চোখ যায় না চুরির মালে!

সরকারি-বেসরকারি যৌথ মালিকানার প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামের স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের (এসএওসিএল) অন্তত ১৫০ কোটি টাকা লোপাট করে দেশে ও বিদেশে সম্পদ গড়ে তুলেছিলেন সংস্থাটির মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহেদ। দেশের চট্টগ্রামে ১৪টি ফ্ল্যাট, চারটি বহুতল ভবন এবং মালয়েশিয়ায় বিপণিবিতানে দামি শোরুম কেনার তথ্য মিলেছে দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে। এসব সম্পদের মূল্য অন্তত ১৫০ কোটি টাকা। এসএওসিএলের অর্ধেক মালিক সরকারের বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), বাকি অর্ধেকের মালিক স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল।

দেশের একটি জাতীয় দৈনিকে এসএওসিএলের ব্যাংক হিসাব থেকে বিপুল নগদ টাকা তুলে আত্মসাতের বিষয়ে ২০১৮ সালের ৬ মার্চ একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেখানে বলা হয়, এসএওসিএলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহেদ ও সংস্থাটির অর্ধেক মালিকদের প্রতিনিধি মো. মইনউদ্দিন এ অর্থ লোপাট করেছেন। সংবাদটি প্রকাশের দিনই দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানায়, মোহাম্মদ শাহেদ ও মইনউদ্দিনের বিরুদ্ধে এসএওসিএলের ব্যাংক হিসাব থেকে নগদ টাকা তুলে আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে প্রাথমিক অনুসন্ধানে সত্যতা মিলেছে। এরপর গত জানুয়ারি মাসে দুদকের দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এসএওসিএলের অর্থ লোপাটের সত্যতা মেলার কথা জানানো হয়। দুদক এখন মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এসএওসিএলের অর্থ আত্মসাৎকারী দুজনের মধ্যে মোহাম্মদ শাহেদ গত বছর করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। আর মইনউদ্দিন পলাতক। প্রশ্ন উঠেছে, মোহাম্মদ শাহেদের রেখে যাওয়া ১৫০ কোটি টাকার সম্পদ কি সরকার অধিগ্রহণ করবে? কারণ সরকারের নগদ অর্থ চুরি করে এসব সম্পদ গড়েছেন তিনি।

যেভাবে টাকা লোপাট : অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারের যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের নিবন্ধকের কার্যালয়ে (আরজেএসসি) নিবন্ধন করে গুডউইন পাওয়ার, ইঞ্জিনিয়ার এনার্জি অ্যান্ড ট্রেড ইন্টারন্যাশনালসহ সাতটি কোম্পানি খোলেন শাহেদ। চাকরির বিধিমালা অনুযায়ী এসএওসিএলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এমন কোম্পানি খুলতে পারেন না।

মইনউদ্দিন আহমেদ ২০১১-এর জুলাই থেকে ২০১২-এর জুন পর্যন্ত ১৩৮টি চেকের মাধ্যমে অগ্রিম ১৪ কোটি ৭৯ লাখ ৯৫ হাজার ১৯১ টাকা তুলে নিয়েছেন। এসএওসিএলের কর্মকর্তারা বলছেন, ওই টাকা তার ফেরত দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তিনি তা দেননি। ২০১২ থেকে ২০১৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত শাহেদ বিভিন্ন অজুহাতে নগদে অন্তত ১৫০ কোটি টাকা তুলে নেন। এর মধ্যে এসএওসিএলের ব্যাংক হিসাব থেকে ১২১টি চেকের মাধ্যমে ৪৬ কোটি ৪৫ লাখ ৬ হাজার টাকা নগদ তোলা হয়েছে। এছাড়াও কোম্পানির চারটি ব্যাংক হিসাব থেকে প্রায় ১০০ কোটি টাকা লোপাট করেন শাহেদ।

মো. মইনউদ্দিন নিজস্ব কোম্পানি পিরামিড এক্সিম এবং মোহাম্মদ শাহেদের কোম্পানি গুডউইন পাওয়ার দুটোই লুব তেল আমদানি ও বিপণন করে। এ দুই কোম্পানির নামে চট্টগ্রামে সাউথইস্ট ব্যাংক লিমিটেড ও প্রিমিয়ার ব্যাংক লিমিটেডের আগ্রাবাদ শাখায় ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বড় বড় অঙ্কের নগদ টাকা জমা পড়ে বলে এসএওসিএলের ব্যাংক হিসাব থেকে জানা গেছে। জমা পড়া টাকার বেশিরভাগই পিরামিডের নামে। এসএওসিএলের হিসাব ও প্রশাসনিক বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আত্মসাৎ করা টাকাগুলো ভুয়া ভাউচারের নামে ওই কোম্পানি থেকে তুলে নেওয়া হয়। এ টাকা আবার একইদিন জমা পড়ে আগ্রাবাদে মোহাম্মদ শাহেদের কোম্পানি গুডউইন পাওয়ার লিমিটেডের প্রিমিয়ার ব্যাংকের হিসাবে।

