বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা এবং উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা নিয়ে বোধের একটি পরীক্ষা হয়ে গেল। গত কিছুদিনে ঢাকায় অসহায়ত্ব, অপমান আর আন্দোলনের জটিল চিত্র তৈরি হয়েছে। অসহায়ত্ব নগরবাসীর, কারখানা শ্রমিক ও কর্মচারীর। বিশেষত নারী ও শিশুদের। এ শহরে বৃদ্ধ এবং শারীরিক প্রতিবন্ধীর জায়গা নেই। তারা উপেক্ষিত সব ক্ষেত্রে। কিন্তু যারা সক্ষম এবং কর্মরত, তাদের বিষয়ে ভাবনা কই? বৃষ্টি আর জমে থাকা পানি পার হয়ে কীভাবে তারা যাতায়াত করবেন? তা দেখা এবং দায় নেওয়ার কেউ নেই! পানি জমে আছে প্রধান সড়কে, গুরুত্বপূর্ণ এলাকায়। একদিকে হাঁটু পানি অতিক্রম করে পরীক্ষাকেন্দ্রে যাওয়ার কষ্ট, অন্যদিকে শিক্ষামন্ত্রীর কথায় শিক্ষার্থীরা রাস্তায় বিক্ষোভ করছে। শিক্ষার্থীরা দাবি করছে, প্রচণ্ড বৃষ্টি এবং জলাবদ্ধতার কারণে তাদের পরীক্ষা স্থগিত করা হোক। তাদের দাবি, পরীক্ষা স্থগিত করার কারণ জলাবদ্ধতা এবং প্রবল বৃষ্টি। দাবি উঠেছে, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ। এরপর মন্ত্রী সংসদে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং পরীক্ষা স্থগিতের দাবিতে শিক্ষার্থীরা কর্মসূচি পালন করছে। যদিও একটু থেমেছে, কিন্তু সম্পূর্ণ নয়। আগামীতে মে, জুন, জুলাই মাসে পাবলিক পরীক্ষা নেওয়া হবে কি না তা জরুরিভিত্তিতে ভেবে দেখা দরকার। এই কারণে এটি প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে কেউ আন্দোলনের সুযোগ না পায়। এর ফলে সরকার দৈনন্দিন জরুরি কাজ থেকে দূরে সরে চলে যেতে পারে। প্রকারান্তরে সমস্যা প্রত্যেকের। সব পক্ষকে সহনশীল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
ঢাকা যতটা গর্বের, ঠিক ততটা দুর্ভোগের। কয়েকদিনের ঢাকা শহর, জলবন্দি নাগরিকদের যেন দুর্ভোগের শহর। মহানগরের চারদিকে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ, বালু নদী এবং শহরের চারপাশে বিস্তীর্ণ নিচু এলাকা যা প্রাকৃতিক জলাধার হিসাবে কাজ করে। কেন জলাবদ্ধতা? উত্তর জানা থাকলেও দায়িত্ব নিয়ে কাজ করেনি কেউ, বরং জায়গা পেলে দখল করেছে ক্ষমতাসীনরা। নদীগুলো সংকীর্ণ, খাল দখল আর নিচু এলাকা ভরাট করার প্রতিযোগিতায় অনেকে এগিয়ে। নগরবাসী হারিয়েছে নাগরিক সুবিধা। ঢাকার নাম প্রায়ই উঠে আসে বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায়। বাতাস দূষিত, ধূলিকণা আর ভারী ধাতব কণা মেশানো। পানির মান খারাপ। সব নাগরিক ওয়াসার সরবরাহকৃত পানি পায় না। যারা পান, তদের অভিযোগ পানির মান এবং পরিমাণ নিয়ে। অল্প বা ভারী বৃষ্টি হলে, ডুবে যায় সড়ক। প্রধান সড়কের পানি কয়েক ঘণ্টায় সরলেও, অলিগলিতে পানি নামতে সময় লাগে। টানা বৃষ্টিতে এই ভোগান্তি আরও বেড়েছে। ভোগান্তি কেন, চলছে দায় চাপানোর খেলা। কার ঘাড়ে কে দায় চাপাবে সেই চেষ্টা যত আছে, সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ ঠিক ততটা উপেক্ষিত। এভাবে কি মূল সমস্যা সমাধান খুঁজে পাবে? সিটি করপোরেশন বলছে, নগরবাসী ড্রেনে অতিরিক্ত বাসাবাড়ির কঠিন বর্জ্য ফেলার কারণে ড্রেনগুলো সচল থাকছে না।
