জাতীয় উন্নয়নে শিশুবিবাহের অভিশাপ

আজ থেকে ৭৩ বছর আগে মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের পাশাপাশি বিভিন্ন আইন ও সনদে সব মানুষের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু উন্নত বা উন্নয়নশীল সব রাষ্ট্রেরই পরিবার, কর্মক্ষেত্র তথা সমাজে নারী-পুরুষের মধ্যে চরম বৈষম্য আজও দৃশ্যমান। সময়ের প্রয়োজনে নারীর অধিকার রক্ষায় জাতিসংঘ ১৯৭৯ সালে নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডও) গ্রহণ করে। বিশ্বের ১৮৯টি দেশের মতো বাংলাদেশও এই সনদে স্বাক্ষর করেছে। অথচ বাংলাদেশের মতো এই দেশে নারী তথা কন্যাশিশুকে যেন আজও বোঝা মনে করা হয়। সম্প্রতি কভিড-১৯-এর প্রভাবে নারীর প্রতি সহিংসতা তথা বৈষম্য নতুন করে উদ্বেগজনকভাবে ভাবিয়ে তুলেছে!

বর্তমানে কভিড-১৯-এর ভয়াল থাবায় নিমজ্জিত বাংলাদেশসহ প্রায় পুরো বিশ্ব! এক বছরেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষার্থীরা ঘরে বসে থাকতে থাকতে প্রায় ক্লান্ত! হতাশার চাদর গায়ে জড়িয়ে ইতিমধ্যে অনেকে মরণ নেশায় আসক্ত হয়েছে! অনেকে আবার আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে অবেলায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থী যখন হতাশাগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়, তখন বিষয়টি সচেতন মহলকে অস্থির করে তুলেছে! পাশাপাশি, সামাজিক নিরাপত্তা আর যৌতুকের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা পেতে গ্রামীণ-শহুরে বাস করা অনেক অভিভাবক তাদের কিশোর বয়সী কন্যাশিশুদের ‘বিয়ে’ দিচ্ছে। অন্যভাবে বলা যায় যে, মা-বাবাই যেন সজ্ঞানে তাদের সন্তানদের মৃত্যুকূপে ঠেলে দিচ্ছে। ইউএনএফপিএ, ইউনিসেফসহ বিভিন্ন সংস্থার গবেষণা মতে, বাংলাদেশে ২০২০ সালের আগের চেয়ে বর্তমানে শিশুবিবাহের হার কয়েক গুণ বেশি। এ ছাড়া, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশেই বাল্যবিয়ের সর্বাধিক বিস্তার বেড়েছে। ইউনিসেফের অন্য আরেকটি গবেষণা মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষা-স্বাস্থ্য-অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও, দক্ষিণ এশিয়ায় বাল্যবিয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সর্বাধিক প্রসার রয়েছে এবং বিশ্বের সর্বোচ্চ দশটি দেশের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে।

অবিবেচকের মতো একজন কিশোরী তথা শিশুকে বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে দেওয়া মানে তার শৈশব কেড়ে নেওয়া, অঙ্কুরেই বিনাশ করে দেওয়া তার সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ! ফলে একটি জাতিকে পিছিয়ে দেওয়ার নামান্তর! সুতরাং, অপ্রাপ্ত বয়সে যখন বিয়ে দেওয়া কেবল লিঙ্গবৈষম্য ও সহিংসতাই নয়, বরং মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল! কেননা, একজন শিশুর পক্ষে বিয়ে সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারা ও মতামত প্রকাশ করা অত সহজ কথা নয়!

শিশুবিবাহের ফলে দরিদ্রতা বৃদ্ধি পায়, স্বাস্থ্যহানি ঘটে, যা সমগ্র দেশের উন্নয়নে বিরূপ প্রভাব ফেলে। এক জরিপে দেখা যায়, যেসব নারী ২০ বছরের পর বিয়ে করে তারা অন্য নারীদের মধ্যে মোট আয়ের বৃদ্ধিতে দেশের জিডিপি ৩.৮৭% বৃদ্ধি করতে পারে (ইউনিসেফ)। কৈশোর তথা শিশু বয়সে বিয়ে হওয়ার কারণে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যহানি ঘটার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। ফলে জীবনসঙ্গীর অন্য নারীর প্রতি আসক্তি বেড়ে যায়! এ ছাড়া, একজন কিশোরী-মার কোলে নবাগত শিশু এলে তাকে শারীরিক, মানসিক, সামাজিক সমৃদ্ধ করতে পারা অত সহজ কথা নয়; আর তাই প্রজন্মান্তরে সামগ্রিক উন্নয়ন ব্যাহত হতে থাকে।

