ঈদুল ফিতরের পর থেকে দেশজুড়েই বাড়ছে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে সংক্রমণ বাড়ছিল হু-হু করে। এমন পরিস্থিতিতে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে এলাকাভিত্তিক লকডাউনের পাশাপাশি কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের পর ওইসব এলাকায় সংক্রমণ হারে কিছুটা নিম্নগতি দেখা দিলেও মৃত্যুহারের উল্লম্ফন রোধ করা যাচ্ছে না। এরমধ্যে এক দিনের ব্যবধানে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে করোনা শনাক্ত হওয়া ও উপসর্গযুক্ত রোগীর মৃত্যু ফের বেড়েছে। গতকাল রবিবার সকাল থেকে আগের ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালটির করোনা ইউনিটে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। আগের দিন যে সংখ্যা ছিল মাত্র ৪। এ নিয়ে হাসপাতালটির করোনা ইউনিটে শুধু চলতি মাসের প্রথম ১৩ দিনেই মোট ১২৫ জনের মৃত্যু হলো।
এদিকে গতকাল এক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে ভারতের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধের মেয়াদ আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। দেশে করোনা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এ বন্ধের মেয়াদ আরও বাড়তে পারে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন।
রোগীর বাড়তি চাপ সামলাতে গিয়ে বেসামাল পরিস্থিতিতে পড়ার কথা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন রামেক হাসপাতালের পরিচালক। হাসপাতালটির করোনা ওয়ার্ডে শয্যার চেয়ে রোগী ভর্তি বেশি থাকায় কোনো কোনো ওয়ার্ডের মেঝে ও বারান্দাতেও রোগী রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া করোনা ইউনিটে থাকা ১৮টি আইসিইউ শয্যাই বর্তমানে রোগীতে পূর্ণ। হাসপাতালের সেন্ট্রাল অক্সিজেনসমৃদ্ধ ১০টি ওয়ার্ডকে করোনা ওয়ার্ডে রূপান্তরিত করেও পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে না হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। এমন পরিস্থিতিতে আরও একটি সাধারণ ওয়ার্ডকে করোনা ওয়ার্ডে রূপান্তরের কাজ চলছে।
সীমান্তবর্তী অন্য জেলাগুলো থেকেও করোনা শনাক্ত হওয়া ও উপসর্গযুক্ত রোগী মৃত্যুহারে উল্লম্ফনের তথ্য পাওয়া গেছে। বিস্তারিত দেশ রূপান্তরের সংশ্লিষ্ট জেলার প্রতিনিধি ও নিজস্ব প্রতিবেদকদের পাঠানো খবরে :
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী জানান, গতকাল সকাল থেকে আগের ২৪ ঘণ্টায় যে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে, তাদের মধ্যে ৬ জন করোনা পজিটিভ ছিলেন। অন্য ৭ জনের করোনা উপসর্গ ছিল। নমুনা পরীক্ষার আগেই তাদের মৃত্যু হয়েছে। মৃত ১৩ জনের মধ্যে ৬ জনেরই বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। অন্যদের মধ্যে নওগাঁর ৩ জন, রাজশাহীর ২ জন এবং নাটোর ও কুষ্টিয়ার একজন করে। মৃতদের মধ্যে ১২ জন পুরুষ ও একজন নারী। আর করোনা পজিটিভ হয়ে যে ৬ জন মারা গেছেন, তাদের ৫ জনের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও অপর একজন নওগাঁর।
ব্রিগেডিয়ার ইয়াজদানী আরও জানান, করোনা ও উপসর্গ নিয়ে ২৪ ঘণ্টায় যে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে, তাদের ৬ জনের বয়স ৬১ বছরের ঊর্ধ্বে। এছাড়া ৫১ থেকে ৬০ বছরের ২ জন, ৪১ থেকে ৫০ বছরের ৩ জন এবং ৩১ থেকে ৪০ বছর বয়সের ২ জন। ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৩৫ জন করোনা রোগী, আর নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৪২ জন। বর্তমানে হাসপাতালের করোনা ইউনিটে রোগী ভর্তি আছে ২৯৪ জন। ১০টি ওয়ার্ডে বেড সংখ্যা ২৭১টি।
