চীন ঘুরতে গেলে দেখা যাবে প্যারিসের আইফেল টাওয়ার, লন্ডনের টাওয়ার ব্রিজ, ল্যুভর জাদুঘরের ওল্টানো পিরামিড, সিডনির অপেরা হাউজ, আমেরিকার স্ট্যাচু অব লিবার্টি। সেখানে তৈরি হয়েছে বিশে^র নানা শহরের প্রতিলিপি, তাতে যুক্ত হয়েছে দর্শনীয় অনেক কিছু। পর্যটক আকর্ষণের জন্যই তাদের এমন চেষ্টা। চীনের এমন কয়েকটি শহর নিয়ে লিখেছেন আরফাতুন নাবিলা
টেমস টাউন
লন্ডনের টেমস নদীর নাম শোনেননি এমন মানুষ বোধহয় কমই আছে। এই নদীর নামে চীন বানিয়েছে টেমস টাউন। শহরটির নকশা করা হয়েছে ব্রিটিশ ঘরানার বাজারের আদলে। মধ্য চীনের জনবহুল শহর সাংহাই থেকে ১৯ মাইল দূরে এ শহরের অবস্থান। শহরটি ঘুরলে মনে হবে যেন ব্রিটেনের ঐতিহাসিক লিম রেজিস ও বাথ শহর দুটি তুলে আনা হয়েছে চীনে। এখানে পানশালা, রেস্তোরাঁ, বিশালাকার শপিং মল সবই রয়েছে। চীনে পাশ্চাত্য ধাঁচের এমন শহর দেখে বোঝার উপায় নেই, জায়গাটি আসলে লন্ডনে নাকি চীনে অবস্থিত। শহরকে ব্রিটিশ ঘরানার ছাঁচে ফেলতে শহরের কেন্দ্রে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের ব্রোঞ্জের মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। টেমস টাউনে আরও গুরুত্ব পেয়েছে ব্রিটেনের মনোরম স্থাপত্য, নানা নিদর্শন।
শহরের অন্যতম আকর্ষণ টিউডর আমলের ভবনগুলো। (১৪৮৫-১৬০৩ সাল পর্যন্ত ছিল টিউডর শাসনামল। ইংল্যান্ড ও ওয়ালসে মধ্যযুগীয় এ সময়ের স্থাপত্য মেনে ভবন নির্মাণ করা হতো। এটাই ছিল টিউডর স্থাপত্য নকশায় সর্বশেষ ধরণ) । আরও আছে খোয়া বাঁধানো সড়ক, পাব, লাল টেলিফোন বক্স, জেমস বন্ডের ব্রোঞ্জ স্ট্যাচু।
ব্রিটেনের লিম রেজিস শহরে ‘রক পয়েন্ট ইন অ্যান্ড কব গেট ফিশ বার’ (সংক্ষেপে ‘কব’) নামে একটি দোকান আছে। যার মালিক গেইল ক্যাডি। টেমস শহরেও ঠিক এ দোকানের অনুকরণে তৈরি করা হয়েছে আরেকটি দোকান। এখানেই নকলবাজির শেষ নয়। গেইল ক্যাডির দোকানের দরজা থেকে শুরু করে ভেতরের সাজসজ্জা, মাছ রাখার পাত্র, বসার জায়গাসহ পুরো দোকানটিরই নকল করা হয়েছে। বর্তমানে মানুষ এ শহরে বসবাস ছাড়াও অন্য শহরগুলো থেকেও ঘুরতে আসে চীনাদের নকল চমৎকারিত্ব দেখার জন্য।
২০০৬ সালে চীনের পাঁচটি রিয়েল এস্টেট ডেভেলপারের অধ্যবসায় ও পরিশ্রমে তৈরি হয়েছে নকল টেমস শহর। এটি নির্মাণে মোট ব্যয় হয়েছে ৬৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এক স্কয়ার কিলোমিটারের এ শহরে দশ হাজার লোকের বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ২০০১ সালে সাংহাই প্ল্যানিং কমিশনের ‘ওয়ান সিটি, নাইন টাউন’ প্রজেক্টের একটি অংশ এই শহর।
ভেনিস
ইতালির ঐতিহাসিক নগরী ভেনিস। পানির ওপর ভেসে থাকা দৃষ্টিনন্দন প্রাসাদ, তার গা-ঘেঁষে এঁকে-বেঁকে বয়ে চলা স্বচ্ছ লেকের জন্য এর খ্যাতি ভুবনজোড়া। ভেনিসের মতো নান্দনিক শহর পৃথিবীতে খুব কমই আছে। ইতালির নান্দনিকতা উপভোগ করতে আপনাকে ইতালিতে যেতে হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই যাত্রায় চীন কিছুটা বাগড়া দিচ্ছে। কারণ আপনি যখন জানবেন চীনেরও অবিকল ইতালির মতো ভেনিস নামে এক শহর আছে, তখন আপনার মাঝেও দ্বিধা তৈরি হবে আপনি আসল ভেনিস দেখতে চান নাকি নকল। এর কারণ হচ্ছে, নকল হলেও এই শহর নির্মাণ করা হয়েছে ভেনিসের আনাচে-কানাচে একদম একরকম রেখে। চীনের ভেনিস অবস্থিত দালিয়ানে।
আসল ভেনিসে লেকের চারপাশে পুরনো ধাঁচের ভবন রয়েছে। ভবনের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। চার কিলোমিটার লম্বা খাল কেটে এর ওপর চীন তৈরি করেছে ২০০টি ইউরোপিয়ান প্রাচীন ঘরানার ভবন। এর সব কটিই আসল ভেনিসে আছে। এখানে আসল ভেনিসের মতো নৌকায় চড়ে ঘুরে বেড়ানোর স্বাদ নেওয়া যাবে অবলীলায়। ২০১৬ সালে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় এই নকল ভেনিস। পুরো দালিয়ানকে ভেনিসে পরিণত করতে চীনের খরচ পড়েছে প্রায় ৭৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
হলস্টাট
ত্রিকোনাকৃতির বাড়ি আর ঐতিহাসিক চার্চসহ অস্ট্রিয়ার হলস্টাট নগরকে দেখলে যে কেউ একে সাজানো-গোছানো ঐতিহ্যবাহী ইউরোপিয়ান শহরের পোস্টকার্ড ভেবে ভুল করবে। যদি আপনি ভেবে থাকেন অস্ট্রিয়ায় হলস্টাট দেখতে না গিয়ে চীনে যাবেন, তাহলে খুব একটা আশাভঙ্গ হবেন না। আসল হলস্টাট নগরের রয়েছে শত বছরের পুরনো ইতিহাস। ছোট্ট এই নগরটি ইউনেসকোর ঐতিহ্যবাহী তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। চীনের হলস্টাট নগরী প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে গুয়ানডং রাজ্যে। প্রাচীন সব ঐতিহ্য ধারণ করা নকল এ নগরী জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় ২০১২ সালে। ছিমছাম এই শহরের নকশা করেছে চীনের মিনমেটালস কোম্পানি। আসল হলস্টাটের প্রতিটি ইউরোপিয়ান কাঠের বাড়ির নকশা, সাজসজ্জা, এমনকি কেন্দ্রীয় চার্চটি পর্যন্ত একইভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। এই নগর তৈরি করতে খরচ হয়েছে ৯৪০ মিলিয়ন ডলার।
মিনিমেটালস কোম্পানি যখন হলস্টাটের কাজ শুরু করে, তখন পর্যন্ত কেউ বুঝতে পারেনি এটি প্রাচীন কোনো নগর হতে যাচ্ছে। নির্মাণ হওয়ার পর আশপাশের এলাকার মানুষ তো বটেই পুরো চীন বিস্মিত হয়ে যায়। হুইঝু শহর থেকে মাত্র আধা ঘণ্টার দূরত্বে এই নগরের অবস্থান। চীনের হলস্টাট পর্যটকদের নজর কেড়েছে দারুণভাবে। নগরের প্রধান প্লাজাটিকে পরে হলস্টাটের মার্কেটপ্লেস হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এই প্লাজায় ডিজনি থিমের অনেক ছবি আছে।
প্যারিস
বিখ্যাত কোনো জায়গায় কি একসঙ্গে আপনার পক্ষে যাওয়া সম্ভব? অন্য কোনো জায়গায় হয়তো সম্ভব না, তবে চাইলে ফ্রান্সের আইফেল টাওয়ার আর এখান থেকে ১৫ হাজার কিলোমিটার দূরত্বের শন জে লি জে (ঈযধসঢ়ং ঊষুংবব) সড়ককে একসঙ্গে দেখতে পারেন চীনের প্যারিসে। অবিশ্বাস্য লাগলেও সত্য যে, প্যারিস শুধু ফ্রান্সে নয়, আছে চীনেও। সেখানকার সাজসজ্জা আসল প্যারিসের সঙ্গে এতটাই মেলে যে, যে কেউ প্রথম দর্শনে দ্বিধায় পড়ে যেতে পারেন। চীনের পূর্ব উপকূলীয় হাংঝু রাজ্যের তিয়ানডুচেংয়ে এই নকল প্যারিস অবস্থিত। ২০০৭ সাল থেকে এই প্যারিস প্রকল্প মানুষের নজর কেড়েছে। শুরুতে এই জায়গায় দশ হাজার মানুষের থাকার বন্দোবস্ত করার কথা বলা হলেও শেষ অবধি দুই হাজার মানুষের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অনেকেই অবশ্য বেশ নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন।
ফ্রান্সের প্যারিসকে বলা হয় ভালোবাসার শহর। আর প্যারিসের নাম শুনলে সবার আগে আইফেল টাওয়ারের কথা মনে আসে। ভালোবাসার এই জায়গাকে চীন নকল করেছে খুবই দক্ষতার সঙ্গে। আসল আইফেল টাওয়ারের উচ্চতা ৩০০ মিটার। চীন একে নিয়ে এসেছে মাত্র ১০৮ মিটারে। উচ্চতা যাই হোক না কেন, নামে তো এটা আইফেল টাওয়ারই। তাই তো বিয়ের পর দম্পতিরা ভালোবাসার স্মৃতি ধরে রাখতে ছবি তোলার জন্য চলে আসেন এই আইফেল টাওয়ারের সামনে। এটি ছাড়াও প্যারিসে থিয়েটার ও ক্যাফের জন্য বিখ্যাত একটি সড়ক আছে শন জে লি জে (ঈযধসঢ়ং ঊষুংবব) নামে। এই সড়কের অবিকল জিয়াংজি সড়কও নির্মাণ করা হয়েছে নকল প্যারিসে। এই শহরটি মূলত ব্যবহার করা হয় চাষাবাদের জন্য।
আসল ও নকল দুই প্যারিসের মধ্যে তফাত শুধু পাথরে। আসল প্যারিসের বাড়িঘর, দোকানপাট সবকিছুর বয়স অনেক বেশি। প্রাচীন আমলের ঐতিহ্য বলে সেসব স্থাপত্য কিছুটা ফ্যাকাশে হয়ে এসেছে। অন্যদিকে নতুন প্যারিসের সব দালানকোঠা একদম নতুন ও উজ্জ্বল। তিয়ানডুচেং শুধু পর্যটক আকর্ষণ করে তা-ই নয়, বহু মানুষের কর্মসংস্থান করেছে এই শহর। লোকে এখানে এলে পার্কে বেড়াতে যান, হোটেলে থাকেন। এসব স্থানে সেবা দেওয়ার জন্য রয়েছেন অনেকে, যা থেকে তাদের আয় হয়।
শেক্সপিয়ার টাউন
চীনের নকল শহরের গল্প সম্ভবত আরও দীর্ঘ হবে। আপাতত ভবিষ্যতের কথা বলা না গেলেও সম্প্রতি নকল করা উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের বাড়ির কথা বলা যায়। শেক্সপিয়ারের বাড়ি তৈরির জন্য নির্মাণ করা হয়েছে আস্ত একটি শহর। স্ট্রাটফোর্ড অন অ্যাভন নামে যে শহরে নান্দনিক ও বিশিষ্ট এই নাট্যকার জন্মেছিলেন তার আদলে আস্ত একটি শহর নির্মাণ করা হয়েছে দক্ষিণ চীনের জিয়াংগি রাজ্যের ফুঝু শহরে। এই শহর গড়ে তোলা হয়েছে ২২০ একর এলাকা জুড়ে।
এই শহর নির্মাণের জন্য কাজ করেছে শেক্সপিয়ারের জন্মস্থানের ট্রাস্ট অ্যান্ড ফুঝু কালচার এবং ট্যুরিজম ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড। লেখকের সবচেয়ে পুরনো বাড়িটি ১৭০২ সালে ভেঙে ফেলা হয়। সেই বাড়ির সামনে এখনো স্মৃতি রক্ষাকারী একটি বাগান এখনো আছে। নতুন বাড়িতেও এই ছোঁয়া রাখা হয়েছে। ট্রাস্ট কোম্পানি যখন নকল বাড়ি বানানোর জন্য চীনের অংশীদারের সঙ্গে বসে স্থাপত্য বিষয়ে আলোচনা করতে বসে তখন বাড়ির সূক্ষ্ম অনেক বিষয় সামনে আসে। প্রায় দুই বছর আলোচনার পর শহরটি বানানোর কাজে হাত দেওয়া হয়। আশা করা হচ্ছে ২০২২ সাল নাগাদ শহরটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। তবে কভিড পরিস্থিতিতে শহর উদ্বোধনের কাজ আরও পেছানো হবে কি না তা নিয়ে এখনো কিছু জানানো হয়নি।
স্প্যানিশ টাউন
চীনের সাংহাই রাজ্যের শেষ প্রান্তে ঐতিহ্যবাহী স্প্যানিশ এক শহর অবস্থিত। এখানকার ভবনগুলোর দেয়ালে হালকা হলুদ আর উজ্জ্বল লাল রঙা টাইলস ব্যবহার করা হয়েছে। সড়কের দুপাশের স্ট্রিট ল্যাম্পগুলোতে ব্যবহৃত বিদ্যুৎ আসে উইন্ডমিল থেকে। শহরের কেন্দ্রে ব্রোঞ্জের তৈরি বুলফাইটারের মূর্তি রাখা আছে। স্প্যানিশ শহরের সম্পূর্ণ ছোঁয়া আছে বলেই এ শহরকে স্প্যানিশ টাউন বলা হয়। সাংহাইয়ের গ্রামীণ অংশকে যে এমন উচ্চাভিলাষী করে তোলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে সে বিষয়ে অনেকেরই জানা ছিল না। এই শহরের পরিকল্পনাও করা হয়েছে ‘ওয়ান সিটি নাইন টাউন’ এই প্রজেক্টের অংশ হিসেবে। ২০০১ সালে সাংহাইয়ের নগরবিদরা এই পরিকল্পনা করেন। মূল শহরের ওপর চাপ কমাতে এবং শহরের প্রতি মানুষকে আকৃষ্ট করতে এই নগর নির্মাণ করা হয়েছিল। বাড়িগুলোকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে দেশের বাইরে থেকে স্থাপত্য নকশাকার আনা হয়। তবে যেভাবে ভাবা হয়েছিল পরিকল্পনা সেভাবে কাজ করেনি।
ফেংজিয়ান রাজ্যের ফেংচেং থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরত্বে এই শহরের অবস্থান। গণপরিবহনে যেতে সময় লাগে সাড়ে তিন ঘণ্টা। সরাসরি কোনো বাস বা সাবওয়ে লাইন নেই স্প্যানিশ শহরে যাওয়ার জন্য। যথাযথ যাতায়াত ব্যবস্থা আর চাকরি-ব্যবসার সুযোগ কম থাকার কারণে এখানে নগর গড়ে ওঠেনি। দিনে দিনে মানুষ এখানে থাকার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। বর্তমানে নগরটি এক রকম মরুভূমির মতো।
ভবনের প্রতি আকর্ষণ বাড়াতে ‘ওরিয়েন্টাল বার্সেলোনা’ নামও দেওয়া হয়েছে। শহরের প্রধান সড়ক লানবো রোডে স্থানীয় সরকারি ভবনগুলো স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া জরুরি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ভেন্যু, মিউজিয়াম, পার্ক, একটি অপেরা হাউজ, একটি শপিং মলও স্থাপন করা হয়েছে প্রধান সড়কের পাশে। লোকবলের অভাবে এসবের বেশির ভাগ জায়গাই বর্তমানে খালি অথবা বন্ধ। স্প্যানিশ ঘরানায় নির্মিত বলে নগরে অন্য কোনো আদলে ভবন নির্মাণের অনুমতি নেই। ভবন নির্মাণের সময় অবশ্যই কিছু বিষয় লক্ষ রাখতে হবে। যেমন ভবনগুলোর উচ্চতাও ১০ মিটারের বেশি হওয়া যাবে না, ভবন নির্মাণ করলে তার রং অবশ্যই সাদা বা লালই হতে হবে, টাইলসের রং অবশ্যই লাল হবে, লম্বা করিডর অবশ্যই স্প্যানিশ স্টাইলে হতে হবে। যে শহর স্প্যানিশ এত নিয়মকানুন মেনে চলছে, সেখানে মানুষ না থাকলেও ভালো লাগা থেকে চাইলে যেকোনো পর্যটক ঘুরে আসতেই পারেন।