েছিল ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে কর্মরত ট্রাফিক সার্জেন্ট সুলতানার (ছদ্মনাম) সঙ্গে। সুলতানাকে ঢাকার রাজপথে নিয়মানুযায়ী ৮ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। অধিকাংশ সময় তিনি চেষ্টা করেন টয়লেটের কাজ যাতে বাইরে সারতে না হয়। সকালে বের হয়ে দিনশেষে একেবারে বাসায় এসে টয়লেট সারেন। মাঝে চলে যায় প্রায় ১০ ঘণ্টা। এভাবেই চলে দিনের পর দিন। যখন খুব জরুরি প্রয়োজন পড়ে তখন আশপাশের বাস কাউন্টারের কিংবা শপিং মলের প্রায় ব্যবহার-অনুপযোগী টয়লেট ব্যবহার করেন। কিন্তু সুলতানাদের কষ্ট বেড়ে যায় মাসিকের সময়ে। প্রায় ১০ ঘণ্টা ন্যাপকিন পরিবর্তন না করার ফলাফল টের পান বাসায় গেলে। একে তো এ সময় পেটব্যথা, তারপর মেজাজ খিটখিটে, চুলকানির জ্বালা-যন্ত্রণা তো থাকেই। সুলতানা এ সময় ছুটি নিতে চাইলে হয়তো তার ঊর্ধ্বতন কোনো মাসে সেটা বিবেচনা করেন আবার কোনো মাসে বিবেচনা করেন না। জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আপনাদের এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের ভূমিকা কী? উত্তরে বলেছিলেন, শুনেছি তো পুলিশবক্সে ওয়াসরুমের ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু এখনো তার কোনো ফলাফল দেখিনি।

ট্রাফিক পুলিশের মতোই আরেকটি চ্যালেঞ্জিং পেশা হলো সাংবাদিকতা। দেশে প্রায় ১ হাজার নারী সাংবাদিকতা পেশায় আছেন (হোসাইন, প্রথম আলো, ২০১৯)। মাঠপর্যায়ে রিপোর্ট করতে হয় এমন নারী সাংবাদিকরাও একই সমস্যায় ভুক্তভোগী। এ বিষয়ে নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন একটি সংবাদমাধ্যমের সিনিয়র রিপোর্টার ফারহানা হক নীলা। তিনি জানান, পারতপক্ষে তারাও টয়লেট সারেন মাঠে যাওয়ার আগে এবং পরে নিজ গৃহে বা অফিসে ফেরার পর। এর মধ্যে তারা টয়লেট চেপেই রাখেন। মাঝেমধ্যে আট-দশ ঘণ্টায়ও টয়লেটে যাওয়ার সুযোগ হয় না। এই বিপত্তি আরও বেড়ে যায় মাসিক চলাকালীন। টানা আট থেকে দশ ঘণ্টা তাদের একই প্যাড পরে থাকতে হয় এবং টয়লেট টিস্যু ব্যবহার করতে হয়। যদিওবা ভাগ্যক্রমে টয়লেট পেয়েও যান তখন সমস্যা হয় ব্যবহৃত প্যাড কোথায় ফেলবেন সেটা নিয়ে। কারণ পাবলিক টয়লেটগুলোতে ময়লা ফেলার বিন থাকে না। এভাবে দীর্ঘদিনের এই অব্যবস্থাপনায় তাদের নানা স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন হতে হয়। নীলা তাদের ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা জানাতে গিয়ে বলেন, আমাদের অনেক নারী সাংবাদিক আছেন যাদের বিয়ের আট-দশ বছরেও বাচ্চা হচ্ছে না এবং এর অন্যতম কারণ সম্ভবত টয়লেটে যাওয়ার ভয়ে পানি কম খাওয়া, টয়লেট চেপে রাখা এবং মাসিককালীন অব্যবস্থাপনা। নীলা নিজেও একই সমস্যায় ভুগছেন।

