ফিরে আসছেন মওলানা ভাসানী

আমাদের দেশে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে নিয়ে যে পরিমাণ এবং মানের লেখালেখি হওয়ার কথা, তা যে হয় না সেটি যতই দুঃখজনক হোক না কেন, সত্য। একটা কারণ হতে পারে, মওলানা ভাসানী যে ধারার রাজনীতি করেছেন আজীবন, সেই ধারার রাজনীতিকে বহমান রাখার মতো ব্যক্তি বা দলের অনুপস্থিতি।

সেই সঙ্গে এ কথাও বলা যায়, মওলানা ভাসানীর পাঞ্জাবির দীর্ঘছায়ায় যারা নিরাপত্তা পেয়েছেন মেনন, রনো, কাজী জাফর, মান্নান ভূঁইয়ারা পরে আর ধারণ করেননি মওলানাকে। এমনকি তা তাদের জন্য চরম অকৃতজ্ঞতা হলেও। তৃতীয়ত, মওলানা ভাসানীর রাজনীতি এবং সংগ্রাম যে ব্যাপক বহুমাত্রিকতা অর্জন করেছিল, তা বুঝতে পারা ও ব্যাখ্যা করার মতো রাজনীতিবিশ্লেষক এই দেশে নেই।

সর্বশেষ যে ব্যাপারটি খুবই সাম্প্রতিক, শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থে মওলানাকে যেভাবে তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে, তা পাঠের পরে অনেকেই মওলানা ভাসানীর নামোচ্চারণ করাটাকেও অপরাধ বলে গণ্য করতে শুরু করেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথিত ভাসানীই যে সবটুকু ভাসানী নন, তা স্বীকার করতেও অনেকের সাহসে কুলায় না।

তবু যে শিরোনামে বলা হচ্ছে, মওলানা ভাসানীর ফিরে আসার কথা তার ভিত্তিটা কোথায়? ভিত্তি হচ্ছে বর্তমানে এই দেশে প্রচলিত ডান-বাম-মধ্যপন্থি ছোট-বড় সবগুলো রাজনৈতিক দলের স্থবিরতা। সার্বিকভাবে এই দেশে বর্তমানে পুরো রাজনীতিতে যে দেউলিয়াপনা বিরাজ করছে, তা থেকে মুক্ত হতে হলে এ দেশের মানুষকে মওলানা ভাসানীর রাজনীতির দিকে আবার ফিরে তাকাতেই হবে।

আপাতত যে বইটি সামনে রেখে মওলানা ভাসানীকে স্মরণ করছি সেই বইটার দিকে ফিরে তাকানো যাক। সৌমিত্র দস্তিদারের লেখা ‘আমি ও আমার মওলানা ভাসানী’। কলকাতা নিবাসী সৌমিত্র দস্তিদার এই বাংলার রাজনীতিসচেতন মানুষের কাছে প্রথম পরিচিত হয়ে ওঠেন তার নির্মিত দুটি তথ্যচিত্রের মাধ্যমে। ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘু মুসলমানদের নিয়ে নির্মিত ‘মুসলমানের কথা’ এবং পরে ‘সীমান্ত আখ্যান’। তার ভিন্নধারার রাজনৈতিক লেখালেখি এখন ঢাকাসহ সমগ্র বাংলাদেশেই তার গুণগ্রাহী পাঠক তৈরি করেছে। তিনি যখন মওলানা ভাসানীকে নিয়ে একটি গ্রন্থ রচনা করেন, তা আমাদের দৃষ্টিকে বিশেষভাবেই আগ্রহী করে তোলে। কারণ বইটা না পড়েও আন্দাজ করা যায়, মওলানা ভাসানীকে নিয়ে প্রচলিত আলোচনাগুলোর বাইরে এই বইতে নতুন কিছু তথ্য ও রাজনৈতিক-সামাজিক ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে। বইটি পাঠের পরে সেই পূর্বধারণাই সত্যি প্রমাণিত হয়। আমরা আমাদের প্রিয় মওলানাকে দেখতে শিখি নতুন আলোয়।

মওলানা কোন ইসলামকে ধারণ করতেন? এই গ্রন্থে লেখক এক অসাধারণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। মওলানা ভাসানী ছিলেন বাংলার লোকায়ত ‘কৃষি ইসলাম’-এর ধারক। এই কৃষি ইসলামের জন্ম বাংলার মাটিতে। কোরআন-হাদিসের লোকায়ত তাফসির, ইসলামি পুথি, ফকিরি গান, মুর্শিদি গান, কৃষকের প্রাণে বেজে চলা লালনের সুর, স্নেহ-ভালোবাসাই যে ইসলামের মূল কথা সেই ইসলামের নাম লেখক দিয়েছেন কৃষি ইসলাম। এই ইসলাম হিন্দু-মুসলমানে ভেদাভেদ করতে জানে না। চেনে কেবল ‘জালিম’ ও ‘মজলুম’। সেই সূত্রেই মওলানা ভাসানী কৃষকের প্রাণের নেতা ও ‘মজলুম জননেতা’।

কৃষক ও গরিব মানুষের পক্ষে আন্দোলন করতে গিয়েই তার রাজনীতিতে আসা।

এক সুফি সাধক সৈয়দ নাসিরউদ্দিন বোগদাদির সংস্পর্শে আসে সিরাজগঞ্জের পিতৃমাতৃহীন কিশোর চেকা মিয়া। কেউ কেউ হামিদ বলে ডাকত। বোগদাদি কিশোরকে সঙ্গে করে নিয়ে যান আসামের জলেশ্বরে। চেকা মিয়া ‘গ্রামের পাঠশালায় শিখেছিলেন বাংলা। অ্যাকাডেমিক ইসলামের সঙ্গে পরিচয় হয় বোগদাদি সাহেবের প্রভাবে। ইসলামের আধ্যাত্মিক বিষয় কোরআন-হাদিস-ফিকাহ প্রভৃতি জ্ঞানের পাশাপাশি আরবি ও উর্দু ভাষায় জলেশ্বরের দিনগুলোতেই সড়গড় হয়ে ওঠেন আবদুল হামিদ। ...সৈয়দ নাসিরউদ্দীন বোগদাদি আরও উচ্চশিক্ষার জন্য তাকে পাঠিয়ে দেন দেওবন্দে। ...দেওবন্দে গিয়ে স্বাধীনতাকামী ভারতবিখ্যাত আলেমদের সংস্পর্শে এসে আবদুল হামিদ খানের জীবনদর্শনই বদলে গেল। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায় তেমন আগ্রহ না থাকলেও স্বাধীনতা আন্দোলনে তার আগ্রহ উসকে দিল দেওবন্দ।’ [পৃষ্ঠা ২৯-৩০]।

দেওবন্দে ছিলেন মাত্র দুই বছর। মানে উচ্চশিক্ষা তিনি সম্পন্ন করেননি। তার প্রয়োজন মনে করেননি। পীরের কাছে ফিরে এলেও বেশি দিন থাকেননি। সন্তোষের একটি স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন। সেটিও স্বল্পস্থায়ী। তিনি ফিরে গেলেন কৃষক এবং গরিব মানুষের আন্দোলনে। তার সারা জীবনের আন্দোলনের অনুপুঙ্খ বিবরণ পাওয়া যাবে ভাসানীকে নিয়ে লেখা বিভিন্ন বইতে।

মওলানা কখন সমাজতন্ত্রী হলেন? বলে রাখা ভালো প্রথাগত সমাজতন্ত্রী তিনি ছিলেন না। কিন্তু এ দেশের সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব ও চিন্তাধারা, ভৌগোলিক বিন্যাস, ইতিহাস-ঐতিহ্য বিবেচনায় নিলে বলতে হবে যে মওলানা ভাসানী যে ধরনের সমাজতন্ত্রের কথা বলতেন, সেটিই ছিল সঠিক। সম্ভবত এখনো ভাসানীর ইসলামি সমাজতন্ত্রের আহ্বানই সঠিক। কৃষক আন্দোলন করতে গিয়ে এবং কলকাতায় অবস্থানকালে কিছু সমাজতন্ত্রী ও কমিউনিস্টদের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। বামপন্থিদের সততা, নিষ্ঠা, ত্যাগ, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ আপসহীন লড়াই তাকে আকৃষ্ট করেছিল। কিন্তু কমিউনিজম তত্ত্বটিকে তার কাছে সবচেয়ে ভালোভাবে উপস্থাপন করেছিলেন মোখলেসুর রহমান নামের একজন যুবক। বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। থাকতেন কলকাতায়। এ দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে তার নাম কোথায় চোখে পড়ে না। কিন্তু সেই মোখলেসুর বা মুখলেছুরই ছিলেন ভাসানীকে সমাজতন্ত্র প্রাঞ্জলভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার মানুষ। সেই যুবকের সঙ্গে গড়ের মাঠে দিনের পর দিন আলাপ হয়েছে ভাসানীর। আলোচনা শেষ হয়েছিল মোখলেসুর রহমানের টানা উপসংহারে। তিনি মওলানাকে বলেছিলেন ‘মজলুম যেমন মুসলমান তেমনি মজলুম আপনার প্রতিবেশী হিন্দুও। অন্ন, বস্ত্র, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থানের কোথাও কোনো নিশ্চয়তা নেই ওই হতদরিদ্র কৃষক মজুরদের। সেজন্য দায়ী শোষক সমাজের নিজেদের স্বার্থে তৈরি আইন। প্রচলিত আইনব্যবস্থাই সমাজে শ্রেণিব্যবস্থা টিকিয়ে রেখেছে। শ্রেণিবিভক্ত সমাজে একদিকে সামন্ত ভূস্বামী মহাজন, পেশাদার ধর্ম ব্যবসায়ী, পির পুরোহিতরা অন্যদিকে শতসহস্র গরিব জনসাধারণ। শাসকের আইনের বিধান আমাদের পাল্টাতে হবে। গড়ে তুলতে হবে শোষণহীন নতুন এক সমাজব্যবস্থা। ধর্মশিক্ষা দেওয়ার মতো আলেম-ওলামা এ দেশে প্রচুর। পরকালের দিকনির্দেশ করার হলে তারা করুন। আপনি শুধু মানুষকে বলুন ইহকাল আগে। ইহকালে যারা যন্ত্রণায় ছটফট করছেন তাদের পাশে দাঁড়ানোই আপনার একমাত্র কাজ।’ [পৃষ্ঠা ৪১]।

