করোনার কবলে গোটা বিশ্বই আজ মহাসংকটের মুখে। যার ছোবল থেকে আমাদেরও নিষ্কৃতি মেলেনি। গোটা বিশ্বের অর্থনীতি আজ চরম সংকটে। ফলে আমাদের অর্থনীতিও সংকটাপন্ন। শুধু অর্থনীতিই নয়, জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে আজ তাবৎ দুনিয়ার মানুষ। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের চেয়ে আমাদের দেশে এখনো সংক্রমণ ও মৃত্যুহার তুলনামূলক কম। এটাই আমাদের ভাগ্য! তবে অর্থনৈতিক দুর্দশার জাঁতাকলে পিষ্ট আমাদের বৃহৎ জনগোষ্ঠী। কখন কবে এ ভয়াবহ মহামারীর ছোবল থেকে আমরা মুক্ত হব, তাও অজানা! অজানা এক আতঙ্ক নিয়েই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি সামনের পথে। হঠাৎ করে সম্ভাবনাময় অনেকেই চলে যাচ্ছেন না ফেরার দেশে। সে এক করুণ চিত্র! বিদায় বেলায় আপনজনের স্পর্শও জোটে না মৃত স্বজনের ভাগ্যে!
বৈশি্বক করোনা মহামারীর এক মহাসংকটকালে গত বছরের ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল অচিরেই স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে যাওয়ার আশা প্রকাশ করেছিলেন। দুর্ভাগ্য, অর্থমন্ত্রীর সে আকাক্সক্ষা পূরণ তো হয়ইনি, উল্টো করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মাথায় নিয়ে তৃতীয় ঢেউয়ের শঙ্কার মধ্যে গত ৩ জুন অর্থমন্ত্রী আবার জাতীয় সংসদে ২০২১-২০২২ অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করলেন। এটা করোনাকালে দেশের দ্বিতীয় বাজেট। এই বাজেটে আয় ধরা হয়েছে, ৩ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকার, আর বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ১৪ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা।
স্বাধীনতা-উত্তর ৫০ বছরে এটাই সবচেয়ে বড় অঙ্কের বাজেট, আবার বাজেটে ঘাটতিও বড় অঙ্কের। আর বাজেটে ঘাটতি থাকাই স্বাভাবিক! কারণ মহামারী দুর্যোগে দেশের অর্থনীতির নাজুক অবস্থা। ব্যবসা-বাণিজ্য মুখ থুবড়ে পড়েছে। এখনো সীমান্ত এলাকাসহ সারা দেশেই করোনার সংক্রমণ বেড়ে চলছে। ফলে স্থানীয়ভাবে প্রয়োজনে লকডাউনের ক্ষমতা দিয়ে সরকার আদেশও জারি করেছে। অর্থাৎ করোনার ভরা পরিস্থিতির মধ্যেও অর্থমন্ত্রীর বিশাল অঙ্কের বাজেট ঘোষণা করা দুঃসাহসিক কাজই বটে।
এবার বাজেটের আকার গত অর্থবছরের তুলনায় যে পরিমাণ বেড়েছে, সেই আনুপাতিক হারে কৃষি খাতে বরাদ্দ ও ভর্তুকি বাড়ানো হয়নি। গত অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটে কৃষিতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৭ হাজার ২৩ কোটি টাকা। যা মূল বাজেটের ৫.৩৯ শতাংশ। এ বছর বাজেটে কৃষি খাতে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ৩১ হাজার ৯৯৫ কোটি টাকা। যা মূল বাজেটের ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। গত অর্থবছরের মূল বাজেটের ৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছিল কৃষিতে।
যেখানে কৃষিই আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, সেখানে করোনা মহামারীর এই দুর্যোগ মোকাবিলায় কৃষি খাতকেই বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ এ চ্যালেঞ্জে একমাত্র কৃষিকে সমৃদ্ধ করেই আমরা খেয়ে বেঁচে টিকে থাকার চেষ্টা করতে পারব। অবশ্য অর্থমন্ত্রী এই বাজেটে দেশকে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার কথা গুরুত্বের সঙ্গে বলেছেন। এমনকি এবারের বাজেটে শর্তসাপেক্ষে দেশের উৎপাদিত সব ধরনের ফল, শাক-সবজি, প্রসেসিং শিল্প, দুধ ও দুগ্ধজাতপণ্য উৎপাদন, সম্পূর্ণ দেশীয় কৃষি থেকে শিশুখাদ্য উৎপাদনকারী শিল্প, কৃষিযন্ত্র উৎপাদনকারী শিল্পের জন্য ১০ বছরের করমুক্ত সুবিধার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেন, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং খাদ্য নিরাপত্তা খাতের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে নানামুখী কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এমনকি করোনার প্রভাব মোকাবিলায় বিগত বছরগুলোর মতো কৃষি খাতে ভর্তুকি, সার-বীজসহ অন্যান্য কৃষি উপকরণে প্রণোদনা ও সহায়তা কার্ড, কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা, স্বল্প সুদে ও সহজ শর্তে বিশেষ ঋণ সুবিধা দেওয়ার মতো কার্যক্রমও অব্যাহত রাখা হবে মর্মে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
উল্লেখ্য, ২০০০ সালেও কৃষিতে শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা ৬০ শতাংশ ছিল। গত দুই দশকে কৃষি শ্রমিকের পরিমাণ কমতে কমতে এখন ৪০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ফলে কৃষি মজুরের সংকট যেমন বেড়েছে, তেমনি মূল্যও অনেক বেড়েছে। দেশের অধিকাংশ কৃষকের পক্ষে বাড়তি শ্রমমূল্যে চাষাবাদ করা অলাভজনক হয়ে পড়ছে। ফলে কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণের কোনো বিকল্প নেই। ফলে কৃষি চাষাবাদ, কর্তন ও প্রসেস করার যন্ত্রপাতি ক্রয়ে কৃষককে কৃষি ভর্তুকির আওতায় সুযোগ প্রদানের পাশাপাশি সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি কৃষিঋণেরও ব্যবস্থা করা জরুরি। অবশ্য অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেন, কৃষিজাত পণ্য আমদানি বিকল্প তৈরির মাধ্যমে কৃষিভিত্তিক শিল্পের বিকাশ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ এখনো কৃষিপ্রধান দেশ এবং কৃষিই আমাদের অগ্রাধিকার প্রাপ্ত খাত। ফলে কৃষি খাতের উন্নয়নে প্রধান উপকরণগুলো বিশেষ করে সার, বীজ, কীটনাশক ইত্যাদি আমদানিতে শূন্য শুল্কহার অব্যাহত রাখা হবে মর্মে তিনি মন্তব্য করেন।
প্রকৃত অর্থে কৃষির উন্নয়নে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা উচিত। যদিও গত ২০২০-২১ অর্থবছরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ১৫ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা। পরে তা সংশোধন করে কমিয়ে ১৪ হাজার ২১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে বাজেট পাস করা হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য ১৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। আমরা মনে করি, বাজেটের আকার হিসেবে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দের পরিমাণ আরও বেশি হওয়া উচিত ছিল। তবে সমস্যার জায়গাটি হচ্ছে, করোনার কারণে স্বাস্থ্য খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া। যেহেতু জীবনের মূল্য সবার আগে, সেহেতু স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বরাদ্দ বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। তবে, স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি, অপচয়ের পরিমাণ দেখে দেশবাসী স্তম্ভিত হয়েছে। আমরা মনে করি, স্বাস্থ্য খাতে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, যাতে জনগণের অর্থ দুর্নীতি, লুটপাটে জলে চলে না যায়, সেটাও সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি, অপচয় ও লুটপাটের যে চিত্র সম্প্রতি জাতীয় সংসদে সংসদ সদস্য মুজিবুল হক চুন্নু তুলে ধরলেন, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
