ঋতুস্রাবের সময় করণীয়

কোরআনে কারিমে ইরশাদ হচ্ছে, ‘আর তারা তোমাকে (নবী মুহাম্মদকে) হায়েজ (ঋতু) সম্পর্কে প্রশ্ন করে। বলো, তা কষ্ট। সুতরাং তোমরা হায়েজকালে স্ত্রীদের থেকে দূরে থাকো এবং তারা পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তাদের নিকটবর্তী (সহবাস করো না) হয়ো না। অতঃপর যখন তারা পবিত্র হবে তখন তাদের কাছে আসো, যেভাবে আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিয়েছেন। নিশ্চয় আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং ভালোবাসেন অধিক পবিত্রতা অর্জনকারীদের।’ সুরা আল বাকারা : ২২২

প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর প্রত্যেক নারীর লজ্জাস্থান থেকে মাসে একবার নিয়মিত যে রক্ত আসে, তাকে হায়েজ, মাসিক, ঋতু বা রজঃস্রাব বলা হয়। জাহেলিয়াতের যুগে হায়েজের সময় নারীদের ভিন্ন চোখে দেখা হতো, নানা রকমের অন্যায় আচরণ করা হতো। তাদের সঙ্গে বসে খাবার খাওয়া হতো না, আলাদা ঘরে থাকতে হতো, তাদের রান্না করা খাবার খাওয়া হতো না। ইসলামপূর্ব যুগে ইহুদিরা এই দিনগুলোতে নারীকে সম্পূর্ণ অপবিত্র গণ্য করত এবং নারীদের যাবতীয় সঙ্গ ও স্পর্শ এড়িয়ে চলত। অন্যদিকে খ্রিস্টানরা এ সময়টাকে আলাদাভাবে মান্য করত না। তারা সহবাস থেকে শুরু করে সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই সম্পন্ন করত। সাহাবায়ে কেরাম (রা.) এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে উপরোক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়।  তাফসিরে ইবনে কাসির

ভুল ধারণা : ইসলাম মাসিক সম্পর্কে যাবতীয় ভুল ধারণার অবসান করে নারীদের এই স্বাভাবিক বিষয়টিকে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করেছে। একাধিক হাদিসে নবী কারিম (সা.) এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। এমনকি মাসিক অবস্থায় স্ত্রীদের সঙ্গে নবী কারিম (সা.)-এর স্বাভাবিক আচরণ ও রাতযাপনের বর্ণনাও রয়েছে। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমি ঋতুস্রাব অবস্থায় প্রিয়নবীর মাথা ধুয়ে দিতাম। তিনি আমার কোলে হেলান দিয়ে কোরআন মজিদ তেলাওয়াত করতেন। আমি হাড় চুষতাম এবং তিনিও একই স্থানে মুখ দিয়ে তা চুষতেন। আমি পানি পান করে তাকে গ্লাস দিতাম এবং তিনিও ওইখানেই মুখ দিয়ে ওই গ্লাস থেকেই ওই একই পানি পান করতেন।’

ইসলামের বিধানে মাসিকের সময়টাতে শুধু সহবাস করতে মানা করা হয়েছে। এছাড়া স্ত্রীদের সঙ্গে শোয়া, ঘুমানো, একসঙ্গে খাওয়া, আলিঙ্গন করা, অন্তরঙ্গ হওয়াতে কোনো বাধা নেই। অনুরূপ নারীরাও এই দিনগুলোতে রান্নাসহ সংসারের অন্য সব কাজ করতে পারবেন।

আমাদের সমাজে নারীদের মধ্যে মাসিক নিয়ে এক ধরনের লজ্জা রয়েছে। তারা এ সময়ের বিভিন্ন বিষয় বিশেষ করে পাক-পবিত্র থাকা, ঘর-সংসারের কাজ করা, এমনকি মাসয়ালা নিয়ে নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হন। এ বিষয়ে লজ্জা নয় অন্য সাধারণ বিষয়ের মতো যারা জানেন তাদের কাছ থেকে জেনে নিতে হবে। এ কারণেই আজ এ বিষয়ের আলোচনা।

বিধান : নারীদের ‘হায়েজ’ তথা মাসিক রক্তস্রাবের ওপর শরয়তি বিধানের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন তিন দিন আর ঊর্ধ্বে ১০ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। উল্লিখিত দুই সংখ্যার প্রথমটির কম হলে কিংবা দ্বিতীয়টির বেশি হলে তখন তা ‘ইস্তিহাজা’ বা রোগ হিসেবে ধর্তব্য হবে। আর দুই স্রাবের মাঝখানে ১৫ দিন পবিত্র থাকা আবশ্যক। কারও যদি স্রাবের নির্দিষ্ট তারিখ থাকে, আর সে কোনো মাসে তারিখের বিপরীত ১০ দিনের পরও রক্ত দেখতে পায়, তাহলে অভ্যাসের ভেতরে আসা রক্তগুলোকে হায়েজ ধরতে হবে এবং অতিরিক্তগুলোকে ইস্তিহাজা।

অনুরূপ কারও যদি এক হায়েজ শেষ হওয়ার পর ১৫ দিনের আগেই আবার রক্ত দেখা দেয়, আর এভাবে কয়েক বছর ধরে চলতে থাকে, তাহলে তার এই অনিয়ম চালু হওয়ার আগের হায়েজের অভ্যাস হিসাব করে ঠিক তার ১৫ দিন পরেই দ্বিতীয় হায়েজের সময় শুরু হবে, মাঝে আসা রক্তগুলোকে ইস্তিহাজা ধরতে হবে। রদ্দুল মুহতার : ১/২৮৯

কোনো কারণে আগের মাসের তারিখ খেয়াল না থাকলে স্রাবের রক্ত দশ দিনের বেশি হলে তার বিধান হচ্ছে, যেহেতু হায়েজের শেষসীমা ১০ দিন, তাই ১০ দিনের পর নিয়মিত নামাজ-রোজা আরম্ভ করবে। এ ক্ষেত্রে আগের মাসের পরিমাণ খেয়াল না থাকলে খুব চিন্তা-ভাবনার পর প্রবল ধারণা অনুযায়ী যত দিনের তারিখ খেয়াল হবে, তত দিনই হায়েজ হিসেবে গণ্য হবে। আদ দুররুল মুখতার : ২/২৮৬

সন্তান প্রসবের পর জরায়ু থেকে যে রক্ত আসে, তাকে নিফাসের রক্ত বলা হয়। এর সর্বোচ্চসীমা ৪০ দিন। এর সর্বনিম্ন সীমা নেই, অল্প কিছুক্ষণও হতে পারে। ‘নিফাস’ অবস্থার সব বিধান মাসিক স্রাবের অনুরূপ।

ওষুধের মাধ্যমে স্রাবের সময় পিছিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে অভিজ্ঞ ডাক্তার যদি বলেন, ‘এ ধরনের ওষুধ ব্যবহার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হবে না’, তাহলে প্রয়োজনে তা ব্যবহার করা যাবে। ফাতাওয়ায়ে রহিমিয়া : ৬/৪০৪

মাসিকের সময় উত্তেজনাবশত সহবাস হয়ে গেলে খুব ভালো করে তওবা করে নেওয়া ওয়াজিব। তার সঙ্গে সঙ্গে কিছু দান-সদকা করে দিলে তা উত্তম। মুস্তাদরাকে হাকিম : ১/১৭১, ১৭২

নামাজের বিধান : তারিখ অনুসারে রক্ত বন্ধ হওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার পর পাক-পবিত্র হয়ে নামাজ আদায় ও রোজা পালন করতে হবে। মাসিকের রক্ত বন্ধ হওয়ার পর নারীর ওপর গোসল করা ওয়াজিব। গোসলের পরে তিনি নামাজ আদায় করবেন। যেমন, জোহরের ওয়াক্ত শেষ হয়ে গেছে আর আসরের ওয়াক্ত শুরু হয়েছে, এ সময় তিনি পবিত্রতা অর্জন করেছেন, তখন তিনি গোসল করবেন, গোসলের পরে তিনি জোহর ও আসর দুই ওয়াক্ত নামাজ আদায় করবেন। তখন থেকে তার ওপর নামাজের বিধান শুরু হবে। এখানে অপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই।

সেজদার আয়াত শুনলে : মাসিক চলাকালে সেজদার আয়াত শুনলে সেজদা ওয়াজিব হয় না। তাই পরবর্তী সময়ে তা কাজাও করতে হবে না। হজরত ইবরাহিম নখয়ি (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হায়েজ অবস্থায় সেজদার আয়াত শুনলে সেজদা করবে না। তার তো এর চেয়ে বড় বিধান ফরজ নামাজই পড়তে হয় না। মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা : ৪৩৪৭

নফল নামাজ ও রোজা : রাতে বা দিনে নফল নামাজ পড়া অবস্থায় মাসিক শুরু হলে, পবিত্র হওয়ার পর তা কাজা করতে হবে। কেননা, নফল নামাজ শুরুর পর তা সম্পন্ন করা ওয়াজিব। তবে ফরজ নামাজের মধ্যে যদি এমনটি হয় অর্থাৎ ফরজ নামাজ শুরুর পর যদি মাসিক শুরু হয় তাহলে পরবর্তী সময়ে ওই নামাজের আর কাজা করতে হয় না। তদ্রুপ নফল রোজা অবস্থায় মাসিক স্রাব এসে গেলে পরবর্তী সময়ে ওই রোজা কাজা করতে হবে। কেননা নফল রোজা শুরুর পর তা পূর্ণ করা আবশ্যক হয়ে যায়। আল মাবসুত, সারাখসি : ২/১৪

কোরআন তেলাওয়াত : ঋতুমতী কোনো নারীর জন্য কোরআন শরিফ তেলাওয়াত নিষিদ্ধ। এ সময়ে কাউকে শেখানোর উদ্দেশ্যেও তা পড়া যাবে না। এ ক্ষেত্রে শেখানোর জন্য অন্য কোনো ব্যবস্থা রাখা উচিত। অবশ্য ভিন্ন ব্যবস্থা না থাকলে একটি করে শব্দ (ভেঙে ভেঙে) বলে দিতে হবে এবং প্রত্যেক শব্দের পর ওয়াকফ করতে হবে। এছাড়া বানান করেও পড়া বলে দেওয়ার অবকাশ আছে। তবে ঋতুমতী নারীর জন্য কোরআন শ্রবণ করা জায়েজ, তাই এ অবস্থায় কোরআন তেলাওয়াত শুনতে কোনো অসুবিধা নেই। জামে তিরমিজি : ১/৩৪

হায়েজ-নেফাস অবস্থায় নিয়মিত আমল হিসেবেও সুরা ইয়াসিন, সুরা ওয়াকিয়া ইত্যাদি পড়া যাবে না। হাদিস শরিফে এসেছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, ঋতুমতী নারী এবং যার ওপর গোসল ফরজ হয়েছে, তারা যেন সামান্য পরিমাণও কোরআন তেলাওয়াত না করে। অবশ্য কোনো ইসলামি স্কলার বলেছেন, যে সব আয়াতে দোয়া রয়েছে, তা দোয়া হিসেবে পড়া যাবে। যেমন, ‘রাব্বানা আতিনা ফিদদুনিয়া হাসানাতাও ওয়াফিল আখিরাতি হাসানা’ ইত্যাদি।