নারী স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর দীর্ঘসময় প্রস্রাব চেপে রাখা কিংবা মাসিককালের অব্যবস্থাপনা। এতে শুধু সন্তান জন্মদানে ব্যাঘাত ঘটছে তা নয়, জরায়ুর মুখে ক্যানসার, ইউরিন ইনফেকশনসহ নানাবিধ রোগের সৃষ্টি হচ্ছে। বিষয়টি আরও বিস্তারিত জানতে আমরা বগুড়ার প্রসূতি, স্ত্রীরোগ, বন্ধ্যত্ব বিশেষজ্ঞ এবং সার্জন ডা. ফারহানা ইয়াসমিন রুম্পার সঙ্গে কথা বলি। তিনি বলেন, এমনিতে চার ঘণ্টা পরপর প্যাড পরিবর্তন করা উচিত, না হলে মাসিকের রক্ত থেকে ব্যাক্টেরিয়া ডিক¤েপাজ হয়ে জরায়ু ও যোনি পথে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়। এর ফলে, সাধারণ চুলকানি, জ্বলন থেকে শুরু করে অনবরত সাদাস্রাব হয়ে থাকে। মেয়েদের এ সংক্রমণ পরে ফেলোপিয়ান টিউবে ছড়িয়ে পড়ে, যার কারণে ইনফারটিলিটি বা বন্ধ্যত্ব দেখা দেয়। এ ছাড়া, মাসিককালীন অব্যবস্থাপনা অদূর ভবিষ্যতে নিয়ে আসতে পারে জরায়ুর মুখে ক্যানসারের মতো ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি। ডা. রু¤পা আরও জানান, পর্যাপ্ত পানি না খাওয়া এবং টয়লেট চেপে রাখার কারণে মেয়েদের দুটো বড় সমস্যা হয় প্রথমত, মূত্রনালি সংক্রমণ এবং দ্বিতীয়ত, কিডনির সমস্যা।

নারীদের এসব স্বাস্থ্যঝুঁকির পেছনে দায়ী আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি, অবহেলা, প্রতিকূল কর্মপরিবেশ, সামাজিক ট্যাবু প্রভৃতি। কর্মক্ষেত্রে একজন পুরুষের পাশাপাশি নারীরও শারীরবৃত্তীয় প্রয়োজন সহায়ক ব্যবস্থা করতে হবে এমনটা যদি ভাবা হতো তাহলে নারী পেতেন অনুকূল কর্মপরিবেশ। প্রয়োজনে নারী তার ব্যবহারের জন্য পেত বিভিন্ন জায়গায় জেন্ডার ¯েপসিফাইড টয়লেটের অস্তিত্ব। যার প্রতিটি হতো ফাংশনাল (অর্থাৎ ওয়াশরুমের দরজা ঠিক থাকবে, মজবুত লক সিস্টেম, পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ, টিস্যু ও ব্যবহৃত প্যাড ফেলার ঢাকনাযুক্ত বিনের ব্যবস্থা ইত্যাদি)।

গত ২৮ মে ছিল ‘বিশ্ব মাসিক স্বাস্থ্য দিবস’। এবার এই দিবসটির প্রতিপাদ্য হিসেবে ‘মাসিক স্বাস্থ্য ও ব্যবস্থাপনায় অধিক কার্যক্রম আর বিনিয়োগের ((more action & investment in menstrual health & hygiene now)ি কথা বলা হয়েছে । কিন্তু যে নারীরা বিভিন্ন পেশায় নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ রেখেও মাঠপর্যায়ের কর্মপরিবেশে নিজেদের মৌলিক প্রয়োজনটুকুও মেটাতে পারছেন না, সেখানে আমাদের কার্যক্রম ও বিনিয়োগ কী বিষয়ক হওয়া উচিত? জেন্ডার সংবেদনশীল সমাজ নির্মাণে আমাদের প্রথম কার্যক্রম ও বিনিয়োগ কি হওয়া উচিত নয় নারীর জন্য স্বাস্থ্যবান্ধব এবং মাসিক ব্যবস্থাপনার অনুকূল কর্মপরিবেশ তৈরিতে?

লেখকদ্বয় : যথাক্রমে সহকারী অধ্যাপক ও শিক্ষার্থী সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, হাজী মোহাম্মাদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর

asrafiakram.soc@gmail.com