রামেক পরিচালক জানান, করোনা ওয়ার্ডে শয্যার চেয়ে রোগী ভর্তি বেশি থাকায় কোনো কোনো ওয়ার্ডে মেঝে ও বারান্দাতে রোগী রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ ছাড়াও আশপাশের জেলাগুলোতে করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির কারণে চাপ পড়েছে রামেক হাসপাতালে। প্রতিদিন করোনা আক্রান্ত রোগীরা আসছেন এখানে ভর্তি হতে। হাসপাতালের সেন্ট্রাল অক্সিজেনসমৃদ্ধ ১০ ওয়ার্ডকে করোনা ওয়ার্ডে রূপান্তরিত করেও পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে না হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। শয্যার বিপরীতে বাড়তি রোগী ভর্তি থাকায় করোনা ওয়ার্ডগুলোর মেঝে ও বারান্দায় রোগী রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। হাসপাতালের পরিচালক জানান, পরিস্থিতি সামাল দিতে হাসপাতালের আরও একটি ওয়ার্ডে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সংযোগ দেওয়ার কাজ চলছে। অক্সিজেন সংযোগ দেওয়া শেষ হলে সে ওয়ার্ডেও করোনার রোগী ভর্তি করা হবে।
রাজশাহীতে এক দিনে আরও ২৮২ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। গত শনিবার রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও রামেক হাসপাতাল ল্যাবে নমুনা পরীক্ষায় ২৩০ জনের করোনা পজিটিভ হয়। আর এন্টিজেন টেস্টে করোনা ধরা পড়ে আরও ৫২ জনের।
করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতিতে রাজশাহী নগরীতে এক সপ্তাহের সর্বাত্মক লকডাউনের গতকাল ছিল তৃতীয় দিন। লকডাউনের কারণে নগরীতে ওষুধের দোকান ও কাঁচাবাজার ছাড়া সব ধরণের দোকান বন্ধ রয়েছে। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু রিকশা ও মোটরসাইকেল চলাচল করলেও রাজশাহী নগরীর সঙ্গে সারা দেশের বাস ও ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। শুক্রবার বিকেল ৫টা থেকে শুরু হওয়া এই লকডাউন চলবে ১৭ জুন মধ্যরাত পর্যন্ত। রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. আবু আসলাম জানান, নগরবাসীকে স্বাস্থ্যবিধি ও লকডাউন মানাতে মাঠে রয়েছে একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত।
গতকাল দুপুরে লকডাউন পরিস্থিতি দেখতে নগরীর সাহেববাজার এলাকায় যান জেলা প্রশাসক আব্দুল জলিল। তিনি বলেন, মানুষ লকডাউন কার্যকরে যথেষ্ট সহযোগিতা করছেন। দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। পরিবহনও বন্ধ। কিন্তু কিছু উৎসুক মানুষ লকডাউন দেখার জন্য রাস্তায় আসছে। এটা দুঃখজনক। তবে এসব বন্ধে জেলা প্রশাসন কঠোর ভূমিকা পালন করছে বলে জানান তিনি।
মোংলায় শনাক্তের হার ৫৪.৫৪ শতাংশ : মোংলায় এক চীনা নারীর করোনা শনাক্ত হয়েছে। গতকাল সকালে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পরীক্ষা করাতে এলে তার করোনা শনাক্ত হয়। তিনি ইপিজেডের জিনলাইট গার্মেন্টসের টেকনিশিয়ান। তার নাম জিংয়াও কিন জুয়ান (৩৩)। জিংয়াও কিন জুয়ান ও তার স্বামী ওই একই কারখানায় চাকরি করেন।
বাগেরহাটের সিভিল সার্জন ডা. কেএম হুমায়ুন কবির জানান, গতকাল মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪৪ জন করোনা পরীক্ষা করিয়েছেন। এরমধ্যে ২৪ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার ৫৪.৫৪ ভাগ। এর আগে শনিবারের হার ছিল ৫৭ ভাগ।
যশোরে করোনা শনাক্তের হার ঊর্ধ্বমুখী, মৃত্যু ৩ : যশোরে করোনা শনাক্তের হার এখনো ঊর্ধ্বমুখী। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১৪৪ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। রবিবার শনাক্তের হার ৪২ শতাংশ। মারা গেছেন তিনজন। এদিকে যশোর জেনারেল হাসপাতালের করোনার উপসর্গ নিয়ে রোগী ভর্তির চাপ বেড়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে চিকিৎসা নিশ্চিত ও করোনা নিয়ন্ত্রণ করতে সব ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য মতে, গত ২৪ ঘণ্টায় ৩৪১ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ১৪৪ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। মে মাসের তুলনায় জুন মাসে শনাক্তের হার অনেক বেশি। যা সংশ্লিষ্টদের উদ্বেগে ফেলেছে। বিশেষ করে কয়েক দিন ধরে যশোর জেনারেল হাসপাতালে করোনার উপসর্গ নিয়ে রোগী ভর্তির চাপ বেড়েছে। মাত্রা ২০ শয্যার আইসোলেশন ওয়ার্ডে বর্তমানে দ্বিগুন রোগী ভর্তি রয়েছে। এদিকে করোনা ডেডিকেটেড ইউনিটও পূর্ণ হওয়ার পথে। ৮০ শয্যার এ ওয়ার্ডে বর্তমানে ৬৩ জন ভর্তি রয়েছেন। এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় এ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ৩ জন। এর মধ্যে একজন করোনা ডেডিকেটেড ইউনিটে এবং অপর দুজন আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি ছিলেন বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মো. আখতারুজ্জামন।