অন্যদিকে, জলাবদ্ধতা নিয়ে কাজ করা সেই সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ড্রেনেজের পাশাপাশি রাজধানীর জলাবদ্ধতার বড় কারণ পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার অকার্যকারিতা। খাল, স্লুইসগেট, পাম্প স্টেশন ও ড্রেনেজ অবকাঠামোর বড় অংশ ঠিকমতো কাজ করছে না। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রপাতির অচলাবস্থা এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতার কারণে প্রতি বছর একই দুর্ভোগের মুখে পড়তে হচ্ছে নগরবাসীকে। নষ্ট হচ্ছে সময়, অর্থ এবং সম্পদ। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রকৌশল বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বৃষ্টির পানি নদীতে নিষ্কাশনের অন্যতম প্রধান অবকাঠামো ৪১টি স্লুইসগেটের মধ্যে মাত্র ১৯টি কার্যকর রয়েছে। বাকি ২২টির মধ্যে ছয়টি সম্পূর্ণ অচল ও ১৫টি আংশিক সচল থাকলেও কার্যকরভাবে পানি নিষ্কাশনে ভূমিকা রাখতে পারছে না। আবার এসব স্লুইসগেট পরিচালনার জন্য সিটি করপোরেশনের নিজস্ব পর্যাপ্ত জনবলও নেই। একই সঙ্গে রাজধানীর আটটি প্রধান পানি নিষ্কাশন আউটলেটের তিনটি বড় পাম্পের মধ্যে একটি দীর্ঘদিন ধরে বিকল রয়েছে। অন্য পাম্পগুলোও পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে পারছে না। ড্রেনে জমে থাকা বর্জ্য দ্রুত অপসারণের জন্য দুই সিটি করপোরেশনের পাঁচটি সাকার মেশিনের মধ্যে একটি দীর্ঘদিন ধরে অচল। মাটি, আবর্জনা নিয়মিত পরিষ্কার না করায় দুই সিটির আওতায় থাকা ২৬টি খালের বড় অংশ পানি বহন ও পানিপ্রবাহের জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা হারিয়েছে। তাহলে বৃষ্টি এবং বর্ষার পানি যাবে কোথায়?
সিটি করপোরেশন সূত্র বলছে, প্রায় ৩০৬.৩৮ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ১২৯টি ওয়ার্ডে প্রায় আড়াই কোটি মানুষের বসবাস। অথচ এই বিশাল এলাকার বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য কার্যকরভাবে নির্ভর করতে হয় মাত্র আটটি আউটলেটে। মালিবাগ, শান্তিনগর, পল্টন ও মতিঝিল এলাকার পানি টিটিপাড়া পাম্প স্টেশনের মাধ্যমে নিষ্কাশিত হয়। পুরান ঢাকা, আজিমপুর, গুলিস্তান ও হাজারীবাগ এলাকার পানি ধোলাইখাল-সূত্রাপুর হয়ে বুড়িগঙ্গা নদীতে যায়। গ্রিন রোড, তল্লাবাগ ও পান্থপথ এলাকার পানি, হাতিরঝিল হয়ে রামপুরা পাম্প স্টেশনে পৌঁছে। আশুলিয়া এলাকার পানি গোড়ান চটবাড়ি এলাকা দিয়ে, এয়ারপোর্ট এলাকার পানি আব্দুল্লাহপুর আউটলেট, শ্যামলী-মোহাম্মদপুর এলাকার পানি কল্যাণপুর এলাকা দিয়ে। আর যাত্রাবাড়ী, শ্যামপুর, জুরাইন ও ডিএনডি এলাকার কিছু অংশের পানি শিমরাইল পাম্প স্টেশনের মাধ্যমে শীতলক্ষ্যা নদীতে নিষ্কাশন করা হয়। এর মধ্যে হাতিরঝিল পরিচালনা করে রাজউক। কল্যাণপুর ও রামপুরা আউটলেট পরিচালনা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। ধোলাইখাল ও কমলাপুর-টিটিপাড়া আউটলেট পরিচালনা করে ডিএসসিসি। আব্দুল্লাহপুর ও গোড়ান-চটবাড়ি এলাকার আউটলেট পরিচালনা করে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং শিমরাইল আউটলেট নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন পরিচালনা করে। এদিকে, কমলাপুর স্টেডিয়ামসংলগ্ন টিটিপাড়া পাম্প স্টেশন দিয়ে প্রতি মিনিটে প্রায় ৮ লাখ ৫৫ হাজার লিটার পানি অপসারণের সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু তিনটি বড় পাম্পের মধ্যে একটি প্রায় দেড় বছর ধরে বিকল। সম্প্রতি নতুন পাম্প কেনার জন্য দরপত্র সম্পন্ন হলেও চলমান বর্ষা মৌসুমে সেটি সচল করা করা হয়নি। আয়তন, জনসংখ্যার বিচারে মেগাসিটি ঢাকার জলবদ্ধতা নিরসনে এত কমসংখ্যক আউটলেট পর্যাপ্ত নয়। অথচ পাঁচ দশক আগেও নগরীতে যে কয়টি আউটলেট ছিল, এখনো সে কয়টি আউটলেটের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন হচ্ছে। ধোলাইখালের তিনটি পাম্প সচল
থাকলেও, টিটিপাড়ার তিনটি পাম্পের মধ্যে একটি নষ্ট রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই শোনা যাচ্ছে, নতুন পাম্প সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু পরিকল্পনার কথা শুনে নগরবাসী আশ্বস্ত হতে পারে না। এত খরচ করে তৈরি করা স্লুইস গেটের অধিকাংশ অকেজো। দীর্ঘদিন ধরে রক্ষণাবেক্ষণের অভাব। ডিএসসিসির প্রকৌশলীদের দাবি ওয়াসা থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ডে হস্তান্তরের পর, দীর্ঘদিন যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ না করায় স্লুইসগেটগুলোতে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বর্তমান বাস্তবতায় মেগাসিটির জন্য মাত্র সাতটি আউটলেট পর্যাপ্ত নয়। পানির যে চাপ তৈরি হয়, তা মোকাবিলা করতে হলে যে সøুইসগেটগুলো আছে, সেগুলো কার্যকর রাখতে হবে এবং আরও স্লুইসগেট বাড়াতে হবে। এত বড় শহর আর বিপুল জনগোষ্ঠীর বসবাস যেখানে, যে শহর দেশের অর্থনীতি, রাজনীতির কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত, সেই শহরের পানি ও বর্জ্য নিষ্কাশন সমস্যা কি এডহক ভিত্তি অথবা ধরো তক্তা মারো পেরেক পদ্ধতিতে সমাধান হবে? রাজধানীর জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ ড্রেনেজ লাইনে জমে থাকা বর্জ্য ও ব্লকেজ। নগরবাসীর নিয়মিত পলিথিন, প্লাস্টিক, রাবার ও স্পঞ্জ ফেলায় ড্রেন দ্রুত বন্ধ হয়ে যায়। অনেক এলাকার পানি দীর্ঘপথ ঘুরে নদীতে পৌঁছায় বলেও জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, পানি নিষ্কাশনের পথ সংক্ষিপ্ত, অকার্যকর স্লুইসগেট মেরামত, পাম্পের কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং নতুন সাকার মেশিন সংযোজন করলে আটকে থাকা পানি বের করে দেওয়া সম্ভব। সমস্যায় ভুগছেন নগরবাসী, কারণ চিহ্নিত হয়েছে, সমাধানের পথও জানা আছে, তারপরও কেন সমাধান হয় না? সারা দেশ দূরের কথা যেখানে রাজধানী ডুবে যায় বৃষ্টির পানিতে, সেখানে বন্যা এবং পাহাড়ি ঢল ঠেকানোর দায় কে পালন করবে? বন্যার পানির মতোই পরিকল্পনার নামে টাকা খরচ করা তো চলছে নাকি বন্ধ হয়েছে? এটি শতভাগ সত্য, বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে বাড়ছে মানবসৃষ্ট বিপর্যয়। প্রতিবার বন্যায় এই প্রশ্নই জাগে, জনজীবনের দুর্যোগ কি কোনোদিনও সমাধানে আসবে না? কবে আসবে, আমরা তাও জানি না। তবে সরকারের কাছে আমরা চাই, সুষ্ঠু পরিকলনা নিয়ে জনগণের দুর্ভোগ কমিয়ে আনুন। মানুষ দেখুক, আপনাদের চেষ্টার কমতি ছিল না। সমস্যা যতই থাকুক, সমাধানের আন্তরিক চেষ্টাই একদিন নেতৃত্বের প্রতি আস্থা নিয়ে আসতে পারে।
লেখক : রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক