ছোট বোনের সঙ্গে স্বামী শফিকুল ইসলামের পরকীয়া সন্দেহ করতেন মেহজাবিন ইসলাম মুন। মা-বাবাকে বলার পরও তারা গুরুত্ব দেননি। এ নিয়ে তাদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডা হয়। এরই জের ধরে গত শুক্রবার রাতে মেহজাবিন খাবারের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করার পর মা, বাবা ও ছোট বোনকে শ্বাসরোধে হত্যা করেছে বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। পরে তাকে আটক করা হয়।
রাজধানীর কদমতলীর মুরাদপুর এলাকার ২৮ নম্বর লালমিয়া সরকার রোডের ছয়তলা বাড়ির দ্বিতীয় তলার ভাড়া বাসায় এ ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন, মেহজাবিনের ওমান প্রবাসী বাবা মাসুদ রানা (৫০), মা মৌসুমী ইসলাম (৪০) ও বোন জান্নাতুল (২০)।
আটক হওয়ার আগে মেহজাবিন জরুরি সেবার হটলাইন ‘৯৯৯’-এ কল করে স্বামী ও মেয়েকে মেরে ফেলার হুমকি দেন। পরে গতকাল শনিবার সকালে পুলিশ গিয়ে ওই বাসা থেকে অসুস্থ অবস্থায় মেহজাবিনের স্বামী শফিকুল ইসলাম ও তার প্রথম স্বামীর ঘরের ছয় বছর বয়সী মেয়ে মারজান তাবাসসুম তৃপ্তিয়াকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করে।
কদমতলী থানার ওসি জামাল উদ্দিন মীর জানান, শুক্রবার রাতে খাবারের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে মা-বাবা ও বোনকে অচেতন করে হত্যা করেন মেহজাবিন। আজ (গতকাল) সকাল ৮টার দিকে ৯৯৯-এ ফোন করে তিনি বলেন, ‘তিনজনকে মেরে ফেলেছি। দ্রুত পুলিশ না এলে স্বামী-সন্তানকেও মেরে ফেলব।’
নিহতদের স্বজন, পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায়, মাসুদ রানা প্রবাসী। তিন মাস আগে ওমান থেকে দেশে ফেরেন। তার বেশকিছু সম্পদ রয়েছে এবং এ নিয়ে পরিবারের সঙ্গে বিরোধ চলছিল মেহজাবিনের। সম্পত্তি লিখে দেওয়ার জন্য মা-বাবাকে চাপ দিতেন মেহজাবিন। বিষয়টি মীমাংসায় আগে সালিশও হয়েছে। স্বামীর সঙ্গে ছোট বোনের পরকীয়া ছাড়াও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের বিষয় থানা-পুলিশে অভিযোগ করেছিল মেহজাবিন। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে মেহজাবিনের প্রথম বিয়ে হয়েছিল। সেই স্বামীকে খুনের দায়ে তার জেল হলেও এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিতে পারেননি স্বজনরা।
মেহজাবিনের চাচাতো বোন শিলা বলেন, ‘মেহজাবিন পরিবারের সবাইকে শেষ করে দিতে চেয়েছিল। ৫-৬ বছর আগে সে আগের স্বামীকে হত্যা করেছিল। সেই হত্যা মামলায় মা, বাবা, বোনসহ মেহজাবিনের জেল হয়। পাঁচ বছর পর মেহজাবিন জামিনে ছাড়া পায়। ওই মামলায় গ্রেপ্তারের আগেই শফিকের সঙ্গে তার দ্বিতীয় বিয়ে হয়। মেহজাবিনের কারাগারে থাকার সুবাদে ছোট বোন জান্নাতের সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে শফিক।’ তিনি আরও বলেন, ‘দুদিন আগে স্বামী-সন্তানকে নিয়ে মায়ের বাসায় বেড়াতে আসে মেহজাবিন। ছোট বোনের সঙ্গে স্বামীর পরকীয়ার কথা আগেই মা-বাবাকে জানিয়েছিল। এদিনও এসে বললে মা-বাবা হয়তো গুরুত্ব দেননি। এসব নিয়ে তাদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা হয়। এরই জেরে হয়তো সে হত্যাকাণ্ড ঘটিতে থাকতে পারে।’
মেহজাবিনের খালা ইয়াসমিন বলেন, ‘ছোট মেয়ে জান্নাতের সঙ্গে পরকীয়ায় বাধা দিলে শাশুড়ি মৌসুমীকে চার বছর আগে মারধর ও আগুনে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা করেন শফিক। দীর্ঘদিন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হন মৌসুমী। তার পেটে ১১০টি সেলাই দিতে হয়। ওই ঘটনায় থানায় শফিকের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে।’
তিনি দাবি করেন, ‘মেহজাবিনের একার পক্ষে তিনজনকে হত্যা করা সম্ভব নয়। এ হত্যাকাণ্ডে শফিক কিংবা অন্য কারও যোগসাজশ রয়েছে। বিষয়টির সঠিক তদন্ত হওয়া দরকার।’
ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে এসেছিলাম। শুক্রবার রাতে মেহজাবিন খাবার ও চা দিলে খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ি। আমার মেয়েও অচেতন হয়ে যায়। এরপর কী ঘটেছে আমার মনে নেই।’
গতকাল সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট ঘটনাস্থল থেকে পরিবেশন করা খাবারের নমুনা, আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে। ময়নাতদন্তের জন্য লাশগুলো ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। রাতে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি।
কদমতলী থানার ওসি জামাল উদ্দীন মীর জানান, তারা বাসায় গিয়ে লাশগুলো হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পেয়েছেন। নিহতদের গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর। তবে সেখানে কেউ নেই, সবাই ঢাকায় বসবাস করতেন।
এ বিষয়ে ওয়ারী জোনের ডিসি ইফতেখারুল ইসলাম বলেন, ‘মেহজাবিন হত্যা করে ঘটনাস্থল থেকে ফোনে পুলিশ দ্রুত না গেলে নিজের স্বামী-সন্তানকেও মেরে ফেলার হুমকি দেন। পরে পুলিশ গিয়ে লাশগুলো উদ্ধার ও তাকে আটক করে। হত্যাকাণ্ড অনুসন্ধানে মেহজাবিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।’