ফরিদপুরে করোনা রোগীর চাপ বাড়ছে : করোনা আক্রান্ত রোগীদের চাপ বাড়ছে ফরিদপুরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউয়ে। গত ১২ দিনে এই ইউনিটে ২৮ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছে ১৪ জন, সুস্থ হয়েছে ২ জন। প্রতিদিনই আসছে রোগী, কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী শস্যা সংখ্যা না থাকায় ভর্তি নিতে পারছে না কর্র্তৃপক্ষ। এই হাসপাতালে আইসিইউতে ১৬ শস্যা থাকলেও সচল রয়েছে ১৪টি। ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ডা. ছিদ্দীকুর রহমান জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় কভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে এক ব্যক্তি। আর নতুন শনাক্ত হয়েছে ২২ জন।
টাঙ্গাইলে তিনজনের মৃত্যু : টাঙ্গাইলে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। প্রতিদিনই আক্রান্তের সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে দুজনের বাড়ি দেলদুয়ার ও একজনের বাড়ি কালিহাতী উপজেলায়। এ নিয়ে গত শনিবার সকাল পর্যন্ত জেলায় মোট ৯৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। জেলায় নতুন করে আরও ২৩ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।
মাগুরা শহর ও মহম্মদপুর উপজেলা লকডাউন : মাগুরা জেলায় করোনা সংক্রমণ মাত্রাতিরিক্তভাবে বেড়ে যাওয়ায় আজ সোমবার থেকে মাগুরা শহরে ও মহম্মদপুর উপজেলাকে লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। পরবর্তী সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত লকডাউন বলবত থাকবে। গতকাল রবিবার বিকেলে জেলা সার্কিট হাউজে প্রশাসনের এক জরুরি সভা শেষে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান জেলা প্রশাসক ড. আশরাফুল আলম। সোমবার সকাল ৬টা থেকে পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত এ লকডাউন চলবে বলে আদেশে জানানো হয়েছে। এ সংক্রান্ত আদেশের একটি কপি জেলা প্রশাসকের অফিসিয়াল ফেইসবুক পেইজে দেওয়া হয়েছে।
নাটোর পৌরভবন লকডাউন : নাটোর পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে করোনা সংক্রমণ গণহারে বেড়ে যাওয়ায় এবার পৌরসভা ভবনে অনির্দিষ্টকালের জন্য নতুন করে লকডাউন ঘোষণা করেছেন মেয়র। গতকাল দুপুরে নাটোর পৌরসভার মেয়র উমা চৌধুরী জলি পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই লকডাউন চলবে বলে ঘোষণা দেন। মেয়র বলেন, পৌরসভায় কর্মরত ৪০ কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে রবিবার পর্যন্ত ১৪ জনের করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। আরও অনেকে অসুস্থ থাকায় তাদেরও নমুনা পরীক্ষা করতে দেওয়া হয়েছে।
পঞ্চগড়ে বিজিবির নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ : পঞ্চগড়ে আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় ভারতীয় করোনার ডেল্টা ভ্যারিয়ান্ট সংক্রমণ ঠেকাতে ভারতীয়দের অনুপ্রবেশ, চোরাচালান বন্ধে বিজিবিকে সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিজিবি বলেছে, এজন্য সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। গতকাল সকালে ভার্চুয়ালি এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
ঠাকুরগাঁওয়ে কঠোর অবস্থানে প্রশাসন : সীমান্তবর্তী জেলা ঠাকুরগাঁও জেলায় ভারতীয় ভ্যারিয়ান্ট ঠেকাতে প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছে। করোনার সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী রোধকল্পে মাঠে নেমে সচেতনতামূলক প্রচারাভিযান শুরু করেছে। গতকাল সকালে ডিসি অফিস চত্বর থেকে শুরু হয় সচেতনতামূলক প্রচার প্রচারণা। কোর্ট চত্বর এলাকার মানুষদের করোনা ভাইরাস থেকে দূরে রাখতে লিফলেট বিতরণ করেন জেলা প্রশাসক ড. কেএম কামরুজ্জামান সেলিম। এরপর শহরের চৌরাস্তা হয়ে শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে লিফলেট বিতরণ ছাড়াও মাস্কবিহীন পথচারীদের মাস্ক পরিধান করান জেলা প্রশাসনের শীর্ষকর্তারা।