ইমেরিটাস পাবলিশার মহিউদ্দিন আহমদ

তাকে আমরা, প্রকাশক ও লেখক সমাজ, অভিহিত করেছিলাম ‘ইমেরিটাস পাবলিশার’ হিসেবে, আনুষ্ঠানিক বা স্বীকৃত কোনো পদবি নয়, তবে প্রকাশকদের মধ্য থেকে এমন সম্মানে যদি কাউকে ভূষিত করা যায় সেটা নিঃসন্দেহে তার প্রাপ্য। তিনি, মহিউদ্দিন আহমদ, বহুমাত্রিক একজন মানুষ, বাংলাদেশের প্রকাশনাকে যে উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন তা দেশের জন্য অজস্রভাবে ফলপ্রসূ হয়েছে। তার প্রয়াণে দেশ এক কৃতী সন্তানকে হারাল, যদিও তার এই কৃতিত্বের প্রকাশ অনেকটা থেকে গেছে অন্তরালে। আজ তার জীবনাবসানের পর এ-কথা বিশেষভাবে মনে জেগে উঠছে, কেননা তার অবদানে আমরা ঋদ্ধ হয়েছি, কিন্তু এর স্বীকৃতি কখনো তেমনভাবে দেওয়া হয়নি। প্রকাশক হিসেবে তার মুখ্য পরিচয়, সেইসঙ্গে তার কাজের ছিল আলাদা মাত্রা। যখন যে-কাজ তিনি করেছেন সেখানে সবসময়ে সৃজনশীলতা ও বিকাশের পরিচয় দিয়েছেন।

প্রকাশনা বিচারে দক্ষতা ও যোগ্যতায় তার সমকক্ষ কেউ ছিল না। তিনি পড়াশোনা করেছেন পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে, সাংবাদিকতা বিষয়ে। পাকিস্তান আমলে ষাটের দশকে দোর্দ- প্রতাপ আইয়ুবী শাসনের সময়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিলেন। কৃতিত্বের সঙ্গে এমএ পাস করে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা শুরু করেন। তবে স্বল্পকাল পরে তিনি করাচিতে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসে সম্পাদনা বিভাগে যোগ দেন। সেই সময়ে ইংরেজি প্রকাশনায় ওইউপি-র ছিল বিশ্বজনীন অবস্থান, মধ্যপ্রাচ্য, পাক-ভারত উপমহাদেশ, সিঙ্গাপুর হয়ে মেলবোর্ন পর্যন্ত তাদের দপ্তর ও ব্যবসার বিস্তার। হালে যাদের বলা হয় বহুজাতিক কোম্পানি সেরকম প্রতিষ্ঠানই ছিল ওইউপি। দক্ষ তরুণের জন্য এই কাজে ছিল বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন এবং নিজেকে আরও বড় কাজের জন্য যোগ্য করে তোলার সুযোগ। সেই যে প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত হলেন মহিউদ্দিন ভাই, অর্জন করেন বিশেষ পেশাদারি অভিজ্ঞতা, ভালোবাসার বন্ধনে জড়িয়ে গেলেন প্রকাশনার সঙ্গে, তারপর জীবনভর এই সাধনাই করে গেছেন।

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর দেশে ফিরে তিনি হাল ধরলেন অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের ঢাকা অফিসের। বিধ্বস্ত দেশে তখন ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ বিশেষ সীমিত, তদুপরি অক্সফোর্ড ম্যাকমিলানের মতো কোম্পানি প্রকাশনার আন্তর্জাতিক আধিপত্য নানাভাবে হারিয়ে ফেলতে বসেছে, তাই তাদের ব্যবসাও ক্রমে কুণ্ঠিত হতে শুরু করল, ঢাকা অফিস এক সময় বন্ধ হয়ে গেল। আর তখনই মহিউদ্দিন আহমদ সূচনা করলেন ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, মূলত ইংরেজি প্রকাশনা, পরে যুক্ত হলো বাংলা বই, যাতে সবসময়েই সচেষ্ট রইলেন মননশীলতার প্রকাশে। বাংলাদেশ অধ্যয়ন যখন বিষয় হিসেবে একেবারে অপাঙ্ক্তেয় তখন মহিউদ্দিন আহমদ ইংরেজিতে আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনা সম্ভার সাজিয়ে তুললেন, এর ফলে বাংলাদেশ সম্পর্কে দেশে এবং বিশেষভাবে বিদেশে যারা জানতে আগ্রহী তাদের জন্য ইউপিএল বিশাল সম্পদ তৈরি করলেন। এটা যে কতভাবে ফলপ্রসূ হয়েছে সেটার পরিমাপ আমরা করিনি, তবে এর দ্বারা শেষ বিচারে প্রভূতভাবে উপকৃত হয়েছে দেশ ও সমাজ।

প্রকাশনায় পেশাদারিত্বের উদাহরণ তিনি তৈরি করে গেছেন। সেই সঙ্গে ব্যতিক্রমীভাবে তিনি পেশাদারিত্ব অবলম্বনের জন্য অপর প্রকাশকদের অনুপ্রাণিত করেছেন, নানাভাবে তাদের শিক্ষিত করতে চেয়েছেন। এই লক্ষ্যে সম্পাদনার গুরুত্ব তিনি সবসময়ে তুলে ধরেছেন।

ইংরেজি ভাষায় তার ছিল বিশেষ দক্ষতা, সম্পাদনা বিষয়ে তিনি তো বিশেষজ্ঞ। ফলে ইউপিএলের প্রতিটি গ্রন্থে তার হাতের ছোঁয়া অনুভব করা যায়, যা গ্রন্থকে দিয়েছে আলাদা মর্যাদা। অসুস্থতার কারণে বেশ কয়েক বছর তিনি আর আগের মতো সক্রিয় থাকতে পারেননি, নতুবা বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে মহিউদ্দিন আহমদের প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার ফসল হিসেবে অনেক লেখককে সমবেত করে অনেক চিন্তাশীল বইয়ের জন্ম তিনি দিতে পারতেন। এখানে বিশেষভাবে মনে পড়ে মুক্তিযুদ্ধের পঁচিশ বছরে পদার্পণকালে তিনি ‘রোড টু বাংলাদেশ’ শীর্ষক সিরিজ গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে তার কাছ থেকে আরও অনেক পাওয়ার ছিল। জীবন তাকে সেই সুযোগ দেয়নি, তবে জীবনভর তিনি জাতির সাফল্য-ব্যর্থতা, অর্জন ও চ্যালেঞ্জ রূপায়িত করে চিন্তাশীল লেখকদের যত ধরনের বই আমাদের উপহার দিয়েছেন সে-এক বিশাল সম্পদ।

এই সমৃদ্ধ ভা-ারের উদ্গাতা প্রকাশক মহিউদ্দিন আহমদকে জানাই বিদায়ী শ্রদ্ধাঞ্জলি। তিনি নেই, তবে তার সম্পদ রয়ে যাবে সবার জন্য।

লেখক : প্রকাশক, লেখক।

ট্রাস্টি, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর