আখেরাতের কল্যাণকর চিন্তা

কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে ইমানদাররা! আল্লাহকে যেমন ভয় করা উচিত ঠিক তেমনিভাবে ভয় করতে থাকো এবং অবশ্যই (পরিপূর্ণ) মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।’সুরা আলে ইমরান : ১০২ 

মহান আল্লাহ কোরআনে আরও বলেন, ‘হে মানবসমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই তার থেকে তার সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করেছেন, আর বিস্তার করেছেন তাদের দুজন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী। আর আল্লাহকে ভয় করো, যার নামে তোমরা একে অপরের কাছে যাঞ্চা (একে অপরের কাছে নিজ নিজ হক দাবি করো) করে থাকো এবং আত্মীয়-জ্ঞাতীদের (রক্ত-সম্পর্কীয়) ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করো। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে সচেতন (তিনি সব দেখছেন ও শুনছেন) রয়েছেন।’ সুরা আন নিসা : ১

হাদিসে আত্মীয়তার সম্পর্কের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার রিজিকের প্রাচুর্য এবং দীর্ঘ জীবনের প্রত্যাশা করে, তার উচিত আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা।’ সহিহ্ বোখারি : ২০৬৭

ইসলামের শিক্ষা হলো মানুষের ভয় যেন কাউকে সত্য জানা সত্ত্বেও তা প্রকাশ করতে বাধা দিতে না পারে। সুতরাং আত্মীয়তার সম্পর্ক তা পিতার দিক থেকে হোক, অথবা মায়ের দিক থেকে হোক তাদের যাবতীয় অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে এবং তা আদায়ের যথাযথ ব্যবস্থা অবলম্বন করতে হবে। এ বিষয়ে আল্লাহ বলছেন, ‘তিনি তোমাদের (মানুষের) ব্যাপারে খুবই সচেতন ও পর্যবেক্ষণকারী।’ মহান আল্লাহ মানুষের অন্তরের ইচ্ছার কথা ভালোভাবে অবগত। সুতরাং শুধু লোকলজ্জার ভয়, আইনি ঝামেলা এড়ানো কিংবা সমাজ ও পরিবেশের চাপে আত্মীয় স্বজনের প্রতি সুব্যবহার করা যাবে না। এমন কাজের কোনো মূল্য আল্লাহর কাছে নেই।

তিনি আরও বলেন, ‘হে ইমানদাররা! তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করো এবং সঠিক কথা বলো। তাহলে তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের কাজগুলোকে সংশোধন করে দেবেন এবং তোমাদের পাপ ক্ষমা করবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্য করে, সে অবশ্যই মহা সাফল্য অর্জন করবে।’ সুরা আহজাব : ৭০-৭১

নিশ্চয় মহা সত্যবাণী হচ্ছে আল্লাহর কিতাব এবং শ্রেষ্ঠ মতাদর্শ হচ্ছে শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ। সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজ হচ্ছে দ্বীনের মধ্যে নবআবিষ্কার করা; আর প্রত্যেক নবআবিষ্কৃত বস্তুই বেদআত ও ভ্রষ্টতা; যার পরিণাম জাহান্নাম। সুতরাং মৃত্যু আসার আগেই যাবতীয় অন্যায় ও গোনাহ থেকে মহান রবের কাছে তওবা করতে হবে। দুনিয়ার নানাবিধ কাজে ব্যস্ত হওয়ার আগে সৎ আমলের প্রতি উদ্যোগী হতে হবে। আপনি এবং মহান রবের মধ্যের সম্পর্ককে বেশি বেশি জিকির-আজকার, নেক আমল, প্রকাশ্য ও গোপন দান, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার মাধ্যমে আরও মজবুত করুন। তাহলে আপনারা রিজিকপ্রাপ্ত (দুনিয়ায় প্রয়োজনীয় যাবতীয় উপকরণ) হবেন, উত্তম প্রতিদান (আখিরাতে ক্ষমা) পাবেন ও সাহায্যপ্রাপ্ত (আল্লাহর দয়া) হবেন।

