ওয়াসার পানি : বাণিজ্য নাকি সেবা

পানির দাম আবার বাড়ানো হলো। এবারই প্রথম নয় এবং পাকা জ্যোতিষীর মতো নিশ্চিতভাবে বলা যায় এবারই শেষ নয়। এ নিয়ে গত ২০০৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ১৩ বছরে ১৪ বার বাড়ানো হলো। প্রতিবার একই বক্তব্য, দাম বাড়ানো নয়, মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। গ্রাহকরা তাদের আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সমন্বয় করতে না পারলেও কর্র্তৃপক্ষের কথা মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। মানবে না মানে, না মেনে যাবে কোথায়? ২০০৯ সালের জুলাই মাসে ঢাকা ওয়াসার আবাসিক পর্যায়ে প্রতি ইউনিট (১ হাজার লিটার) পানির দাম ছিল ৬ টাকা ৪ পয়সা। সর্বশেষ গত ২৪ মে পানির দাম আবারও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে, যা কার্যকর হবে আগামী ১ জুলাই থেকে। নতুন দর অনুযায়ী আবাসিক গ্রাহকদের প্রতি ১ হাজার লিটার পানির দাম দাঁড়াবে ১৫ টাকা ১৮ পয়সা। ওয়াসার পানি উৎপাদন সক্ষমতা ২৬০ কোটি লিটার। সে হিসেবে পানির দাম বৃদ্ধিতে বছরে ওয়াসার আয় বাড়বে পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন বাবদ প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। কিন্তু ওয়াসার গ্রাহকরা শুধু বছরে ১৫০ কোটি টাকা দেবেন না। পানির ব্যবহার বহুমুখী, তাই ব্যয়ও বাড়বে বহু গুণ।    

মানুষের জীবনধারণ ও জীবনযাপনের জন্য প্রধানতম প্রয়োজন পানি। পান করা, রান্না করা, গোসল ও কাপড় পরিষ্কার, চিকিৎসা, কৃষি, শিল্প, পরিবহনসহ এমন কী কাজ আছে যেখানে পানির প্রয়োজন নেই? এমনকি পানির ব্যবহার কমাতে যে টিস্যু পেপার ব্যবহার করা হয় সেই এক রোল টিস্যু পেপার তৈরিতে লাগে ১৪০ লিটার পানি। জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় এই পানি সরবরাহের দায়িত্ব ওয়াসার। প্রায় ৩ কোটি মানুষের ঢাকা নারায়ণগঞ্জ এলাকায় ওয়াসা শুধু পানি সরবরাহ নয় পয়ঃনিষ্কাশনের দায়িত্ব পালন করে। ফলে পানির সঙ্গে পয়ঃনিষ্কাশনের বিল মিলে দ্বিগুণ বিল দিতে হয়। কাগজে-কলমে ওয়াসার গ্রাহক আছে ৪ লাখের একটু বেশি আর পয়ঃনিষ্কাশনের গ্রাহক ৬১ হাজার। এক হিসাবে দেখা যায়, ওয়াসার ১৫.৯৫ শতাংশ পানি অপচয় হয়। অর্থাৎ দিনে ৪১ কোটি লিটার! বর্তমান দামে ২১৬ কোটি টাকা। অপচয় পুরোপুরি বন্ধ করতে না পারুক কিছুটা কমালেও তো পানির দাম বৃদ্ধির প্রয়োজন হতো না। ওয়াসার পানি উৎপাদন খরচ নাকি প্রতি হাজার লিটারে ২৫ টাকা। কেন এই খরচ হয় তার জবাবদিহি কি আছে? নেপালে পানির দাম বেশি, কোরিয়ায় বেশি, ফিলিপাইনে প্রতি হাজার লিটার ১৮ টাকা এসব বলে দাম বৃদ্ধিতে যুক্তির প্রলেপ লাগানোর চেষ্টা চলে। নেপাল পাহাড়ি দেশ, কোরিয়ার ৭০ শতাংশ পাহাড়ি অঞ্চল আর ৩০ শতাংশ সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চল, ফিলিপাইন ৭ হাজার দ্বীপের দেশ। আর বাংলাদেশ মিঠাপানির দেশ। এই তুলনা কি চলে? কিন্তু চালানো হচ্ছে। 

শুধু পানির দাম নয়, করোনা মহামারীর মধ্যে এক লাফে ওয়াসার এমডির বেতন বাড়ানো হয়েছে পৌনে ২ লাখ টাকা। এই বৃদ্ধির পর ওয়াসার এমডি হিসেবে তার মাসিক বেতন দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ২৫ হাজার টাকায়। এ হিসেবে গত ১২ বছরে এমডি সাহেবের মাসিক বেতন বেড়েছে ৪২১ শতাংশ। জিনিসপত্রের দাম যা বেড়েছে তাতে মানসম্পন্ন জীবনযাপন করা বড় কষ্ট। সে কথা বিবেচনা করে এবং ওয়াসার উন্নয়নে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি দিয়ে এই বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। তবে তারপরে যারা ওয়াসার এমডি হবেন, তারা যেন এই পরিমাণ বেতন না পান, সেটিও নিশ্চিত করেছে ওয়াসা। কত সুদূরপ্রসারী এবং জনস্বার্থ বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, ভাবুন অবস্থাটা!

