সন্তানকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন সব বাবারই থাকে। কেউ ভাবেন, ছোটবেলা থেকে কড়া শাসন আর নিয়মানুবর্তিতার পাঠ শিখিয়ে বড় করে তুলবেন সন্তানকে। আবার কেউ ভাবেন সন্তানের সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশতে হবে, জানতে হবে তার সব অনুভূতির কথা। কীভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়বেন? লিখেছেন মোহসীনা লাইজু
মনোরোগবিদরা বলেন, সন্তানকে নিয়মানুবর্তিতা অবশ্যই শেখাবেন, সঙ্গে তাকে ভালো মন্দের বিচার করতেও শেখাতে হবে। তবেই সন্তানের সঙ্গে সম্পর্ক হবে বন্ধুর মতো। সন্তান যদি বাবাকে ভয় পায়, তাহলে ছোটবেলা থেকে কখনো নিজের মনের কথা বলতে পারবে না। কীসে আনন্দ পায়, কীসে দুঃখ পায় এবং কীসে ভয় পায় প্রকাশ করতে দ্বিধাগ্রস্ত থাকবে। একজন বাবা হিসেবে সন্তানের এই বিষয়গুলো জানা সব থেকে জরুরি।
মনোযোগ দিন
সব সন্তানই চায় তার একান্ত কথা ও ভালোমন্দ শোনার কেউ যেন থাকে। স্কুলে বা বন্ধুদের সঙ্গে কোনো সমস্যা হলে আলোচনা করার জন্য কাউকে প্রয়োজন। বাবার মধ্যে সেই ভরসার জায়গা খুঁজে পেলে বাবাই হয়ে উঠবে বেস্টফ্রেন্ড। তেমনি বাবার উচিত নিজের সমস্যার কথাও সন্তানকে একটু আধটু বলা। সন্তান যদি তার মতো করে কোনো সমাধান দেয়, তাও মন দিয়ে শোনা। সন্তানের সঙ্গে দিনের শেষে মুখোমুখি বসে কিছুটা সময় হলেও কথা বলা। ব্যস্ত শিডিউলের মধ্যে থেকেও সন্তানের জন্য সময় বের করা। অনেক সন্তান মনে করে বাবা-মা তাদের সময় দেন না। তখন নিজেদের বঞ্চিত ও অবহেলিত ভাবে। সন্তানের এমন ধারণা কোনো দিন যেন তৈরি না হয়। সন্তানের সঙ্গে কোয়ালিটিপূর্ণ সময় কাটাতে হবে। এক সঙ্গে সিনেমা দেখা, বেড়াতে যাওয়া ও খেলাধুলা করা। সন্তানের সঙ্গে ভালো সময় কাটানো খুব জরুরি। সন্তানের জীবনে কী ঘটছে, সেই বিষয়ে খেয়াল রাখাও জরুরি। বিশেষ করে টিন সন্তানের ক্ষেত্রে। তবে অতিরিক্ত প্রোটেকটিভ হওয়া যাবে না। এতে সন্তানের মনে হতে পারে তার ওপর নজরদারি করা হচ্ছে। সন্তানের কোনটা ভুল, কোনটা ঠিক শৈশব থেকেই শেখাতে হবে। যাতে নিজেরাই ঠিকটা বেছে নিতে পারে। সন্তানকে বোঝান আপনি তাকে বিশ্বাস করেন। সন্তান কী পোশাক পরবে বা কোন বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করবে। সেই বিষয়ে তাকেও সিদ্ধান্ত নিতে দিন। সন্তানের জীবনের সব কিছু আপনি ঠিক করে দিতে যাবেন না। সন্তানের জীবনের সব সিদ্ধান্ত আপনি নিতে গেলে সে আপনার ওপর বিরক্ত হবে এবং সম্পর্কে ফাটল দেখা দেবে। সন্তানকে পরামর্শ দিতেই পারেন, কিন্তু নিজের সিদ্ধান্ত জোর করে তার ওপরে চাপিয়ে দেবেন না।
সম্পর্কের ভিত
কে বলে যে বাবা সন্তানের বন্ধু হয়ে উঠতে পারেন না। জেনারেশন গ্যাপ থাকলে বয়স কি কখনো বন্ধুত্বের অন্তরায় হতে পারে। জেনে রাখবেন সব সফল সম্পর্কের ভিত হলো বন্ধুত্ব। সেই তালিকা থেকে বাদ পড়বে না বাবা ও সন্তান। অনেক বাবাই সন্তানের বন্ধু হতে পারেন না। একটা সময় ছিল যখন বাবা শুধু সন্তানের অভিভাবক ও প্রতিপালক ছিলেন। কিন্তু সময় বদলে গেছে। ছেলেমেয়েরা অনেক স্বাধীন। তাদের মানুষ করতে হলে তাদেরই একজন হয়ে উঠতে হবে। সন্তানের বন্ধু হয়ে উঠলে সহজেই তার বিশ্বাস অর্জন করা যায়। তাকে বড় করে তোলাও সহজ হবে। সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতানো সহজ নয়। কারণ অনেক টিন সন্তানরা বড়দের ভরসা করতে পারে না। তাদের বিশ্বাস অর্জন করতে হলে তাদের মতো করেই ভাবতে হবে।
বাবার উচিত, সন্তানের সীমাবদ্ধতা যাচাই করে তার থেকে প্রত্যাশা করা। নিজেদের অপূর্ণ আকাক্সক্ষা সন্তানের মাধ্যমে পূরণ করার চেষ্টাই তাদের মানসিক রোগীতে পরিণত করে। এই ভাবনা থেকে বাবাকে বের হয়ে আসতে হবে। সন্তানের যে বিষয় ভালো লাগবে, তাকে সেই বিষয় নিয়ে পড়তে উৎসাহ দেওয়া উচিত। সন্তান যে কাজে উৎসাহ দেখাবে সেই কাজ করতে তাকে উৎসাহ দিতে হবে। অনেক বাবা আছেন সন্তানের পছন্দের বিষয়ে পড়তে না দিয়ে তার পছন্দের বিষয়ে পড়তে বাধ্য করেন। এতে দেখা যায় পড়ার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। বছর বছর অকৃতকার্য হয়ে মানসিক অবসাদে ভোগে।
পাশে থাকুন
তথ্যপ্রযুত্তির সহজপ্রাপ্যতার কারণে সন্তানের কাছে অনেক কিছুই সহজলভ্য। তারা কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ বুঝতে পারে না। সেক্ষেত্রে তারা যদি সব কিছু বাবার কাছে নির্ভয়ে, নিঃসঙ্কোচে, নির্দ্বিধায় বলতে পারে বাবা যদি ধৈর্য ধরে সেই কথা শোনেন এবং সন্তানদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন তবে অনেক সমস্যার সমাধান হবে। সবসময় তাদের পাশে থাকেন তবেই সন্তান ও বাবার মধ্যে সমন্বয়পূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠবে।
সন্তানও পরবর্তীকালে কোনো কিছুই বাবার অজ্ঞাতে করার কথা ভাববে না। সন্তানকে সব কিছুতেই বাধা দেওয়া, অন্যের উদাহরণ দিয়ে ছোট করা যাবে না। তার ভালো কাজের স্বীকৃতি দিতে হবে। প্রয়োজনে পরিবারের অন্যদেরও জানাতে হবে সাফল্যের কথা। সমাজ পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অভিভাবককেও মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে হয়। নিজেদের পুরনো ধারণা থেকে বেরিয়ে সন্তানদের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করতে হবে। সন্তানকে কিছুটা অনুশাসনেও রাখতে হবে। কেন মন্দটি সে বর্জন করবে তারও ব্যাখ্যা সন্তানকে দিতে হবে। কোনো কাজে ব্যর্থ হলে তাকে বিদ্রুপ না করে শেখাতে হবে ব্যর্থতাই সাফল্যের চাবিকাঠি।