জেনে রাখুন, মুমিন বান্দা সর্বদা দুটি আশঙ্কার মধ্যে অবস্থান করে। এক. গত হয়ে যাওয়া সময় ও আয়ু, সে জানে না মহান আল্লাহ ওই সময়ের কৃতকর্মের কী প্রতিফল দেবেন। দুই. জীবনের অবশিষ্ট সময়, সে জানে না এই সময়ে আল্লাহতায়ালা তার জন্য কী ফায়সালা করবেন। অতএব বান্দা যেন তার আত্মার মুক্তির জন্য জীবনকে মূল্যায়ন করে, দুনিয়া থেকে আখেরাতের জন্য কিছু সরবরাহ (নেক আমল) করে, বার্ধক্য আসার আগেই যৌবনকে কাজে লাগায় এবং মৃত্যু আসার আগেই যেন জীবন থেকে উপকার গ্রহণ করে। কেননা মৃত্যুর পর সৎকাজ করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের কোনো সুযোগে নেই, আর দুনিয়ার পর জান্নাত বা জাহান্নাম ছাড়া আর কোনো আবাস নেই।

আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তানসন্ততি যেন আমাদের আল্লাহর স্মরণে উদাসীন না করে। আর যারা এরূপ হবে তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত। আর আমি তোমাদের যে রিজিক দিয়েছি তোমরা তা থেকে ব্যয় করবে তোমাদের কারও মৃত্যু আসার আগেই। (অন্যথায় মৃত্যু আসলে সে বলবে,) হে আমার রব! আমাকে আরও কিছু কালের জন্য অবকাশ দিলে আমি সদকা দিতাম ও সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত হতাম! আর যখন কারও নির্ধারিতকাল (মৃত্যু) উপস্থিত হবে, তখন আল্লাহ তাকে কিছুতেই অবকাশ দেবেন না। তোমরা যা আমল করো আল্লাহ সে সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত।’ সুরা মুনাফিকুন : ৯-১১

তিনটি বিষয়ে কোনো মুমিনের অন্তর অবহেলা করতে পারে না। ১. আল্লাহর জন্য নিষ্ঠার সঙ্গে আমল করা। ২. শাসকবর্গের জন্য কল্যাণ কামনা করা এবং ৩. মুসলিম জামাতকে আঁকড়ে ধরা। কেননা মুসলিমদের দোয়া তাদের পরবর্তী (মুসলিমদেরও) শামিল রাখে। সুতরাং যে ব্যক্তির চিন্তাধারা মৃত্যুর পরের জীবন তথা আখেরাতকেন্দ্রিক হবে, আল্লাহ তার যাবতীয় বিচ্ছিন্ন বিষয়কে একত্রিত করে সুসংযত করে দেবেন, তার হৃদয়কে অভাবমুক্ত করবেন এবং তার সামনে দুনিয়া নগণ্য হয়ে দেখা দেবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তির কাছে একমাত্র চিন্তার বিষয় হবে দুনিয়া। আল্লাহ তার কাজগুলোকে এলোমেলো করে দেবেন, তার অভাব-অনটন-চাহিদা-প্রত্যাশা দু’চোখের সামনে লাগিয়ে রাখবেন আর সে তার জন্য দুনিয়ার নির্ধারিত অংশের চেয়ে বেশি কিছুই পাবে না।

কোরআনে কারিমে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের সম্পদ ও সন্তানাদি তো পরীক্ষা বিশেষ, আর আল্লাহর কাছেই রয়েছে মহা পুরস্কার। সুতরাং তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করো, শ্রবণ করো, আনুগত্য করো এবং ব্যয় করো তোমাদের নিজেদেরই কল্যাণের জন্য; আর যাদের অন্তরের কার্পণ্য হতে রক্ষা করা হয়, তারাই তো সফলকাম। যদি তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ (দান-সদকা) দান করো তিনি তোমাদের জন্য তা বহুগুণ বৃদ্ধি করবেন এবং তিনি আমাদের ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহ গুণগ্রাহী, পরম সহিষ্ণু। তিনি অদৃশ্য ও উপস্থিত যাবতীয় বিষয়ের জ্ঞানী, পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ সুরা আত তাগাবুন : ১৫-১৮

৪ জুন, শুক্রবার, মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা। অনুবাদ করেছেন মুহাম্মদ আতিকুর রহমান