বিশ্বব্যাংক বলছে, বর্তমানে দেশের কলকারখানাগুলোতে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির প্রায় ৬০ শতাংশই হাতে চালানো হয়। আর ৪০ শতাংশের বেশি কারখানায় প্রশাসনিক কার্যক্রম ও উৎপাদন ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত কাগজপত্র হাতে লেখা হয়।
সংস্থাটি বলছে, দেশের উৎপাদনমুখী শিল্পকারখানা যারা চালান, তাদের অর্ধেকেরই স্নাতক ডিগ্রি নেই। এই ব্যবস্থাপকদের যদি স্নাতক ডিগ্রি থাকত, তাহলে কারখানাগুলোয় প্রযুক্তির ব্যবহার আরও ১০ শতাংশ বাড়ত।
বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ‘বাংলাদেশের উৎপাদন খাতের চাঙা ভবিষ্যতের জন্য’ শীর্ষক এই প্রতিবেদন গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে দেশের উৎপাদন খাতে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার শিল্পকারখানাগুলোকে করোনা সংকট কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করবে।
প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে অনলাইনে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের বেশির ভাগ শিল্পকারখানা পুরোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করে। খুব কমসংখ্যক কারখানায় অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। যেমন ৩০ শতাংশ কারখানায় পুরোপুরি সনাতনী পদ্ধতিতে পণ্য তৈরি করা হয়। মাত্র ১০ শতাংশের কম কারখানায় কম্পিউটারের মাধ্যমে যন্ত্রপাতি চলে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, এ দেশের ৪০ শতাংশ শিল্পকারখানায় কর্মীরা প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র হাতে লিখে থাকেন। তিন-চতুর্থাংশ প্রতিষ্ঠানে পণ্যের মান যাচাই করা হয় সনাতনী পদ্ধতিতে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে সস্তা শ্রমনির্ভর উৎপাদন খাতের পরিবর্তে উৎপাদনশীলতা ও প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বহু উদ্যোক্তা জানেনই না যে তাদের কারখানায় প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা আছে। আবার প্রযুক্তি ব্যবহারের উপায় সম্পর্কে জানেন না অনেক উদ্যোক্তা।
সংস্থাটি বলছে, বাংলাদেশের উৎপাদন খাতটি রপ্তানিনির্ভর। আবার রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি তৈরি পোশাক। সে জন্য এ দেশের উৎপাদন খাতকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে অভিহিত করেছে বিশ্বব্যাংক। কারণ, তৈরি পোশাক খাত যদি ধাক্কা খায়, তাহলে পুরো উৎপাদন খাত ভুগবে। এ ছাড়া দক্ষ শ্রমিকের যে অভাব রয়েছে, সেটিও বলেছে বিশ্বব্যাংক।
প্রতিবেদনটির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন এর সহলেখক ও বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ সিদ্ধার্থ শর্মা। তিনি বলেন, কর্মসংস্থানই বাংলাদেশে উন্নয়নের অন্যতম অগ্রাধিকার। প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে একটি রপ্তানিনির্ভর উৎপাদন খাত টেকসই ও অপেক্ষাকৃত ভালো মজুরির কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। তিনি বলেন, বাংলাদেশে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি অন্যান্য সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাতের দিকে নজর দিলে সার্বিকভাবে উৎপাদন খাত ভবিষ্যতের জন্য আরও প্রস্তুতি নিতে পারবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, করোনার ধাক্কা কাটিয়ে উঠছে উৎপাদন খাত। তৈরি পোশাক ও চামড়াশিল্পের বাইরে হালকা প্রকৌশল, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন খাতের সম্ভাবনা আছে। এসব খাতে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারলে উৎপাদনশীলতা বাড়বে।
বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান অর্থনীতিবিদ হ্যান্স টিমার বাংলাদেশের উৎপাদন খাতের দুটি সমস্যা চিহ্নিত করেন। এগুলো হলো প্রযুক্তি ব্যবহারে শ্লথগতি ও সুযোগের সর্বোত্তম ব্যবহার করতে না পারা। তিনি বলেন, এ দেশের শিল্পকারখানায় নারী শ্রমিকদের অংশগ্রহণ কম। নারীদের অংশগ্রহণে সমতা আনতে পারলে উৎপাদন খাত উপকৃত হবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাজারভিত্তিক দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা পূরণে শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজানো উচিত। কারিগরি শিক্ষায় বেশি মনোযোগী হতে হবে। কেননা, যে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল হচ্ছে, সেখানে দক্ষ শ্রমিক লাগবে।
নতুন প্রযুক্তি ব্যয়বহুল বলে মনে করেন তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি ফারুক হাসান। তিনি বলেন, এই প্রযুক্তি কেনার জন্য অর্থায়নের সংকট আছে। এ ছাড়া আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করার মতো দক্ষ লোকেরও ঘাটতি রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর মার্সি টেম্বনের মতে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে ৪০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হলেও কয়েক বছর ধরে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় এই খাতে কর্মসংস্থান কমেছে।
উৎপাদন খাতে কাজ করতে গিয়ে নারীরা বিভিন্ন বাধাবিপত্তির মুখে পড়েন বলে জানান বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষক নাজনীন আহমেদ। নিজের এক গবেষণার আলোকে তিনি বলেন, নারীরা কারখানায় আগে আসেন, পরে বাসায় ফেরেন। তবু অতিরিক্ত কাজের ভাতা মেলে না। নারীরা রাতের পালায় কাজ করতে পারেন না।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুশফিক মোবারক, বাণিজ্যসচিব তপন কান্তি ঘোষ, লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতিসাইফুল ইসলাম প্রমুখ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বিশ্বব্যাংকের আঞ্চলিক পরিচালক জৌবিদা খেরুস আলাওয়া।