সীমান্ত প্রহরীর অনন্য মর্যাদা

আপডেট : ২৪ জুন ২০২৬, ১২:৫২ এএম

দেশের নিরাপত্তার প্রথম প্রাচীর হলো সীমান্ত। সীমান্ত নিরাপদ থাকলে দেশের মানুষ নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে, শিক্ষা, ব্যবসা ও উন্নয়নের কাজে মনোযোগ দিতে পারে। কিন্তু এই নিরাপত্তার পেছনে থাকে কিছু মানুষের নিরবচ্ছিন্ন সতর্কতা, ত্যাগ ও আত্মনিবেদন। তারা প্রতিকূল আবহাওয়া, নিদ্রাহীন রাত এবং নানা ঝুঁকি মোকাবিলা করে দেশের সীমান্ত পাহারা দেন। ইসলামে এই দায়িত্ব মহান ইবাদত ও মর্যাদাপূর্ণ আমল হিসেবে বিবেচিত।

ইসলাম মানুষের ব্যক্তিগত ইবাদতের পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণসাধনকারী কাজগুলোকেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। সীমান্ত পাহারা এমনই একটি দায়িত্ব, যার সুফল গোটা জাতি ভোগ করে। একজন সীমান্তরক্ষীর সতর্কতা ও সচেতনতার কারণে লাখো মানুষ নিরাপদ জীবনযাপন করতে পারে। তাই ইসলামে সীমান্ত রক্ষার মর্যাদা অত্যন্ত উঁচু। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর পথে একদিন সীমান্ত পাহারা দেওয়া দুনিয়া ও দুনিয়ার সবকিছুর চেয়ে উত্তম।’ (সহিহ বুখারি)

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব কেবল সামরিক বা প্রশাসনিক কাজ নয়, বরং এটি এমন এক আমল, যার মূল্য আল্লাহর কাছে দুনিয়ার সমস্ত সম্পদ ও ভোগ-বিলাসের চেয়েও বেশি। কারণ এই দায়িত্বের মাধ্যমে অসংখ্য মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মান রক্ষা পায়।

মানুষ মৃত্যুর পর সাধারণত তার আমলের ধারা বন্ধ হয়ে যায়। তখন আর নতুন কোনো সওয়াব অর্জনের সুযোগ থাকে না। তবে ইসলাম কিছু বিশেষ আমলের কথা উল্লেখ করেছে, যেগুলোর প্রতিদান মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকে। সীমান্ত পাহারা তার অন্যতম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক মৃত ব্যক্তির আমলের ধারা বন্ধ হয়ে যায়, তবে আল্লাহর পথে সীমান্ত পাহারাদারের আমল অব্যাহত থাকে।’ (আবু দাউদ)

এটি সীমান্তরক্ষীদের জন্য এক দারুণ সুসংবাদ। কারণ তারা জীবদ্দশায় যে দায়িত্ব পালন করেন, তার প্রতিদান মৃত্যুর পরও তাদের আমলনামায় যুক্ত হতে থাকে। একজন মুমিনের জন্য এর চেয়ে বড় সৌভাগ্যের বিষয় আর কী হতে পারে!

কেয়ামতের দিন হবে ভয়াবহ আতঙ্ক ও উদ্বেগের দিন। পবিত্র কোরআনে সেই দিনের নানা ভীতিকর দৃশ্য বর্ণিত হয়েছে। প্রত্যেক মানুষ চাইবে সেই মহাভীতি থেকে নিরাপদ থাকতে। সীমান্তরক্ষীদের জন্য এ ক্ষেত্রেও রয়েছে বিশেষ মর্যাদা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সীমান্ত পাহারা দিতে দিতে মারা যায়, সে কেয়ামতের মহাভীতি থেকে নিরাপদ থাকবে।’ (সহিহুত তারগিব)

এই হাদিস সীমান্ত রক্ষার গুরুত্ব ও মর্যাদাকে আরও সুস্পষ্ট করে। যে ব্যক্তি নিজের জীবনকে জাতির নিরাপত্তার জন্য উৎসর্গ করে, মহান আল্লাহ তাকে আখেরাতেও বিশেষ নিরাপত্তা ও সম্মানের অধিকারী করবেন।

সীমান্ত নিরাপদ না হলে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ, চোরাচালান কিংবা শত্রুর আগ্রাসন দেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই সীমান্তরক্ষীরা শুধু একটি ভূখণ্ড পাহারা দেন না, তারা একটি জাতির স্বাধীনতা, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ রক্ষা করেন।

সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যদি কেউ প্রাণ উৎসর্গ করেন, তাহলে তার মর্যাদা আরও বৃদ্ধি পায়। ইসলামে শহীদের স্থান অত্যন্ত উঁচু। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে করতে মারা যান, সে শহীদের মর্যাদা লাভ করে।’ (মুসনাদে আহমদ)

আজকের বিশ্বে সীমান্ত রক্ষার কাজ যত কঠিন হচ্ছে, ততই বাড়ছে এর গুরুত্ব। প্রতিকূল পরিবেশ, জীবনসংকট এবং দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতার মধ্যেও যারা দেশের নিরাপত্তা দিচ্ছেন, তারা নিঃসন্দেহে জাতির গর্ব। ইসলামের দৃষ্টিতে তাদের এই দায়িত্ব শুধু দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং এটি এমন এক ইবাদত, যার প্রতিদান দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতে অনন্য। তাই সীমান্তরক্ষীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা, তাদের ত্যাগের মূল্যায়ন করা এবং তাদের জন্য দোয়া করা আমাদের সবার কর্তব্য। কারণ তাদের সতর্ক প্রহরার ফলেই একটি জাতি নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের সুযোগ পায়।

লেখক : ইমাম, খতিব ও মাদ্রাসাশিক্ষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত