আগস্ট পর্যন্ত ছাড় দিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক

বকেয়া ঋণের ২০ শতাংশ না দিলে খেলাপি

ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে ঋণ পরিশোধে আবারও ছাড় দিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এবার একেবারে ঢালাওভাবে সুবিধা না দিয়ে বকেয়া ঋণের ২০ শতাংশ জমা দেওয়া সাপেক্ষে আগামী আগস্ট পর্যন্ত ঋণ পরিশোধে ছাড় দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পদক্ষেপে সন্তুষ্ট হতে পারছে না ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ২০ শতাংশ অর্থ কোনো ব্যবসায়ী দিতে পারবে না। তাছাড়া করোনায় সরকার যেভাবে বিধিনিষেধ বাড়াচ্ছে তাতে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেও কোনো ব্যবসায়ী ঋণ পরিশোধ করতে পারবে না।

গতকাল রবিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে জারি করা এক সার্কুলারে বলা হয়, চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত কোনো ঋণের কিস্তি বকেয়া থাকলে তার ২০ শতাংশ অর্থ ব্যাংকার্স-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে আগামী ৩১ আগস্টের মধ্যে পরিশোধ করলে ওই ঋণটিকে খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকৃত করতে পারবে না ব্যাংক। এক্ষেত্রে জুন মাস পর্যন্ত বকেয়া কিস্তির বাকি ৮০ শতাংশ সার্কুলারের নির্দেশনা অনুযায়ী সর্বশেষ কিস্তির সঙ্গে দিতে হবে। এছাড়া অন্যান্য কিস্তি যথাসময়ে দিতে হবে বলেও সার্কুলারে উল্লেখ করা হয়।

কভিড-১৯ এর সংক্রমণ পুনরায় বৃদ্ধি পাওয়ায় চলমান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিশীলতা বজায় রাখা ও বেসরকারি খাতে ঋণ বা বিনিয়োগ প্রবাহের গতিধারা স্বাভাবিক রাখার মাধ্যমে কাক্সিক্ষত বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে ঋণ পরিশোধে ছাড় দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর নতুন সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট হওয়ার কিছু নেই। বকেয়া ঋণের ২০ শতাংশ কীভাবে পরিশোধ করবেন ব্যবসায়ীরা। যেভাবে একে একে লকডাউন বাড়াচ্ছে সরকার। এতে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত ছাড় না দিলে ব্যবসায়ীরা বাঁচবে না। তাছাড়া ব্যাংকও তাদের গ্রাহকদের এই ছাড় বাড়িয়ে দিতে চায়। কেননা, গ্রাহক খেলাপি হয়ে পড়লে ব্যাংকেরই ক্ষতি। সেক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কেন এই সিদ্ধান্ত নিল তা বুঝতে পারছি না।’

গত বছরের মার্চে করোনা মহামারী ছড়িয়ে পড়লে অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতে ঋণ পরিশোধে বড় ধরনের ছাড় দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত কোনো ঋণের কিস্তি না দিয়েও গ্রাহকরা খেলাপি হননি। তবে চলতি বছরের শুরু থেকে এই ছাড় তুলে নেওয়া হয়।

তবে করোনা মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ দেখা দিলে মেয়াদি ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে কিস্তি বাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এক্ষেত্রে কোনো ঋণ পরিশোধের জন্য যে পরিমাণ সময় গ্রাহকের হাতে ছিল তার সঙ্গে আরও অর্ধেক পরিমাণ সময় বাড়িয়ে নেওয়া যায়। এছাড়া চলতি ও তলবি ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন মেয়াদে সময় দিয়ে আগামী ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়।

তবে এই সুবিধা পর্যাপ্ত নয় জানিয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরকে চিঠি দেন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর নতুন সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন।

সম্প্রতি গভর্নর ফজলে কবিরকে লেখা ওই চিঠিতে এফবিসিসিআই সভাপতি জানান, করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। অধিকাংশ শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ঋণের কিস্তি সময়মতো জমা দিতে পারছে না। এ জন্য ঋণ পরিশোধ না করলেও যাতে ব্যাংক খেলাপি না করে, সেই সুবিধা আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত চালু রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন এফবিসিসিআই সভাপতি জসিম উদ্দিন। একই দাবি জানিয়েছিল চট্টগ্রাম চেম্বারের নেতারাও। ব্যবসায়ীদের এমন দাবির মুখে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় না বাড়ালেও আগস্ট পর্যন্ত সময় দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

এদিকে গত বছর খেলাপি করার ওপর ছাড় দেওয়ায় ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ খুব একটা বাড়েনি। তবে চলতি বছরের শুরু থেকে ওই ছাড় তুলে নেওয়ায় খেলাপি ঋণ বাড়তে শুরু করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের স্থিতি দাঁড়ায় ৯৫ হাজার ৮৫ কোটি টাকা। যা ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের ৮.০৭ শতাংশ। মার্চ শেষে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ১১ লাখ ৭৭ হাজার ৬৫৮ কোটি টাকা।

পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যায়, গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ছিল ৮৮ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা। সেই হিসেবে চলতি বছরের মার্চে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৬ হাজার ৮০২ কোটি টাকা।