আমাদের বাংলাদেশ বৃহৎ জনগোষ্ঠীর দেশ। এ দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যাই বেশি। ফলে মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। করোনার বিরূপ প্রভাবে গোটা বিশ্বেই খাদ্য সংকট কমবেশি লেগেই আছে। গত বছর করোনা মহামারীর লকডাউনের সময় জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি বিষয়ক সংস্থা (এফএও) আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল, বিশ্বজুড়েই খাদ্য সংকট সৃষ্টি হতে পারে। হতে পারে দুর্ভিক্ষ। সংস্থাটির মতে, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো ক্ষুদ্র অর্থনীতির দেশে এই সংকট ক্রমেই ঘনীভূত হবে।
পিপিআরসি ও বিআইজিডি পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, করোনা পরিস্থিতিতে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন আমাদের দেশের মাঝারি ও অতিদরিদ্র মানুষ। সৃষ্টি হচ্ছে নতুন এক দরিদ্র শ্রেণির। কর্মহীন হয়ে পড়েছেন কোটি কোটি মানুষ। এতে শহরাঞ্চলে ৮২ শতাংশ ও গ্রামাঞ্চলে ৭৯ শতাংশ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। ভুক্তভোগী মানুষ খাবারের ব্যয়ও কমিয়ে দিচ্ছেন। ফলে অপুষ্টির আধিক্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমনকি বাড়তি দামের কারণেও সাধারণ ভোক্তারা চাল, আটা ও নিত্যপণ্য প্রয়োজনীয় মাফিক কিনতে পারছেন না। ইতিমধ্যে বোরো ধান কাটা মাড়াই শেষ হয়েছে। ধারণা ছিল, নতুন চাল বাজারে এলে স্বভাবতই চালের দাম কমে আসবে। তা কিন্তু হয়নি। এখনো চালের দাম বেশ চড়া। আবার সরকারের খাদ্য মজুদ পরিস্থিতিও ভালো না। গত আমন মৌসুমেই সরকারি মজুদ তলানিতে চলে এসেছিল। ফলে সরকারি-বেসরকারিভাবে দ্রুত চাল আমদানির উদ্যোগ নিয়েও সরকার চালের মজুদ বাড়াতে পারেনি। মূলত আফ্রিকার দেশগুলোতে তীব্র খাদ্য সংকটের কারণে বিশ্বজুড়েই চালের দাম বেশি ছিল। যা এখনো বিদ্যমান রয়েছে।
বাস্তবে এ অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়ে সরকার দেশে উৎপাদিত ধান, চাল অভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহ করে খাদ্য মজুদ গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। সরকার এ বছর ধান, চাল মিলে ১৭-১৮ লাখ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য মজুদের পরিকল্পনা নিয়ে সংগ্রহ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। যা আগামী ৩০ আগস্ট পর্যন্ত চলবে। ইতিমধ্যেই ধান-চালের বাজার বেশি থাকায় চালকল মালিকদের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে খাদ্য বিভাগকে চাল সরবরাহ করতে হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত সরকারের খাদ্য মজুদ কী পরিমাণ হয়, তা এই মুহূর্তে বলাও মুশকিল! সংগত কারণেই অভ্যন্তরীণ সংগ্রহের পাশাপাশি জিটুজি পদ্ধতিতে বাড়তি দামে হলেও চাল আমদানির ওপর জোর দেওয়া উচিত। তাহলে সরকারি মজুদ গড়ে তুলে নিম্নআয়ের মানুষদের জন্য ন্যায্যমূল্যে খাদ্য বিক্রি ও বিভিন্ন চ্যানেলে খাদ্য সরবরাহকে নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। অর্থাৎ খাদ্য নিরাপত্তা ও ভোক্তার স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে বাজেটে এ খাতেও বরাদ্দ বাড়ানো উচিত। পাশাপাশি খাদ্যশস্য, সবজি সংরক্ষণ উপযোগী হিমাগার ও খাদ্য গুদাম নির্মাণের জন্য বাজেটে বরাদ্দ রেখে কৃষকের প্রত্যাশা সরকার পূরণ করবে, এটাই সাধারণ মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা।
লেখক কৃষিবিষয়ক লেখক
ahairanju@gmail.com