গোলাম রব্বানী হেলাল। বাংলাদেশ ফুটবলে এক আলোচিত নাম। খেলোয়াড়ি জীবনে মাঠ ও মাঠের বাইরের অনেক ঘটনার সাক্ষী এই ক্ষণজন্মা ফুটবলার সাংগঠনিক পরিচয়েও আলোচিত ছিলেন। গত বছর ৩০ মে মাত্র ৬৩ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যান হেলাল। তবে বন্ধু, সতীর্থদের স্মৃতিতে ঠিকই বেঁচে আছেন তিনি। গতকাল তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে অনাড়ম্বরভাবে প্রিয় ফুটবলারকে স্মরণ করেছেন বন্ধুরা।
জাতীয় দলের লাল-সবুজ জার্সিতে সেভাবে আলো ছড়াতে না পারলেও ক্লাব ফুটবলে স্বীয় কীর্তিতে হেলাল নিজেকে তারকায় পরিণত করেছিলেন। বিশেষ করে আবাহনীর জার্সিতে নিজেকে বারবার প্রমাণ করেছেন। ১৯৭৫ থেকে ১৯৮৮, এই ১৩ বছরের বেশিরভাগ সময় তার কেটেছে এই ক্লাবে। মাঝে মনোমালিন্য করে কিছুদিন খেলেছেন বিজেএমসিতে, এইটুকুই। খেলা ছাড়ার পরও আবাহনীর সঙ্গে ছিলেন নানা পরিচয়ে। ফুটবল ম্যানেজার, ফুটবল কমিটির সম্পাদক, সবশেষে আবাহনীর পরিচালক। তবে এসব পরিচয় ছাপিয়ে তিনি ছিলেন ক্লাবটির খাঁটি সমর্থক। তাই তো আবাহনী সংশ্লিষ্ট যে কারও দুর্দিনের সময় পাশে পাওয়া যেত হেলালকে।
১৯৮২ সালে আলোচিত আবাহনী-মোহামেডান দ্বৈরথ পরবর্তী ঘটনা তাকে ইতিহাসে ঠাঁই দিয়েছিল। সেই স্মৃতিচারণ করেছেন তারই প্রিয় বন্ধু, আবাহনীর সাবেক অধিনায়ক কাজী আনোয়ার। কাল আবাহনী ক্লাবে বসে আনোয়ার বলেন, ‘লিগ নির্ধারণী সেই ম্যাচে মোহামেডান এগিয়ে ছিল ১-০ গোলে। ৮০ মিনিটে আমার একটি গোল বাতিলকে কেন্দ্র করে আবাহনীর খেলোয়াড়রা চড়াও হয়েছিল রেফারিদের ওপর। সেই উত্তেজনা প্রথমে গ্যালারি, এরপর ছড়িয়ে যায় স্টেডিয়ামের আশপাশের এলাকায়। মেজাজ হারিয়ে আমি প্রথম সহকারী রেফারির ওপর চড়াও হই। এরপর হেলালও তাকে পেটায়। তখন চলছিল সামরিক শাসন। মাঠের সেই গ-গোলকে তারা পুঁজি করে আমাদের চারজনকে সামরিক আদালতের মাধ্যমে দোষী সাব্যস্ত করে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেন। ক্রীড়াঙ্গনে পড়ে কালির ছোপ। আমাকে আর হেলালকে দেওয়া হয় এক বছরের জেল ও এক হাজার টাকা করে জরিমানা। আর অপর দুজনকে (কাজী সালাহউদ্দিন এবং আশরাফউদ্দিন আহমেদ চুন্নু) দেওয়া হয় ছয় মাসের জেল। তখন আমাদের তারকাখ্যাতি আকাশচুম্বী। তাই ঢাকায় এক কারাগারে রাখার সাহস দেখায়নি সে সময়ে সামরিক সরকার। আমাকে আর হেলালকে রাজশাহী ও অন্য দুজনকে পাঠানো হয় যশোর কারাগারে। ১৭দিন কারাবাসের পর অবশ্য আমাদের শাস্তি মওকুফ করা হয়। মজার ব্যাপার হলো ‘জেলমেট’ হেলাল তার আগে টানা আট বছর ছিল আমার আবাহনীর ‘রুমমেট’। আমাদের দুজনের অনেক স্মৃতি। খেলা ছাড়ার পর অর্থেবিত্তে ও অনেক ওপরে উঠে গিয়েছিল। তারপরও কখনই আমাদের ভুলে যায়নি। তাতেই বোঝা গেছে আমাদের প্রতি তার টান ছিল কতটা।’
গতকাল আরেক প্রিয় বন্ধু, তারকা ফুটবলার আব্দুল গাফফারের উদ্যোগে আজিমপুর কবরস্থানে হেলালের কবর জিয়ারত ও শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করা হয়। এছাড়া কোরআন খতমের ব্যবস্থা ও মাদ্রাসার এতিম ছাত্রদের মধ্যে খাবার বিতরণের ব্যবস্থাও করেছিলেন গাফফার। অথচ তার প্রিয় ক্লাব আবাহনী এক বছরেই যেন ভুলে গেছে হেলালকে। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন এমনকি সোনালী অতীত ক্লাবও নেয়নি কোনো উদ্যোগ। বাফুফে সন্ধ্যায় একটি বিবৃতি দিয়ে দায় সেরেছে। যা আক্ষেপ হয়ে ঝরেছে গাফফারের কণ্ঠে, ‘খেলোয়াড়ি জীবনে আমরা চারজন ছিলাম খুব ঘনিষ্ঠ। হেলাল, গাফফার, মঞ্জু, খোকাÑ আমরা চারজন ছিলাম প্রাণের দোস্ত। এই চার দোস্তের মধ্যে হেলালই শুধু নেই। এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারি না। তাই বন্ধুর স্মরণে আমি কিছু উদ্যোগ নিয়েছি। বেশি খুশি হতাম যদি দেখতাম এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে আবাহনী ক্লাব, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন কিংবা সোনালী অতীত ক্লাবের পক্ষ থেকে। কারণ দেশের ফুটবলে হেলালের অবদান অনস্বীকার্য। ওর মতো বড় মাপের মানুষ খুব বেশি খুঁজে পাওয়া যাবে না। যে কারও বিপদে হেলাল যেভাবে সহায়তা করত, সেটা ছিল নজিরবিহীন। জুনিয়র খেলোয়াড়দের ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহ করত হেলাল। ওদের সঙ্গে অনেক সময় কাটাত। অথচ মৃত্যুর এক বছর যেতে না যেতেই অনেকেই তাকে ভুলে গেছে।’
ক্লাব ভুলে গেছে, সুসময়ের সঙ্গীরাও মনে রাখেনি। তবে গাফফার, আনোয়ারের মতো অকৃত্রিম বন্ধু ও কিছু আবাহনী সমর্থকের হৃদয়ে ঠিকই অমর হয়ে আছেন হেলাল।