সন্তানকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সব থেকে ভালো উপায় হলো তার ভালো কাজকে উৎসাহ দেওয়া। খারাপ সময়ে আস্থা নিয়ে পাশে থাকা। তার প্রচেষ্টা বা উদ্যমকে সব সময় যথাযথ সম্মান জানানোর চেষ্টা করুন। প্রয়োজন মনে করলে অবশ্যই সন্তানের কাজ বা প্রচেষ্টার খামতিগুলোকে ধরিয়ে দিতে হবে। সমসাময়িক নানা ঘটনার কারণে অনেকেই সন্তানকে নিয়ে উদ্বিগ্ন হন। প্রথমে বোঝা দরকার ওর যে পরিবর্তন হচ্ছে সেটা নেগেটিভ কি-না। যদি বুঝতে পারেন, ধীরে ধীরে তার পা পিছলে যাচ্ছে, তাহলে নজরদারি বাড়াতে হবে। উদাহরণ দিয়ে বোঝান। বলুন, আমরা চাই না তোমার দ্বারা এমন কিছু ঘটুক, যা তোমার, আমাদের ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর। এতে করে যতই ব্রেইনওয়াশ করা হোক না কেন, যখন সে বুঝবে বাবা এটা সমর্থন করছেন না তখন দোটানায় পড়ে যাবে। যদি দেখেন আপনার কথা আমলে নিচ্ছে না, তাহলে ওর বন্ধুদের মাধ্যমে বোঝাতে পারেন। যারা ওর বন্ধু কিন্তু বিপথে যায়নি, তাদের সঙ্গে আলাপ করুন। বোঝাতে বলুন। কারণ আপনার চেয়ে বন্ধুদের কাছে ও অনেক বেশি সহজ হতে পারে। বন্ধুদের কথায়ও কোনো কাজ না হলে মনোচিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। কিংবা পরিবারের যার কথা সন্তান শোনে তাকে দিয়ে বলান।
ক্ষতিকর আসক্তি
ছেলেমেয়েদের টেলিভিশন, ফেইসবুক, ইন্টারনেট ব্যবহারের নিয়ম করে দিন। আস্তে আস্তে মোবাইলে কথা বলা কমাতে হবে। ঘর বন্ধ করে মোবাইল, ইন্টারনেট ও ল্যাপটপ ব্যবহার করতে দেওয়া যাবে না। ইন্টারনেট সম্পর্কিত অপরাধ এবং কীভাবে এগুলো ভবিষ্যৎ নষ্ট করে তা সন্তানের সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করুন। ভালো-মন্দ যেকোনো বিষয়ে আসক্তি ক্ষতিকর। অতিরিক্ত আসক্তি থেকে হঠাৎ বেরিয়ে আসা যায় না। ধীরে ধীরে বেরোতে হয়। প্রয়োজনে সাইকোথেরাপির মাধ্যমে এই আসক্তি দূর করুন।
সন্তান যখন দূরে
ভালো কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করানোর জন্য সন্তানকে হয়তো দূরে পড়তে পাঠালেন। কিন্তু তাকে এলাকার বাইরে পড়তে পাঠানোর আগে কিছু বিষয়ে জানা জরুরি। যেখানে পড়তে যাবে সেখানে আপনার কাছের কেউ আছে কি না খোঁজ নিন। যিনি আপনার সন্তানের দেখাশোনা করতে পারবেন। হোস্টেলে থাকলে তার নিয়মনীতি জানতে হবে। নতুন পরিবেশে আপনার সন্তান অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে মানিয়ে নিতে পারবে কি না বোঝার চেষ্টা করুন। পরিবার থেকে দূরে, নতুন পরিবেশে, নতুন ধরনের খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত হতে সময় লাগে। অসুস্থও হয়ে পড়তে পারে। পরিবার থেকে আলাদা হওয়ার কারণে ডিপ্রেশন বা অ্যাংজাইটি হতে পারে। এসব বিষয় সন্তানকে আগেই তৈরি করে নিতে হবে। ১৮ বছর বয়সে সবাই যে একা থাকার দায়িত্ব ও মানসিক চাপ সামলানোর মতো পরিপক্ব হয়ে ওঠে, তা বলা যায় না। তার মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করুন। এসব বিষয়ে সন্তানের সঙ্গে কথা বলুন। আসলেই চাপ সামলাতে পারবে? তার সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নিন।