পাইলসের অপারেশন করাতে গিয়ে ‘ভুল চিকিৎসায়’ সাবেক বুয়েট ছাত্রের মৃত্যু

কুমিল্লায় মেহেদী হাসান নামে এক বুয়েট শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। ওই শিক্ষার্থী বুয়েট থেকে পাস করে কানাডার দ্য ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলম্বিয়া নামের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে গবেষণারত ছিলেন।

গত ২২ জুন নগরীর গোমতী প্রাইভেট হাসপাতালে পাইলসের অপারেশন করার সময় ‘ভুল চিকিৎসায়’ তার মৃত্যু হয় বলে অভিযোগ পরিবারের। তবে ঘটনার তিন দিন অতিবাহিত হওয়ার পরও পরিবারের পক্ষ থেকে কোন মামলা না করায় বিষয়টি অজানা থেকে যায়।

শুক্রবার বিষয়টি নিয়ে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের পর এ নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়।

কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজের সার্জারি বিভাগের প্রধান ডা. জাহাঙ্গীর হোসেন ভূঁইয়াকে প্রধান এবং সিভিল সার্জন কার্যালয়ের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. শাহাদাৎ হোসেন ও কুমিল্লা সদর হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. অমৃত দেবনাথকে সদস্য করে এ কমিটি গঠন করা হয়।

শুক্রবার দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করেন জেলা সিভিল সার্জন ডা. মীর মোবারক হোসাইন। ভুল চিকিৎসার শিকার মেধাবী ছাত্র মেহেদী হাসান জেলার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার চান্দলা ইউনিয়নের সবুজপাড়া গ্রামের সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট আলী আক্কাসের ছেলে।

মেহেদীর পরিবার জানায়, তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে পাস করার পর বৃত্তি নিয়ে কানাডার দ্য ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলম্বিয়া নামের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে গবেষণারত ছিলেন। করোনায় গত বছরের মে মাসে দেশে আসেন। বাড়িতে থেকেই অনলাইনে গবেষণার বিষয়ে পরীক্ষা দিচ্ছিলেন। পাইলসের সমস্যা থাকায় ঢাকায় অপারেশন করতে চেয়েছিল পরিবার।

তারা জানায়, রোববার (২০ জুন) পাইলসের সমস্যা নিয়ে মেহেদী হাসান নগরীর নজরুল অ্যাভিনিউ সড়কের গোমতী নামের একটি প্রাইভেট হাসপাতালে যান। সেখানকার চিকিৎসক ও জেলার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সার্জারি কনসালট্যান্ট ডা. আবু বকর সিদ্দিক ফয়সলের চেম্বারে গেলে তাকে একই হাসপাতালে অপারেশন করতে বলা হয়। সেখানে ওই দিনই তার পাইলসের অপারেশন করা হয়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের জন্য তাকে চার ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয়।

তারা অভিযোগ করেন, চিকিৎসাধীন অবস্থায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের বিষয়টি ওই চিকিৎসককে অবহিত করা হলেও তিনি কোনো পদক্ষেপ নেননি। এক পর্যায়ে তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। পরদিন সোমবার গভীর রাতে তাকে বাদুরতলা এলাকার সিডিপ্যাথ নামের একটি প্রাইভেট হাসপাতালের আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। ওই হাসপাতালে একই চিকিৎসকসহ অন্য এক সার্জন আবার তার শরীরে সার্জারি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার (২২ জুন) বিকালে তার মৃত্যু হয়।

মেহেদী হাসানের ছোট ভাই কামরুল হাসান বলেন, ‘অপারেশনেও প্রক্রিয়াগত কিছু ভুল ছিল, তাছাড়া পেটে প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হলে চিকিৎসককে আলট্রা করাতে বললেও তিনি এতে কর্ণপাত করেননি। এ অপারেশনে চিকিৎসকের ভুল না হলে আমার মেধাবী ভাইকে এভাবে হারাতে হতো না। আমার ভাইয়ের মৃত্যুর পর ডা. আবু বকর সিদ্দিক ফয়সল আমাদের নিকট ভুল অপারেশনের বিষয়টি স্বীকার করে আমার মা ও আমাদের নিকট ক্ষমা চেয়ে কান্নাকাটি ও অনুশোচনা করে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তাছাড়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তড়িঘড়ি করে হাসপাতাল থেকে লাশ বের করে অ্যাম্বুলেন্সে উঠিয়ে দেয়। ওই রাতে বাড়িতে ফিরে পরদিন বুধবার মরদেহ দাফন করি।’

তিনি বলেন, ‘ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর ঘটনায় এ দেশে কয়জন চিকিৎসকের বিচার হয়েছে ? কার কাছে বিচার চাইব? চিকিৎসকের অভিযোগ তো তারাই তদন্ত করে, তাই আমরা লাশ নিয়ে মামলা পর্যন্ত যাইনি। তদন্ত কমিটি তো হলো দেখি কী বিচার হয়?’

শুক্রবার দুপুরে তদন্ত কমিটির প্রধান কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজের সার্জারি বিভাগের প্রধান ডা. জাহাঙ্গীর হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘এ বিষয়ে অফিসিয়ালি আমার হাতে এখনো তদন্ত কমিটির কোনো কাগজ আসেনি, কাগজ পাওয়ার পরই তদন্ত কাজ শুরু করব।’

কুমিল্লা সিভিল সার্জন ডা. মীর মোবারক হোসেন জানান, মৃত্যুর বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জেনে প্রাথমিকভাবে গোমতী হাসপাতাল পরিদর্শন করা হয়েছে এবং তদন্তের জন্য তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। রোববার থেকে ৭ কার্যদিবসের মধ্যে কমিটিকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য বলা হয়েছে।