ওয়াসার বর্তমান এমডি ২০০৯ সালের অক্টোবরে ৩ বছরের জন্য চুক্তিতে নিয়োগ পান। ওয়াসা সূত্রে জানা যায়, তখন তার সর্বমোট মাসিক বেতন ছিল ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এর মধ্যে মূল বেতন ছিল ৬০ হাজার টাকা। অন্যান্য খাতের মধ্যে বাড়িভাড়া ২০ হাজার, উৎসব-ভাতা ১০ হাজার, মেডিকেল ও বিনোদন-ভাতা ৪ হাজার এবং বিশেষ ভাতা ২২ হাজার টাকা। আর গত ২ মার্চ ওয়াসার সচিব ওয়াসার পরিচালককে (অর্থ) একটি চিঠি দেন। তাতে বলা হয়, এমডির বেতন এখন থেকে সর্বমোট ৬ লাখ ২৫ হাজার টাকা। মে মাসে তিনি মূল বেতন পেয়েছেন ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। উৎসব-ভাতা ৪৭ হাজার ৬৬৭ টাকা, বাড়িভাড়া ৩৫ হাজার, চিকিৎসা-ভাতা ৩৫ হাজার ৭৫০ টাকা এবং আপ্যায়ন-ভাতা ৩৫ হাজার ৭৫০ টাকা, বিশেষ ভাতা ১ লাখ ৮০ হাজার ৬৬ টাকা ও বাংলা নববর্ষ ভাতা ৪,৭৬৭ টাকা। 

অপচয়, বেতন-ভাতার পাশাপাশি ঢাকা ওয়াসায় দুর্নীতি নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে অনেক কথা আছে। কিন্তু দুর্নীতি দমন কমিশন যখন খাত চিহ্নিত করে তা দূর করার সুপারিশ করে, তখন দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা আর শুধু ধারণা থাকে না। ২০১৯ সালে দুর্নীতির ১১টি খাত চিহ্নিত করে সচিবালয়ে প্রতিবেদনটি স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলামের কাছে তুলে দিয়েছিলেন দুদক কমিশনার মোজাম্মেল হক খান। প্রতিবেদনে দুর্নীতির উৎস তুলে ধরার পাশাপাশি এসব দুর্নীতি প্রতিরোধে ১২ দফা সুপারিশও তুলে ধরেছিল দুদক।

দুদকের প্রতিবেদনে ওয়াসায় দুর্নীতির ১১টি উৎস চিহ্নিত করা হয়েছিল। এর মধ্যে প্রকল্পকাজে দুর্নীতির তথ্য তুলে ধরা হয়েছে ৮টি। এগুলোর মধ্যে প্রধান হলো ওয়াসার প্রকল্পগুলো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ না করে বিভিন্ন অজুহাতে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা ও প্রকল্প ব্যয় বাড়ানো হয়। এ ক্ষেত্রে প্রকল্প পরিচালকসহ প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী এবং ওয়াসার ব্যবস্থাপনা কর্র্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের নকশা ও স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী কাজ করা হয় না। উদাহরণ হিসেবে ঢাকাসহ বৃহত্তর মিরপুর এলাকার পানির চাহিদা পূরণে মিরপুরের ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা হ্রাস করে প্রকল্পের কথা তুলে ধরা হয়। প্রকল্পটি ২০১২ সালের ২২ নভেম্বর অনুমোদন হয়। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) অনুযায়ী ৫২১ কোটি টাকার প্রকল্প ২০১৭ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কাজ শেষ হয়নি প্রকল্পের ব্যয় ৫৭৩ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারের ২০০ কোটি ৫ লাখ, ওয়াসার ১০ কোটি, প্রকল্প সাহায্য ৩৬২ কোটি ৯৫ লাখ। 

ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ মহানগরীতে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ধরে রাখতে নেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন প্রকল্পগুলোতে দুর্নীতি পেয়েছে দুদক। অযৌক্তিকভাবে প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ বাড়ানো এবং কাজের প্রগতির সঙ্গে ঠিকাদারের পরিশোধিত বিলের অনেক পার্থক্য দেখেছিলেন তারা।

ভূ-উপরিস্থ পানি শোধন করে ঢাকা মহানগরীর পানি সরবরাহ নিশ্চিতের জন্য ৪ হাজার ৫৯৭ কোটি ব্যয়ে ‘সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার (ফেজ-৩) প্রকল্প’ ২০২০ সালের জুলাইয়ের মধ্যে এবং সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ‘পদ্মা (জশলদিয়া) পানি শোধনাগার নির্মাণ (ফেজ-১) প্রকল্প ২০১৮ সালের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও তা হয়নি। ভূ-উপরিস্থ পানি শোধন করে ঢাকা মহানগরীর পানি সরবরাহ নিশ্চিতের জন্য ৫ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া হয় ‘ঢাকা এনভায়রনমেন্টাল সাসটেইনেবল ওয়াটার সাপ্লাই প্রকল্প।’ গুলশান, বনানীসহ অন্যান্য এলাকায় পয়ঃবর্জ্য পরিশোধনের জন্য নেওয়া হয় ৩ হাজার ৩১৭ কোটি টাকার ‘দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার প্রকল্প’। এ দুই প্রকল্প ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা ছিল। ‘ঢাকা মহানগরীর আগারগাঁও এলাকায় ২৪ কোটি টাকার বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্প’ ২০১৭ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। ‘ঢাকা পানি সরবরাহ নেটওয়ার্ক উন্নয়ন প্রকল্প’ বরাদ্দ ৩ হাজার ১৮২ কোটি টাকা। ২০২১ সালে ডিসেম্বরে কাজ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি নেই। তবে কাজের অগ্রগতি না থাকলেও বিল পরিশোধ করা হয়েছে কার্যাদেশ পাওয়া ঠিকাদারদের। এসব তো গেল অনুসন্ধানে উঠে আসা দুর্নীতি ও অপচয়ের একটা চিত্র মাত্র। ওয়াসার পানি গড়িয়ে যাওয়ার মতো কত টাকা যে গড়িয়ে কার পকেটে গেছে তা অনুমান করতে কষ্ট হয় না। 

মানুষ ও গাধা উভয়েই বোঝা বহন করে। কিন্তু মানুষ বুদ্ধিমান তাই নিজের বোঝা প্রাণীর পিঠে বা যন্ত্রের ওপর চাপাতে পারে। আর যারা অতি বুদ্ধিমান তারা প্রতি মুহূর্তেই এদিক-ওদিক তাকাতে থাকে কার ওপর বোঝা চাপিয়ে নিজে নির্ভার হতে পারে। রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার পর প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটি ব্যক্তি মানুষের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠল। রাষ্ট্র নামক এই প্রতিষ্ঠান কি মানুষের দায় নেবে নাকি এটা বিশাল বোঝা হয়ে সাধারণ মানুষের কাঁধে চাপবে তা নিয়ে পুঁজিবাদ এবং সমাজতন্ত্রে বিরোধ আছে। যাক! সেসব বিরোধের কথা। এখন মানুষ দেখছে রাষ্ট্র নামক প্রতিষ্ঠানে এমন সব বুদ্ধিমান মানুষ আছে যারা প্রতিটি ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায় সাধারণ মানুষের কাঁধে চাপিয়ে দেন। রাষ্ট্রের মন্ত্রী, আমলা, পুলিশ, মিলিটারি, বিদ্যুৎ, পানি, চিকিৎসা, শিক্ষাসহ এমন কোনো খাত নেই যার ব্যয়ের বোঝা জনগণের কাঁধে তুলে দেন না তারা। তাদের ভুল নীতি, অপচয়, দুর্নীতির দায়ও নিতে হবে সাধারণ মানুষকেই। ফলে রাষ্ট্রীয় সেবা বলে আর কিছু থাকছে না। মুনাফার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হতে থাকলে কোনো প্রতিষ্ঠান জনগণের টাকায় গড়ে ওঠে, জনগণের টাকায় পরিচালিত হয়ে জনগণের ওপর বোঝা চাপাতে পারে। সাম্প্রতিক পানির দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত এমনই এক দৃষ্টান্ত। ১৩ বছরে ১৪ বার পানির দাম, ১১ বার বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনে ব্যয় কতটা বাড়িয়েছে তা বিশ্বের ব্যয়বহুল নগরীর তালিকায় ঢাকার নাম দেখে এটা সরকারের সাফল্য বলে আনন্দে বগল বাজাবেন নাকি কেউ?

লেখক রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট

rratan.spb@gmail.com