১৫০ কোটি টাকার সম্পদের সন্ধান! : মালয়েশিয়া ও দেশের চট্টগ্রামে শাহেদের অন্তত ১৫০ কোটি টাকার সম্পদের সন্ধান মিলেছে দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে। এর মধ্যে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ১৪টি ফ্ল্যাটের সন্ধান মিলেছে। এছাড়া চট্টগ্রামে আরও চারটি বহুতল ভবন রয়েছে শাহেদের। পাওয়া গেছে মালয়েশিয়ার রাজধানীতে একটি বিপণিবিতানে স্পেস কেনার তথ্য।

২০১৫ সালের দিকে মোহাম্মদ শাহেদ নিউজিল্যান্ডে অভিবাসী হতে চেয়েছিলেন ব্যবসায়ী ক্যাটাগরিতে। এজন্য তিনি নিজের সম্পদের অর্থমূল্যের মূল্যায়ন করান একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে। চট্টগ্রামের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল সার্ভে বাংলাদেশ লিমিটেড নামে ওই প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে ২০১৪ সালের ৩ মার্চ সম্পদের মূল্য বিবরণী নেন তিনি। সেখানে চট্টগ্রাম, ফেনী ও ঢাকায় কোন ঠিকানায় শাহেদের ফ্ল্যাট রয়েছে এবং তার মূল্য কত সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য ও সম্পদের মূল্য তুলে ধরা হয়।

ন্যাশনাল সার্ভে বাংলাদেশ লিমিটেডের দেওয়া ওই মূল্যায়ন প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্ট ১৪টি ফ্ল্যাটের তথ্য দেওয়া হয় নিউজিল্যান্ডের নাগরিকত্বের আশায় করা ওই প্রতিবেদনটিতে। এসব ফ্ল্যাটের মূল্য দেখানো হয় ১৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এর মধ্যে চট্টগ্রামে ১২টি ফ্ল্যাট, ফেনীর সোনাগাজীর আমিরাবাদে একটি ও রাজধানীর একটি আবাসিক এলাকার একটি ফ্ল্যাট রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শাহেদের চট্টগ্রামের চারটি বহুতল ভবনের দাম ১০০ কোটি টাকার বেশি। চট্টগ্রামের পশ্চিম খুলশীর ইয়াকুব ফিউচার পার্ক এলাকায় ‘ন্যাশনাল পলিটেকনিক কলেজ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন। এটির ভবন ১০ তলা। প্রতিষ্ঠানটি শাহেদের বাবা মোহাম্মদ আবদুল বাকীর নামে গড়ে তোলা হয়। এ ভবনের পাশে ১০ কাঠার একটি জায়গা শাহেদ বেনামে কিনে নিয়েছেন, সেখানে তিনি ‘চিটাগাং ন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ’ নামে আরও একটি বহুতল ভবনের কাজ শুরু করেছেন।

শাহেদের তিন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, চট্টগ্রামের পশ্চিম খুলশীর মুরগির ফার্ম এলাকায় ‘ন্যাশনাল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট কলেজ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে শাহেদের। এটি দ্বিতল ভবন। শাহেদের ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছেন, চট্টগ্রামের খুলশী-২ এলাকায় একটি পাঁচতলা ভবনের মূল মালিক শাহেদ। এটি তার বোনের নামে কেনা হয়েছে।

শাহেদ নিউজিল্যান্ডে অভিবাসী হতে তার মালয়েশিয়ায় কেনা সম্পদের অর্থমূল্য সম্পর্কে দেশটির একটি আইন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রত্যয়নপত্র নেন। জেরাল্ডদিন অ্যান্ড অর্জুন অ্যাসোসিয়েটস নামের ওই প্রতিষ্ঠান মালয়েশিয়ায় শাহেদের কেনা একটি বিপণিবিতানের স্পেসের মূল্যসহ প্রত্যয়নপত্র দেয়। এছাড়া ২০১৩ সালের ৭ মে মালয়েশিয়ার স্টার রেসিডেনস এসডিএন বিএইচডি নামের প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বাণিজ্যিক স্পেস কেনার চুক্তিপত্রটিও দেশ রূপান্তর জোগাড় করেছে। এসব তথ্যে দেখা যায়, মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের বান্দারের এলাকার ৮৯ নম্বর সিকায়েসেন রোডে ফার্নিসড একটি বাণিজ্যিক স্পেস কিনেছেন শাহেদ। এটি কেনা হয়েছিল ৩০ লাখ ২১ হাজার ৮০০ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত দিয়ে। বর্তমানে বাংলাদেশি মুদ্রায় যার মূল্যমান ৬ কোটি ১৯ লাখের বেশি। ২০১৫ সালের ২৮ অক্টোবর মালয়েশিয়ার আইনজীবী প্রতিষ্ঠান বা ল ফার্মটি নিউজিল্যান্ড এমবাসির জন্য ওই মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করেছিল।

এসএওসিএলের আধা মালিক বিপিসি। বিপিসির অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানের অর্থ ফিরে পেতে আমরা আইনি লড়াই চালিয়ে যাব। এ ব্যাপারে যা যা করা দরকার আমরা করব।’