পরে সমাজতন্ত্রের তাত্ত্বিক পড়াশোনা করেছেন মওলানা, আর প্রায়োগিক রূপ দেখতে গিয়েছেন চীনে। মুগ্ধ হয়েছেন। মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেছেন, এটাই এ দেশের মানুষের মুক্তির পথ। তবে রাশিয়া বা চীনের মডেল নয়, বাংলাদেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে এ দেশের জন্য প্রযোজ্য নিজস্ব পদ্ধতিতে।

মওলানা ভাসানীর দ্বিতীয় যে বৈশিষ্ট্যটি এই গ্রন্থে খুব গুরুত্বের সঙ্গে এসেছে, তা হচ্ছে ‘প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা’। এই শব্দটির সঙ্গে পরিচিত আমাদের সাহিত্যের জগৎ, বিশেষ করে যারা লিটল ম্যাগাজিনের সঙ্গে আছেন। কিন্তু তারা প্রতিষ্ঠান বলতে ঠিক কী বোঝায় সেটি সম্পর্কে নিশ্চিত নন। ভাসানীর কাছে প্রতিষ্ঠান হচ্ছে রাষ্ট্র। বিশেষ করে নিবর্তনমূলক রাষ্ট্র। যে রাষ্ট্র গরিব-কৃষক-প্রজার মুক্তির পথ বন্ধ করে রেখেছে। কোনো রাজনৈতিক দল, সে ক্ষমতাসীনই হোক, আর বিরোধী দলই হোক, যদি তাদের কার্যক্রম বৃহত্তর কৃষক, মজুর, গরিব, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর পক্ষে না হয়, তাহলে সেই দল মওলানা ভাসানীর কাছে প্রতিষ্ঠানের সেবাদাস ও রক্ষক। সেই কারণেই মুসলিম লীগ করলেও সেই দলের এলিটদের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে তার পক্ষে আপস করা সম্ভব হয়নি। প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা তার মনে-মজ্জায় এমনভাবে গেঁথে গিয়েছিল যে তিনি যে দল করতেন, সেই দল ক্ষমতায় গিয়ে সাধারণ মানুষের পক্ষে কাজ না করায় বিনা দ্বিধায় ত্যাগ করেছেন দল। মানুষ সাধারণত নানা রকম স্বার্থের কারণে ভিড় করে সরকারি দলে। আর ভাসানী বারবার ত্যাগ করেছেন সরকারি দল। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতায় যখন মুসলিম লীগ, সেই সময় তিনি ত্যাগ করলেন সেই দল। প্রতিষ্ঠা করলেন আওয়ামী মুসলিম লীগ। পরে মুসলিম শব্দটিকে বাদ দিয়ে দলের নামকরণ করলেন আওয়ামী লীগ। আবার আওয়ামী লীগ যখন প্রাদেশিক বা কেন্দ্রীয় সরকারে যুক্ত, সোহরাওয়ার্দী যখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, তখন মওলানা সেই সরকারি দল আওয়ামী লীগ ত্যাগ করলেন। কারণ সেই একই। আওয়ামী লীগের প্রধানমন্ত্রী এবং অন্য মন্ত্রী-এমপিরা সাধারণ মানুষের বদলে নব্য ধনিক শ্রেণির স্বার্থরক্ষায় ব্যস্ত। দল থেকে বেরিয়ে মওলানা গঠন করলেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ন্যাপ।

আরও অসংখ্য প্রসঙ্গ আছে এই বইয়ে। যারা ভাসানী সম্পর্কে জানতে জানতে চান, তার রাজনীতি ও জীবন থেকে শিক্ষা নিতে চান, তাদের জন্য এই গ্রন্থ অবশ্যপাঠ্য বলেই মনে হয়।

বইয়ের নাম : আমি ও আমার মওলানা ভাসানী। লেখক : সৌমিত্র দস্তিদার। প্রকাশক : আবিষ্কার কলকাতা। প্রচ্ছদ : দেবাশিস সাহা। দাম ৩০০ টাকা (ভারত)। বাংলাদেশে প্রাপ্তিস্থান : উজান, কনকর্ড এম্পোরিয়াম। দাম ৫১০ টাকা।

লেখক কথাসাহিত্যিক