চাঁপাইয়ে লন্ডভন্ড আমের বেচাকেনা

আমের রাজধানীখ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জে সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগজনকহারে করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় বড় ধরনের ধস নেমেছে চলতি মৌসুমের আম বাণিজ্যে। করোনা সংক্রমণ রোধে স্থানীয় প্রশাসন আরোপিত বিধিনিষেধের কারণে ব্যাপারীদের অবাধ যাতায়াতে জটিলতা ও আতঙ্কের ফলে জেলার প্রসিদ্ধ আম বাজারগুলোয় নেই চিরচেনা সেই আগের চিত্র। গত কয়েকদিনে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও মৌসুমের শুরুতে বাজারগুলো খাঁ খাঁ করেছে। সবমিলিয়ে করোনার থাবায় ‘ক্ষতবিক্ষত’ চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম ব্যবসায়ীরা এবার ব্যাপক ক্ষতির শঙ্কা করছেন। টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ কয়েকশ’ কোটি টাকা বলে দাবি তাদের।

প্রচীনকাল থেকে মাটি ও আবহাওয়াগত কারণে সুস্বাদু ও রসালো আমের জন্য খ্যাত মালদাহ’র সুনাম দেশবিভাগের পর চলে আসে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঘরে। বলা যায় সেই থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জকে চেনা যায় আমকে দিয়েই। বাহারি কয়েকশ’ জাতের আম উৎপাদনের জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জকে ইতিমধ্যে সরকারিভাবেই চিহ্নিত করা হয়েছে ‘আমের রাজধানী’ হিসেবে। এই আমের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৫ উপজেলার ৩৪ হাজার ৭৩৮ হেক্টর আমবাগানের প্রায় ২৭ লাখ আম গাছে চলতি মৌসুমের দীর্ঘ খরা ও অনাবৃষ্টির বিপর্যয় কাটিয়েও বাম্পার ফলন হয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে জেলায় আড়াই লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি আম উৎপাদন হচ্ছে। যেখানে গত মৌসুমে উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ২ লাখ ৮ হাজার মেট্রিক টন। স্বাভাবিক সময়ের হিসাবে উৎপাদিত এই আমের বাজারমূল্য প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। কিন্তু আমের ভরা মৌসুমে হঠাৎ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ পর্যায়ে ঠেকায় ল-ভ- হয়েছে এখানকার স্বাভাবিক আম বাণিজ্য।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে গুটি ও গোপালভোগ জাতের আম ভাঙার (বাজারে আসার) মাত্র কয়েক দিনের মাথায় করোনা সংক্রমণ উদ্বেগজনকহারে বাড়তে শুরু করায় স্থানীয় প্রশাসন জেলাজুড়ে ‘বিশেষ লকডাউন’ ঘোষণা করে। দু’ দফায় ১৪ দিনের ‘বিশেষ লকডাউনে’ আম ব্যবসার জন্য শর্ত শিথিল থাকলেও ঢাকাসহ অন্যান্য জায়গার আম ব্যাপারীরা করোনা আতঙ্ক ও স্বাভাবিক যাতায়াত জটিলতায় আসতে পারেননি। এরপর চাঁপাইনবাবগঞ্জে লকডাউন শিথিল করে ১১ দফা বিধিনিষেধ আরোপ করা হলেও দেশের অন্যান্য জেলায় শুরু হয় করোনাকে ঘিরে ‘কঠোর লকডাউন’। উত্তর সীমান্তজুড়ে করোনা সংক্রমণের উলম্ফনে বিপর্যস্ত হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম বাণিজ্য। দিশেহারা হয়ে পড়েন চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম ব্যবসায়ীরা।

দেশের সর্ববৃহৎ আম বাজার চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট আম বাজারসহ চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের সাধুর ঘাট ও গোমস্তাপুরের রহনপুর আম বাজারসহ ছোট-বড় প্রায় ৩০টি আম বাজারে যেখানে গায়ে গা লাগিয়ে চলাচল করতে কষ্ট হতো, সেখানে এবার মৌসুমের শুরুর দিকে ক্রেতা-বিক্রেতা ছিল না বললেই চলে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট আম বাজারের আম ব্যবসায়ী কাজি এমদাদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশে আমের সবচেয়ে বড় বাজার কানসাট আম বাজার থেকে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন তিন থেকে চারশ’ ট্রাক ভর্তি আম যেত দেশের বিভিন্ন স্থানে। সেখানে লকডাউনের দ্বিতীয় দফা চলাকালে গেছে মাত্র ১ থেকে সোয়াশ’ ট্রাক। এখন পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে যা ক্ষতি হওয়ার তাতো মৌসুমের শুরুতেই হয়ে গেছে।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সাধুর ঘাটের আম ব্যবসায়ী সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘করোনার কারণে বাজারের অবস্থা খুবই খারাপ। ব্যাপারী অনেক কম। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আম যাচ্ছে না তা নয়, ১০০ ভাগের মধ্যে ৩০ থেকে ৪০ ভাগ যাচ্ছে। কিন্তু ৬০ ভাগ আম তো চাঁপাইনবাবগঞ্জে থেকে যাচ্ছে’।

