জাতীয় সংগীতের রচয়িতা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলাদেশের মানুষের আবেগ ও স্মৃতিবিজড়িত নাম। অনেক বিখ্যাত উপন্যাস, কবিতা, গান এ দেশে বসে লিখেছেন কবি। তার সেসব লেখায় বাংলাদেশের জনপদ প্রকৃতির উপস্থিতি পাওয়া যায়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ রবিঠাকুরের এই গান জাতীয় সংগীত হিসেবে বেছে নেন। ফলে নানাভাবেই রবীন্দ্রনাথ এ দেশের মানুষের আবেগ আর অনুভূতির সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছেন। এই অনুভূতিকে মূল্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধার স্মারক হিসেবে দেশে একটি রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি ওঠে। আগেরবার প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় করার ঘোষণা দেন। ২০১৬ সালে সংসদে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস হয়। এর আগে ২০১৫ সালের ৮ মে (২৫ বৈশাখ) তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী (বর্তমান) শেখ হাসিনা সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর গিয়ে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
এর আগে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস কোথায় হবে এ নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দাবি এবং আন্দোলন চলে কুষ্টিয়া, নওগাঁ ও সিরাজগঞ্জ জেলার মধ্যে। শেষ পর্যন্ত পাবনা-সিরাজগঞ্জ মহাসড়ক অবরোধ করে তীব্র আন্দোলন গড়ে সফল হয় সিরাজগঞ্জবাসী। শাহজাদপুরে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ক্যাম্পাস নির্ধারণ করা হয়। ১৩০ একর জমিও নির্ধারণ করা হয়। ২০১৭ সালের ১১ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ ঘোষকে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয় চার বছরের জন্য। গত সোমবার তার মেয়াদ শেষ হয়েছে। এই উপাচার্য তার মেয়াদকালে শুধু অনিয়ম ও দুর্নীতিই করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শাহজাদপুরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের জন্য নির্ধারিত স্থানটি এখনো বিল। সেখানে মাছের চাষ হয়।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, গত চার বছরে ভিসি আইন অনুযায়ী যে গেজেট জারি করার কথা সেটিই করেননি। গেজেট না করেই তিনি নিয়োগ দিয়েছেন এবং ক্যাম্পাস পরিবর্তন করে রাজধানীর ধানমন্ডিতে বাড়ি ভাড়া নিয়ে প্রতিষ্ঠান চালু করেছেন লিয়াজোঁ অফিসের নামে। দ্বিতীয় মেয়াদে ভিসি হওয়ার জন্যও তিনি অনেক চেষ্টা করেছেন।
‘উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিরাজমান সারা বিশ্বের সঙ্গে সংহতি রক্ষা করে জাতীয় পর্যায়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা এবং বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের স্রষ্টা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমর সৃষ্টি দেশের মানুষের স্মৃতিতে চিরঅম্লান থাকবে’ এ প্রত্যয় নিয়ে সংসদে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস হয়েছিল।
শাহজাদপুর রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন পরিষদ আন্দোলন কমিটির এক সদস্য অভিযোগ করেন, ভিসি গত চার বছরে দুবার শাহজাদপুর গিয়েছেন। তিনি ভিসি হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া থেকেই নিয়োগ নিয়ে এবং লিয়াজোঁ অফিস নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দুই বছরের বেশি সময় ধরে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির কর্মকান্ড নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনাও হয়েছে। তাকে বারবারই স্থায়ী ক্যাম্পাস করার জন্য বলা হয়েছে।
শাহজাদপুরের বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, গত ১১ জুন ভিসির মেয়াদ শেষ হওয়ার এক বছর আগে থেকেই ড. বিশ্বজিৎ ঘোষ দ্বিতীয় মেয়াদে থাকার জন্য তদবির শুরু করেন। তারা বিষয়টি টের পেয়ে ভিসির কর্মকান্ডের ফিরিস্তি তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বিষয়টি মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে পাঠানো হয়। মন্ত্রিপরিষদ থেকে বিষয়টি আরও বেশি তদন্তের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়, তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তের আগে নতুন করে যেন মেয়াদ বাড়ানো না হয়।
জানা গেছে, এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে গত ২২ মার্চ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ সংশ্লিষ্টদের দেওয়া অভিযোগ বলা হয়, ২০১৬ সালে সংসদে দেশের ৪০তম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ আইন পাস হয়। আইনের প্রথম ধারার দুই নম্বর উপধারায় বলা হয়েছে, ‘সরকার, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, যে তারিখ নির্ধারণ করিবে সেই তারিখে এই আইন কার্যকর হইবে।’ কিন্তু এখন পর্যন্ত গেজেটের মাধ্যমে কোনো প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়নি। প্রজ্ঞাপন ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনা সম্পূর্ণ অবৈধ ও বেআইনি। এর মধ্যে রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলর ২০১৭ সালের ১১ জুন অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ ঘোষকে চার বছরের জন্য ভিসি নিয়োগ দেন। এরপর পার হয়েছে চার বছর। কিন্তু স্থায়ী নিজস্ব ক্যাম্পাস এখনো দৃশ্যমান হয়নি। দূর হয়নি ভূমি জটিলতা।
বিশ্বজিৎ ঘোষের বিরুদ্ধে ক্যাম্পাস চালু না করা, অবৈধভাবে ছাত্রভর্তি, নিয়োগবাণিজ্যসহ ৫৬টি অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে কমিটির একাধিক সদস্য জানান। এর মধ্যে শাহজাদপুরের বঙ্গবন্ধু পরিষদের উপাধ্যক্ষ মো. রফিকুল ইসলাম বাবলার করা অভিযোগে বলা হয়েছে, সরকারের কাছে সংসদে পাসকৃত আইনটি গেজেট আকারে প্রজ্ঞাপন জারি না চেয়ে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ, শিক্ষার্থী ভর্তি, ক্লাস চালুর অনুমতি ও অর্থ ছাড়ের আবেদন করলে তারা আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অর্থ ছাড় ও অন্যান্য বিষয়ে অনুমতি দিয়েছেন। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি অযোগ্য ও তার পছন্দের ও আজ্ঞাবহ ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগবাণিজ্যের মাধ্যমে ইতিমধ্যে ১৪০ জন শিক্ষক-কর্মচারীও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অ্যাডহক ভিত্তিতে একজন এমএলএসএস, ঝাড়ুদার, পিয়ন, ড্রাইভার নিয়োগ দিয়েছেন ভিসি। তার বিরুদ্ধে ঘুষ-বাণিজ্যেরও অভিযোগ করা হয়।
অভিযোগ উঠেছে, ভিসি বিশ্বজিৎ ঘোষ গত চার বছরে সরকারি ১০ কোটি টাকা ব্যয় করেছেন। কিন্তু কোনো অডিট হয়নি। কোর্সসমূহ পরিচালিত হচ্ছে, কিন্তু সিলেবাস অনুমোদন দেয়নি ইউজিসি। প্রতিষ্ঠানটির ছাত্র ভর্তি করেছে অন্য একটি সংস্থা।
রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলর রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ আইন ২০১৬-এর ১০(১) ধারা অনুযায়ী, ভাইস চ্যান্সেলর পদে চারটি শর্তে নিয়োগ দান করেন। (খ) নং শর্তে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে সার্বক্ষণিক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থান করার নির্দেশ রয়েছে। কিন্তু তিনি তা অমান্য করে শাহজাদপুরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থান না করে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার সাবেক কর্মস্থলে ‘ভিসি অফিস’ স্থাপন করেন। সেখানে বসে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী হিসেবে কাজ করছেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাৎসরিক বাজেট মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগের সচিব বরাবর পেশ করার কথা থাকলেও রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এখনো তা করেনি।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ভিসি বিশ্বজিতের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত গোলাম সারোয়ার ও গোলাম আযম ২০১৮ সালে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে উপপরিচালক হিসেবে যোগ দেন। এর আগে ২০১৭ সালে অন্য একটি আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানে সহকারী পরিচালক ছিলেন তারা। ২০২০ সালে গোলাম সারোয়ার পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) পদে নিয়োগ পান। অর্থাৎ মাত্র তিন বছরে তার ছয় ধাপ বেতন স্কেলের উন্নতি হয়েছে।
২০১৮ সালের ১৫ এপ্রিল ৯ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে একজনকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে রাজধানীর শাহবাগ থানা পুলিশ। অবাক করার বিষয় হলো, ওই মামলায় আটকদের কোনো নাম উল্লেখ না করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও কর্মচারী উল্লেখ করা হয়েছে। ৪ ও ৩নং বিবাদী এবং আলিম আল রাজী ও গোলাম সারোয়ারকে সাক্ষী হিসেবে বর্ণনা করা হলেও তাদের পদবি ও ঠিকানা গোপন করা হয়েছে। তিন বছর পার হলেও এখনো এ মামলার চার্জ গঠন হয়নি। ইতিমধ্যে মামলাটি মিথ্যা বলে মামলার বাদীই স্বীকারোক্তি দিয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, বাদী ও সাক্ষীরা আসামির বাড়িতে গিয়ে ১২ লাখ টাকা ফেরত দিয়ে এসেছেন। ওই ব্যক্তিকে যেদিন গ্রেপ্তার করা হয়েছিল সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ছিল। অথচ বলা হয়েছিল, ছাত্র-কর্মচারীরা তাকে আটক করে। সংশ্লিষ্ট একটি পক্ষ দাবি করেছে, আসামি একজন চাকরিপ্রার্থী। বিশ্বজিৎ ঘোষ তার গাড়িচালককে দিয়ে ঘুষের টাকাসহ ওই ব্যক্তিকে আসতে বলেন। কিন্তু আসামি অঙ্গীকারনামা ছাড়া ঘুষ দিতে অস্বীকার করায় বিভেদ সৃষ্টি হয়। তখন ওই চাকরিপ্রার্থীকে থানায় সোপর্দ ও গাড়িচালককে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
একটি পক্ষ অভিযোগ করেছে, বিশ্বজিৎ ঘোষের অনিয়ম ঠেকানোর কথা থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক ড. সৈয়দ আকরাম হোসেন, কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. দেলওয়ার হোসেন এবং অধ্যাপক এ কে এম গোলাম রাব্বানী তাকে সহযোগিতা করছেন।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ‘গেজেটের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু না হলেও’ ২০১৯ সালের ১৬ মে ৩ হাজার কোটি টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্পের চুক্তি সম্পাদন করে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। একই দিন ২৭ হাজার ১১৫ কোটি টাকার একটি বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে। এছাড়া ভিসির ‘কথিত’ অস্থায়ী কার্যালয়ে যেসব আসবাবপত্র কেনা হয়েছে সেগুলোর কোনো অডিট সম্পন্ন হয়নি। এর অনেক কিছুই আবার ছিল অপ্রয়োজনীয়। প্রয়োজনীয়/অপ্রয়োজনীয় বিপুল পরিমাণ মালামাল ক্রয় করা হয়েছে বা সবই বেআইনি, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে। অন্যান্য বিবাদীরা ওই কর্মকান্ডে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা ও সমর্থন/অনুমোদন দিয়েছেন। সব মিলে প্রায় ১০ কোটি টাকা ‘অপচয়’ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। যেসব উন্নয়ন চুক্তি করা হয়েছে সেগুলোতে কোনো প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
নিজস্ব ক্যাম্পাস না থাকার পরও বিশ্ববিদ্যালয়টি শিক্ষার্থী ভর্তি করেছে। এখন তাদের ঠিকমতো পাঠদান করতে পারছে না। এতে হুমকির মুখে চার শতাধিক শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ। ২০১৮ ও ২০১৯ সালের দুটি চুক্তিপত্রে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে, ‘নিজস্ব অবকাঠামো না থাকায় পাঠদান কার্যক্রম কতটা ফলপ্রসূ হবে সে বিষয়ে যথেষ্ট ঝুঁকি থেকেই যায়’। ‘ঝুঁকি’ থাকার পরও কেন শিক্ষার্থী ভর্তি করা হলো, তার কোনো সদুত্তর নেই ভিসি ও তার সহযোগীদের কাছে।
এদিকে ২০১৮ সালের ৪ জুন বিশ্ববিদ্যালয় বাছাই কমিটির সিদ্ধান্ত অনুসাওে পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) পদে ড. মো. মিজানুর রহমানকে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়। এরপর তিন বছর পার হলেও তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেছেন। ড. মিজানুর রহমান গতকাল বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ৫ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা পেশ করা হয়েছে। ‘ঘুষের’ টাকা না দেওয়ায় তাকে আর নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
ড. মিজানুর রহমান আরও বলেন, আইনের ‘অপব্যবহার, অপব্যাখ্যা’ করে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১৬ এর ৩৭(২) ধারা মোতাবেক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সংবিধি প্রণয়ন করেছেন ভিসি বিশ^জিৎ। আইনে বর্ণিত আছে, ‘সিন্ডিকেট, সিনেট ও চ্যান্সেলরের অনুমোদন সাপেক্ষে সংবিধি প্রণয়ন, সংশোধন বা বাতিল করিবে’ অথচ এ যাবৎ সিনেটের কোনো সভাই ডাকা হয়নি। অথচ তিনি এখন প্রধান নির্বাহী পদেও দায়িত্ব পালন করছেন।
রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে উপ-রেজিস্ট্রার পদে আট বছরের বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ ছিল। সেই নিয়ম না মেনে মো. সোহরাব আলীকে ওই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। জানা গেছে, একপর্যায়ে তার নিয়োগ বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু ‘ম্যানেজ করে’ কয়েক দিন পর পুনরায় ওই পদে নিয়োগ পান ‘ভিসির ঘনিষ্ঠ’ হিসেবে পরিচিত সোহরাব আলী। তিনি ‘নিয়োগবাণিজ্যের’ সব নিয়োগে স্বাক্ষরকারী। ৫ হাজার ৩০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প চুক্তিতেও স্বাক্ষরকারী তিনি। বিভিন্ন নিয়োগে ভিসির ঘনিষ্ঠজনদের ভাই, ভগ্নিপতি, ফুপাতো ভাই, ভাতিজা, ভাগ্নে, স্বামী-স্ত্রী নিয়োগ পেয়েছেন। জনসংযোগ বিভাগে নিয়োগে গণযোগাযোগ বিভাগ থেকে স্নাতক ডিগ্রির বিধান থাকলেও নেওয়া হয়েছে সংগীতে স্নাতক। ১৫ বছরের ডেপুটি রেজিস্ট্রার হিসেবে অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি থাকলেও কোনো অভিজ্ঞতা নেই এমন ব্যক্তিকে রেজিস্ট্রার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। উপপরিচালক (অর্থ ও হিসাব) পদে সহপরিচালক (হিসাব) পদে আট বছরের অভিজ্ঞতা বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ থাকলেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে শূন্য বছরের অভিজ্ঞ সহপরিচালককে। পরিচালক পদে এক বিজ্ঞপ্তিতে সর্বনিম্ন বয়স ৪৫, অপর বিজ্ঞপ্তিতে ৪০ বছর, এহেন তুঘলকি কারবার হয়েছে এ জনবল নিয়োগে। একই বিজ্ঞপ্তিতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা এক পদে, অপর পদে যেকোনো স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছে।
রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় আইন বাংলাদেশের ৪৫(২) ধারায় বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মহাহিসাব-নিরীক্ষকের সহিত পরামর্শক্রমে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টে নিয়োগ করিবেন ভিসি। কিন্তু তিনি চ্যার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট নিয়োগ দেননি। মহাহিসাব-নিরীক্ষক স্বতন্ত্রভাবেও হিসাব নিরীক্ষা করেননি।
এ সব অভিযোগের বিষয়ে ড. বিশ্বজিৎ ঘোষের সঙ্গে কথা বলে দেশ রূপান্তর। তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। নিয়োগবাণিজ্যের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নিয়োগ কমিটিতে সরকারে প্রতিনিধিরা থাকেন। তারা কি ঘাস কেটেছেন?’ পরিচালক পদে একজনের নিয়োগ আটকে থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যোগ্য প্রার্থী খুঁজে পাইনি বলেই নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়নি।’ অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন নিয়মিত এর অডিট করছে। যারা অভিযোগ তুলেছে তাদের জিজ্ঞাসা করেন কোন কোন জিনিস আমি বেশি কিনেছি।’ সরকারের অডিট কমিটি দ্বারা খরচের অডিট করানো হয়েছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা বারবার অডিট কমিটিকে চিঠি দিয়েছি। তারা বলেছেন পরে সব একত্রে করবেন।’
ক্যাম্পাসে অফিস না করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অফিস করার বিষয়ে ড. বিশ্বজিৎ বলেন, ‘প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অতিথি অফিস থাকে। আমাদেরও ধানমণ্ডিতে এমন একটি আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি বসি না। আগে বসতাম। আর এটা নিয়ে যারা প্রশ্ন তুলেছেন তাদের জিজ্ঞাসা করেন যে যখন কিছু ছিল না তখন তারা কোথায় ছিলেন? কেউ তো বলেননি যে কোথায় বসে অফিস করবেন।’
ক্যাম্পাস না থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থী ভর্তি করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও স্থায়ী ক্যাম্পাস না হওয়া পর্যন্ত অন্যত্র ক্লাস নিয়েছে। আমাদের ৪০০ শিক্ষার্থী আছে। আমরা তাদের অন্য তিনটি ক্যাম্পাসে ক্লাস নিচ্ছি। এখানে দোষের কী আছে?’