সম্প্রতি বিয়ে করেছে এমন কিশোরী বধূদের বিভিন্ন কেস স্টাডির মাধ্যমে জানা যায় যে, কমপক্ষে শতকরা ৯৫ ভাগ কিশোরী কোনো না কোনো সমস্যায় ভুগছে এবং যারা এমন বৈবাহিক/দাম্পত্য জীবন থেকে পরিত্রাণ পেতে চান। IMAGE (Initiative for Married Adolescent Girl’s Empowerment) Plus Project--এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী জানা যায়, উত্তরাঞ্চলে বিশেষ করে চর এলাকায় তাদের কর্ম এলাকার লক্ষিত জনগোষ্ঠী ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানায়। তারা এতটুকু সুযোগ পেলে বিয়ে নামক যন্ত্রণা থেকে নিজেকে মুক্ত করে জীবনকে নতুন করে সাজাতে চায়!

ইউনিসেফের মতে, যে শিশুরা বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে, তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো বিকল্প নেই এবং শিশুদের আরও শিক্ষামুখী করে তোলার জন্য সমন্বিত উপায়ে কাজ করা খুবই জরুরি। করোনার কারণে আগামী দুই বছরে ৪০ লাখ মেয়ে বাল্যবিয়ের শিকার হতে পারে বলে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করেছেন। ওয়ার্ল্ড ভিশন কর্মকর্তা এরিকা হল জানিয়েছেন, সাউথ সুদান, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে! ইউনিসেফের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে ১৫ বছর বয়স হওয়ার আগেই ৩৯ শতাংশ এবং ১৮ বছরের মধ্যে ৭৪ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হচ্ছে। এ দেশে বাল্যবিয়ের গড় হার ৬৫ শতাংশ। ১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ের এই হার বিশ্বে সর্বোচ্চ। প্রতিবেশী দেশ ভারতের বাল্যবিয়ের গড় হার ৫০ শতাংশ, নেপালে ৫৭ শতাংশ এবং আফগানিস্তানে ৫৪ শতাংশ। এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে ১৫ বছরের কম বয়সী বিবাহিত মেয়েদের ২০ শতাংশ ২৪ বছর বয়স হওয়ার আগেই দুই বা ততোধিক সন্তানের মা হয়ে যান। এর ফলে প্রসূতি মৃত্যুর হার এবং অপুষ্টিজনিত সমস্যাও বেশি হচ্ছে।

আর মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, বাল্যবিয়ের শিকার মানুষ শারীরিক ও মানসিক বিকাশ না হওয়ায় ব্যক্তিত্ব সমস্যায় ভুগতে থাকে। ফলে তারা একসময় রাষ্ট্রের জন্যও সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশে ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই শতকরা ৫৯ ভাগ মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে না পারলে চলমান করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে দেশে বাল্যবিয়ের এই হার আরও বাড়তে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সারা বিশ্বে নারী ও কিশোরীদের প্রতি ১৯ ধরনের বৈষম্যমূলক ও ক্ষতিকর চর্চা রয়েছে। এর মধ্যে বাল্যবিয়ে এবং ছেলেসন্তানের প্রতি পক্ষপাতিত্ব বাংলাদেশে প্রকট। ইউনিসেফ, ওয়ার্ল্ড ভিশন, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালসহ নানা উন্নয়ন সংস্থার পক্ষ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে বাল্যবিয়ে বন্ধের জন্য দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশে কর্মরত ইউনিসেফের উপ-প্রতিনিধি বীরা মেনডোনকা বলেছেন, আমাদের এখনই যথাযথভাবে বিনিয়োগ করতে হবে, যাতে মেয়েদের জীবন ও শিক্ষার অধিকার সুরক্ষা করা যায় এবং তাদের প্রতি সহিংসতা এবং শোষণের মাত্রা দ্রুত হ্রাস করা যায়।

চলমান কভিড-১৯ মহামারীটি এখন বাল্যবিয়ে বন্ধের বিষয়ে অগ্রগতি ফিরিয়ে আনার বার্তা দিয়েছে। সময়ের প্রয়োজনে জাতীয় স্বার্থে সব অনিয়ম-অন্যায়-অনাচার-বৈষম্য-লিঙ্গ সহিংসতা দূরীকরণে সবার ঐকমত্য সহযোগিতা অত্যন্ত প্রয়োজন।

লেখক : উন্নয়নকর্মী