আমাদের সমাজে চাঁদাবাজি মারাত্মক ব্যাধি হিসেবে যেন স্থায়ী রূপ নিয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে, পাশাপাশি আরও অনেক ক্ষেত্রেই জনজীবনের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, আতঙ্ক তাড়া করে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন পরিবহন খাত, বাজার ও নির্মাণাধীন স্থাপনায় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা দুর্বৃত্ত, সমাজের বলবান অপরাধী চক্র অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। ১৪ জুলাই ‘চট্টগ্রামে চাঁদা না পেয়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা’ শিরোনামে দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি এরই সাক্ষ্যবহ। বলা হয়েছে, দুদিন আগে সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন পরিচয়ে ফোনে চট্টগ্রামের এক ব্যবসায়ীর কাছে দাবি করা হয় ২ কোটি টাকা। চাঁদা না পাওয়ায় ওই ব্যবসায়ীর ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে ঢুকে ভাঙচুর-লুটপাট করে। অভিযোগ আছে, হামলাকারীরা কয়েকটি মোবাইল সেট ও নগদ ৩৫ লাখ টাকা লুট করে। ১৩ জুলাই নগরীর ব্যস্ততম এলাকা চকবাজার থানাধীন চন্দনপুরায় এ ঘটনা ঘটে।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, বিগত ২-৩ মাসে বিভিন্ন সংগঠনের রাজনৈতিক কর্মী, দলীয় নাম ভাঙানো ক্যাডার ও স্থানীয় অপরাধী চক্র চট্টগ্রাম জেলা ও মহানগরে হুমকি দিয়ে চাঁদা আদায়ের বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটিয়েছে। চকবাজারের চন্দনপুরার ঘটনাটি দুর্ধর্ষ বললে অত্যুক্তি হবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই হামলার ভিডিও ফুটেজ সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশিত-প্রচারিত এবং হামলাকারীদের ঔদ্ধত্য ও হামলার ধরনেই প্রতীয়মান হয় ওরা কতটা প্রস্তুতি নিয়ে বেপরোয়া আক্রমণ চালিয়েছে। আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, রাজনৈতিক পট কিংবা সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে যায় চাঁদাবাজ-দুর্বৃত্তদের অবস্থান। বাস্তবতা সাক্ষ্য দেয়, জনজীবনের নিরাপত্তাহরণকারীরা বরাবরই দৃশ্য-অদৃশ্য ‘বটবৃক্ষে’র ছায়াতলে। আমরা যখন এ সম্পাদকীয় লিখছি তখন পর্যন্ত চট্টগ্রামে হামলাকারীদের আইনের আওতায় আনা যায়নি। ভিডিও ফুটেজ সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমানের পরও অপরাধীদের শনাক্তকরণে এত সময়ক্ষেপণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সমাজবিরোধী-দুষ্কৃতকারীদের রাজনৈতিক হীনস্বার্থ চরিতার্থকরণে অসাধু রাজনীতিকদের ব্যবহার কিংবা প্রতিপালনের অভিযোগ নতুন নয়। শুধু রাজনৈতিক সরকারের আমলেই যে ওদের বেপরোয়া দেখা যায় তা-ই নয়, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে আমার লক্ষ্য করেছি ‘মব’-এর দৌরাত্ম্য। আমরা মনে করি, যে সমাজে জননিরাপত্তা ভঙ্গুর, সেখানে যতই উন্নয়ন হোক, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হিসাব করা হোক বা পরিবর্তনের কথা বলা হোক না কেন; মানবাধিকার, জীবনযাত্রার মান ও জননিরাপত্তার বিচারে এগুলো খুবই তুচ্ছ। এ সমাজ মানুষরূপী দানবদের অভয়ারণ্য হয়ে ওঠার পেছনে কারণ অনেক রয়েছে। রাজনীতির নামে অপরাজনীতির অভিশাপ তো আছেই, পাশাপাশি এর অন্যতম কারণ হলো সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা ও অনেক রকম সমীকরণ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর ব্যর্থতার কথা তো এমন প্রেক্ষাপটে সর্বাগ্রে আসবেই; যেহেতু এই বাহিনীগুলো রাষ্ট্র ব্যবস্থার অনুষঙ্গ এবং সরকার নিয়ন্ত্রিত। আর এজন্য দায়ভারটা প্রথমত বর্তায় সরকারের ওপরই।
সংবাদমাধ্যমেই প্রকাশ, মুঠোফোনে কথোপকথনের সময় চট্টগ্রামের হামলার মূল হোতা ডেভিড ইমন নিজেকে সবাই চেনে বলে দাবি করে। এমনকি তার ছবি পুলিশ কমিশনারকে দেখিয়ে চিনে নিতেও বলে। নিকট অতীতে স্মার্ট গ্রুপের মালিকের বাসায় চাঁদা না পেয়ে গুলি করার ঘটনাও সে উল্লেখ করে। প্রতিকার-প্রতিবিধাহীনতার প্রতিফল সমাজের কতটা ভয়ংকর হতে পারে এরই ফের সাক্ষ্য মিলেছে, চট্টগ্রামের সর্বসাম্প্রতিক ঘটনায়। এমতাবস্থায় দায়িত্বশীলদের ব্যর্থতার দায় এড়ানোর অবকাশ আছে বলে আমরা মনে করি না। আমরা চাই, ঘটনার হোতাদের পাশাপাশি তাদের শিকড় সন্ধানক্রমে দৃষ্টান্তযোগ্য দ্রুত আইনি প্রতিবিধান। সমাজে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের দাবি নতুন নয়। এ ব্যাপারে সরকারের অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতিতেও কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু তারপরও কেন দুর্বৃত্তপনার ছায়া সরে না? চট্টগ্রামের ঘটনার উৎস সন্ধান করে দ্রুত কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থার তাগিদ দেওয়ার পাশাপাশি আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর জবাবদিহির ওপরও গুরুত্বারোপ করি। সমাজবিরোধীরা যাতে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় দিতে না পারে এবং তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে কোনো রাজনীতিক যাতে সহানুভূতি না দেখাতে পারেন নিজেদের স্বার্থে, তা নিশ্চিত করতে দলের নীতিনির্ধারকদের অনমনীয় অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে।