ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আনতে উৎপাদনমুখী শিল্পে করপোরেট করহার কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে। তবে ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (মার্চেন্ট ব্যাংক বিদ্যমান ব্যতীত) করহার অপরিবর্তিত রয়েছে। কিন্তু মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের করহার বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার বাজেট উত্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী। এবারের বাজেটে করোনার প্রভাব মোকাবিলা করে ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাভাবিক রাখতে কর ছাড় দেওয়া হয়েছে।
বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বিরাজমান ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের সঙ্গে একটি প্রতিযোগিতামূলক করহার দেশের বাণিজ্যের প্রসারে ও শিল্পায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ বিষয়টি মাথায় রেখে ব্যবসায়ী মহলের নতুন করপোরেট করহারের প্রস্তাব করেন তিনি।
প্রস্তাবিত বাজেটে করপোরেট কর কমবে : শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি, তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানি, একক ব্যক্তি কোম্পানি, ব্যক্তি-সংঘের, কৃত্রিম ব্যক্তিসত্তা ও অন্যান্য করযোগ্য সত্তার কর কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
করহার বাড়বে : শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত (পাবলিকলি ট্রেডেড) মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, তালিকাভুক্ত নয় এমন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের কর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
করহার অপরিবর্তিত থাকবে : বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, বেসরকারি ডেন্টাল কলেজ, বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ বা কেবলমাত্র তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে শিক্ষাদানে নিয়োজিত বেসরকারি কলেজের ক্ষেত্রে করপোরেট করহার অপরিবর্তিত থাকবে। এ ছাড়া কর অপরিবর্তিত থাকবে পাবলিকলি ট্রেডেড ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান (মার্চেন্ট ব্যাংক বিদ্যমান ব্যতীত), পাবলিকলি ট্রেডেড নয় এরূপ ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, মার্চেন্ট ব্যাংক, সিগারেট, বিড়ি, জর্দা, গুলসহ সব ধরনের তামাকজাত পণ্য প্রস্তুতকারী কোম্পানি, পাবলিকলি ট্রেডেড মোবাইল ফোন কোম্পানি এবং পাবলিকলি ট্রেডেড নয় এমন মোবাইল ফোন কোম্পানি।
এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, করপোরেট কর কমানোর চিন্তুা যৌক্তিক। বিশ্বের অন্যান্য দেশের চেয়ে বাংলাদেশে করপোরেট কর এমনিতেই বেশি ছিল। করোনা মহামারীর আগেই এটি কমানো উচিত ছিল। এখন এই মহামারীতে করপোরেট কর কমানো হলে ব্যবসা-বাণিজ্য টিকিয়ে রাখা সহজ হবে।
বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০১১-২২ অর্থবছরে করপোরেট করহার আরও কমিয়ে নন-লিস্টেড কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে করহার ৩২ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ করার প্রস্তাব করেন। অনুরূপভাবে লিস্টেড কোম্পানির জন্য করহার ২৫ শতাংশ থেকে ২২ দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করেন তিনি।
এক ব্যক্তি কোম্পানির জন্য নন-লিস্টেড কোম্পানির করহার ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রযোজ্য। অর্থনীতিকে অধিকতর আনুষ্ঠানিক করা এবং এক ব্যক্তি কোম্পানির প্রতিষ্ঠা উৎসাহিত করার লক্ষ্যে এক ব্যক্তি কোম্পানির করহার ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী। কোম্পানি ও অন্যান্য প্রস্তাবিত করপোরেট করহার পাবলিকলি ট্রেডেড (শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত) কোম্পানির জন্য বর্তমানে ২৫ শতাংশের পরিবর্তে ২০২১-২২ অর্থবছরে ২২ দশমিক ৫ শতাংশ।
পাবলিকলি ট্রেডেড নয় এমন কোম্পানি ২০২০-২১ সালে ছিল ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ, যা দশমিক ৫ শতাংশ কমিয়ে ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য ৩০ শতাংশ প্রস্তাব করা হয়েছে।
এক ব্যক্তি কোম্পানির জন্য বর্তমানে ৩২ দশমিক ৫ শতাংশের পরিবর্তে ২০২১-২২ অর্থবছরে ২৫ শতাংশ করহার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাবলিকলি ট্রেডেড এরূপ ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে (মার্চেন্ট ব্যাংক বিদ্যমান ব্যতীত) ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ কর প্রস্তাব করা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরে ২০২০-২১ সালে একই হার রয়েছে।
পাবলিকলি ট্রেডেড নয় এরূপ ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ৪০ শতাংশ করহার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা চলতি বছরে একই ছিল। মার্চেন্ট ব্যাংকের ক্ষেত্রেও কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। নতুন অর্থবছরের জন্য ৪০ শতাংশ কর প্রস্তাব করা হয়েছে, যা ২০২০-২১ সালে একই ছিল।
সিগারেট, বিড়ি, জর্দা, গুলসহ সব ধরনের তামাকজাত পণ্য প্রস্তুতকারী কোম্পানির জন্য ৪৫ শতাংশ এবং সারচার্জ ২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রস্তাব করা হয়েছে, যা ২০২০-২১ সালে একই ছিল।
পাবলিকলি ট্রেডেড মোবাইল ফোন কোম্পানি ৪০ শতাংশ এবং পাবলিকলি ট্রেডেড নয় এমন মোবাইল ফোন কোম্পানির জন্য ৪৫ শতাংশ কর প্রস্তাব করা হয়েছে, যা চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে একই রয়েছে।
পাবলিকলি ট্রেডেড মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য করপোরেট করহার ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ২০২১-২২ সালে ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
পাবলিকলি ট্রেডেভ নয় এমন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও সাড়ে ৭ শতাংশ বাড়িয়ে কর ৪০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ব্যক্তি-সংঘের করহার ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
কৃত্রিম ব্যক্তিসত্তা ও অন্যান্য করযোগ্য সত্তার করহার বর্তমানে ব্যক্তিশ্রেণির করহার হিসেবে ধার্য করা রয়েছে, যা নতুন ২০২১-২২ সালের জন্য ৩০ শতাংশ প্রস্তাব করা হয়েছে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, বেসরকারি ডেন্টাল কলেজ, বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ বা কেবলমাত্র তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে শিক্ষাদানে নিয়োজিত বেসরকারি কলেজের ক্ষেত্রে বর্তমানে প্রজ্ঞাপন দ্বারা নির্ধারিত তা নতুন বছরের জন্য ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।