জেলার আরেক আম ব্যবসায়ী আব্দুল হান্নান বলেন, ‘এবারের মৌসুমে দীর্ঘ খরা ও অনাবৃষ্টির কারণে আম উৎপাদনে বেশি খরচ হয়েছে। উৎপাদন ভালো হলেও করোনা পরিস্থিতির কারণে ব্যাপারীরা ঠিকমতো আসতে পারেননি। ন্যায্য দামে আম বিক্রির ক্রেতাই পাচ্ছি না। ফলে এবার আমরা বাগানে বেশি খরচ করেও দাম পাচ্ছি না আম থেকে’।

জেলার বিভিন্ন জায়গার আম ব্যবসায়ীরা জানান, করোনার প্রভাবের কারণে তারা গত মৌসুমের তুলনায় অনেক কম দামে আম বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। গত মৌসুমে খিরসাপাত বিক্রি হয়েছে ২৫শ থেকে তিন হাজার টাকা মণ দরে। সেখানে এখন বিক্রি হচ্ছে ১৭ থেকে ১৮শ টাকা মণ দরে। ল্যাংড়া গত মৌসুমে বিক্রি হয়েছিল দুই হাজার থেকে ২২শ টাকা মণ দরে। সেখানে বর্তমান বাজারদর হচ্ছে ১৪শ থেকে ১৫শ টাকা মণ। আর মৌসুমের শুরুতে লখনা, গুটি জাতের আম বিক্রি হয়েছে বলা যায় ‘পানির দরে’।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমকে ঘিরে মৌসুমের টানা ৩ মাস পুরো জেলা থাকে সরগরম। আম পাড়া, পরিবহন, ঝুড়ি বানানো, বেচাকেনাসহ চলে নানান কর্মযজ্ঞ। তিন মাসের আম বাণিজ্যকে ঘিরে এখানকার মানুষ আগামী কয়েক মাসের রুটি-রুজি নিশ্চিতের স্বপ্ন দেখে। আম ব্যবসায়ীরা বলছেন, চলতি মৌসুমে উৎপাদিত আমের বাজারমূল্য এবং এর সঙ্গে কর্ম দুইয়ে মিলিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম অর্থনীতিতে বিশাল প্রভাব পড়ার কথা ছিল। উৎপাদিত আমের বেচাকেনায় স্থানীয় অর্থনীতিতে যোগ হতো প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। সেখানে করোনা সংক্রমণ এবং সেই সঙ্গে আতঙ্কে ক্রেতা না থাকায় বাজারদর কমে যাওয়ায় এবার আম বাণিজ্য এক হাজার থেকে ১১শ কোটি টাকার মতো হতে পারে বলে ধারণা করছেন তারা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে চলতি মৌসুমে ভালো উৎপাদনের পরেও করোনার কারণে ব্যবসায়ীদের ক্ষতির শঙ্কার কথা স্বীকার করেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নজরুল ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এবার ভালো ফলন হয়েছে। আমের বাজার ও পরিবহন স্বাভাবিক রাখতে আমরা স্থানীয় প্রশাসন কাজ করছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও গত ২৭ মে ম্যাংগো স্পেশাল ট্রেন উদ্বোধন করেছেন। তাতেও প্রচুর আম পরিবহন হচ্ছে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির কারণে প্রকৃত আমচাষিরা যথাযথভাবে আম হারভেস্টিং করতে পারছেন না। ফলে ক্ষতি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। তবে আশা করি কিছুদিনের মধ্যে সুন্দর পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে।’

মৌসুমের শুরুতে স্থবির পরিস্থিতি বিরাজ করলেও মৌসুমের শেষের দিকে এসে বেচাকেনার পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হবে বলে ধারণা করছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ ম্যাঙ্গো ফাউন্ডেশনের সদস্য সচিব আহসান হাবীব। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতিতে মৌসুমের শুরুতে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল এখন সে পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি হয়েছে। কানসাট আম বাজারে এখন প্রচুর আম বিক্রি হচ্ছে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে আরও উন্নতি হবে বলে আমরা আশা করছি।’ একইসঙ্গে তিনি আম বাণিজ্য সম্প্রসারণে আম রপ্তানি প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করার দাবি জানান।’