শনাক্তেও রেকর্ড

সর্বোচ্চ মৃত্যুর পর এবার করোনায় সর্বোচ্চ রোগীর রেকর্ড হলো বাংলাদশে। গত ২৪ ঘণ্টায় এক দিনে সবচেয়ে বেশি ৮ হাজার ৩৬৪ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। গত বছর ৮ মার্চ করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত এটাই এক দিনে সর্বোচ্চ রোগীর রেকর্ড। দৈনিক শনাক্ত রোগীর সংখ্যা আগের দিন রবিবারের ৫ হাজার ২৬৮ জন থেকে এক লাফে তিন হাজার বেড়ে এই রেকর্ড করে। এর আগে সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ের মধ্যে গত ৭ এপ্রিল ৭ হাজার ৬২৬ জন নতুন রোগী শনাক্তের খবর এসেছিল। দেশে মহামারী শুরুর পর থেকে সেটাই ছিল এক দিনে শনাক্ত রোগীর সর্বোচ্চ সংখ্যা। এ নিয়ে দেশে মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ৮ লাখ ৯৬ হাজার ৭৭০ জনে।

সর্বোচ্চ রোগীর পাশাপাশি গতকালও করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা একশর ওপরই রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে করোনায় মারা গেছে ১০৪ জন। এর মধ্যে শুধু খুলনা বিভাগেই ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগের দিন গত রবিবার করোনায় সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড হয়। সেদিন মারা যায় ১১৯ জন। সেদিনও খুলনা বিভাগে সর্বোচ্চ ৩২ জন মারা যায়। সব মিলিয়ে দেশে করোনাভাইরাসে মারা যাওয়া মানুষের সংখ্যা বেড়ে ১৪ হাজার ২৭৬ জন হলো।

দেশে সর্বোচ্চ রোগীর রেকর্ড উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সংক্রমণ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। রোগীর পাশাপাশি মৃত্যুও বাড়ছে। সংক্রমণ কমানো না গেলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া দেশের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যব্যবস্থা সামাল দিতে পারবে না।

এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন গতকাল সোমবার বলেন, ‘পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাতে করোনা সংক্রমণে এপ্রিলের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যেখানে সংক্রমণের হার বেশি, সেখানে মৃত্যুও বেশি হচ্ছে। সংক্রমণ যদি এভাবে ২১-২২ শতাংশ হতেই থাকে, তাহলে অচিরেই হাসপাতালের যেসব বেড খালি আছে, তা ভরে যাবে। আইসিইউ বেড সংকট দেখা দেবে।’

এ বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তা বলেন, ‘সীমান্তবর্তী এলাকায় সংক্রমণ বেশি। সীমান্তবর্তী প্রায় সব জেলায় যেখানে সংক্রমণ বেশি সেখানে মৃত্যুও হচ্ছে। সব জায়গায় মৃত্যুর পরিমাণ অনেক বেশি দেখছি। এজন্য আমাদের যেসব স্থান দিয়ে বিদেশ থেকে মানুষ আসছে, সেসব স্থানে আমরা বেশি পরিমাণে যদি হাউজ ট্রেনিং করতে পারি, তাহলে অনেক বেশি উপকার পেতে পারি।’

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এ পরিস্থিতি অবশ্যই আমাদের জন্য উদ্বেগের। কারণ যত রোগীর সংখ্যা বাড়বে, মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়বে। এবারের করোনা সংক্রমণ বিস্তৃত এলাকা নিয়ে, এটাই ভয়ের।’

দেশে প্রথম করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয় গত বছর ৮ মার্চ। তারপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে সংক্রমণ। গত বছরের শেষ দিকে এসে সংক্রমণ কমতে থাকে। পরে এ বছরের মার্চ থেকে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু আবার বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গত ৫ এপ্রিল থেকে সাত দিনের জন্য গণপরিবহন চলাচলসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করে সরকার। পরে তা আরও দুদিন বাড়ানো হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় ১৪ থেকে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত আরও কঠোর বিধিনিষেধ দিয়ে ‘সর্বাত্মক লকডাউন’ শুরু হয়। পরে তা আরও বাড়িয়ে ১৫ জুলাই পর্যন্ত করা হয়। কিন্তু দেশে সংক্রমণ পরিস্থিতি এপ্রিলের মতো ভয়ংকর রূপ নিতে থাকে। এ পরিস্থিতিতে ২২ জুন থেকে ঢাকাকে সারা দেশ থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন রাখার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ঢাকার আশপাশের চারটি জেলাসহ সাতটি জেলায় জরুরি সেবা ছাড়া সব ধরনের চলাচল ও কার্যক্রম ৩০ জুন মধ্যরাত পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। এরপরও গত দুই সপ্তাহ ধরে সংক্রমণ ও মৃতের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।

এমন পরিস্থিতিতে গত বৃহস্পতিবার দেশে কমপক্ষে ১৪ দিন সম্পূর্ণ ‘শাটডাউন’ করতে করোনাসংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি সুপারিশ করে। সে সুপারিশ অনুযায়ী গতকাল থেকে সারা দেশে সব গণপরিবহন ও মার্কেট-শপিং মল বন্ধ রয়েছে। আর বৃহস্পতিবার শুরু হবে ‘সর্বাত্মক লকডাউন’, বন্ধ থাকবে সব সরকারি-বেসরকারি অফিসও।

এবার করোনার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা শুরু হয় গত ঈদুল ফিতরের পরপরই। ভারত সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে রোগী দ্রুত বাড়তে থাকে। পরে তা আশপাশ জেলায়ও ছড়িয়ে পড়ে। এক মাসের ব্যবধানে দৈনিক শনাক্ত রোগীর সংখ্যা, মৃত্যু ও শনাক্তের হার কয়েকগুণ বেড়েছে। বর্তমানে দেশের অধিকাংশ জেলা করোনার ভয়াবহতার ঝুঁকিতে রয়েছে। ১৪ থেকে ২০ জুন নমুনা পরীক্ষা ও রোগী শনাক্তের হার বিবেচনায় নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাপ্তাহিক রোগতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৪০টিই সংক্রমণের অতি উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে।

বেশি রোগী ঢাকায় : ঢাকা নগরীসহ জেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় সর্বাধিক ৩ হাজার ১৬৫ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। যশোরে ৪৫৪, রাজশাহী জেলায় ৩২৩, চট্টগ্রাম জেলায় ৩২৭ ও খুলনা জেলায় ৩১১ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়েছে। এছাড়া গতকাল দিনাজপুরে জেলায় ১৭৮, কুষ্টিয়ায় ১৭২, ফরিদপুরে ১৬২, টাঙ্গাইলে ১৬১, ঝিনাইদহে ১৪৩, গাজীপুরে ১২৪, বাগেরহাটে ১২৪, ময়মনসিংহে ১২২, ঠাকুরগাঁওয়ে ১১৫ এবং কুমিল্লায় ১০৪ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে মোট শনাক্তের ৩৮ শতাংশ রোগীই ঢাকার।

দৈনিক গড় মৃত্যু ৮৮ : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ১০ দিন দেশে দৈনিক গড়ে ৮৮ জন করে মারা গেছে। অথচ সর্বোচ্চ সংক্রমণের সময় গত এপ্রিল মাসে দৈনিক গড় মৃত্যু ছিল ৮০ জন করে। এর পরের মাসে অবশ্য মৃত্যু কমে আসে এবং গড়ে দৈনিক ৩৬ জন করে মারা যায়।

গত এক দিনে ঢাকা বিভাগে যে ২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, তাদের ১৭ জনই ছিল ঢাকা জেলার। খুলনায় মারা যাওয়া ৩৫ জনের মধ্যে ৯ জনই ছিল কুষ্টিয়া জেলার। এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ১৯, রাজশাহী বিভাগে ৭, রংপুর বিভাগে ৯, ময়মনসিংহ বিভাগে ৫ এবং বরিশাল বিভাগে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে।

মৃত্যু হওয়া ১০৪ জনের মধ্যে ৫৮ জনেরই বয়স ছিল ৬০ বছরের বেশি। ২৩ জনের বয়স ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে, ১৪ জনের বয়স ছিল ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে, ৪ জনের বয়স ছিল ৩১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে এবং ৫ জনের বয়স ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে ছিল। তাদের ৬৮ জন ছিল পুরুষ, ৩৬ জন নারী। ৮২ জন সরকারি হাসপাতালে, ১৫ জন বেসরকারি হাসপাতালে এবং ৭ জন বাসায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।

শনাক্তের হার বেড়েছে : গত ২৪ ঘণ্টায় পরীক্ষা অনুপাতে রোগী শনাক্তের হার নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় শনাক্তের হার দাঁড়িয়েছে ২৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ যা আগের দিন ২১ দশমিক ৫৯ শতাংশ ছিল। দেশে এ পর্যন্ত মোট শনাক্তের হার ১৩ দশমিক ৭১ শতাংশ। শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ৯০ দশমিক ০৬ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৫৯ শতাংশ। ঢাকা জেলায় দৈনিক শনাক্তের হার আগের দিনের ১২ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৮ শতাংশ হয়েছে। ঢাকা বিভাগে ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ।

এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশ, রংপুর বিভাগে ৩৭ দশমিক ০৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪২ দশমিক ২০ শতাংশ, খুলনা বিভাগে ৪১ দশমিক ৪০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৬ দশমিক ২৮ শতাংশ হয়েছে। রাজশাহী বিভাগে ২১ দশমিক ১২ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ২০ দশমিক ৬০ শতাংশ।

নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে শনাক্তের হার বেড়ে ২৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ হয়েছে, আগের দিন যা ২১ শতাংশের সামান্য বেশি ছিল। সরকারি হিসাবে গত এক দিনে আরও ৩ হাজার ৫৭০ জন সুস্থ হয়েছে। এ পর্যন্ত মোট সুস্থ হলো ৮ লাখ ৭ হাজার ৬৭৩ জন।

খুলনার অবস্থা বেশি খারাপ : ডা. মুশতাক হোসেন জানান, ঢাকায় গতকাল পর্যন্ত রোগী শনাক্তের হার ১৮ শতাংশ, তার আগের দিন ১২ শতাংশ ছিল। অর্থাৎ শনাক্ত হার ১০ শতাংশের ওপরে আছে। এটাও সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ। এর মধ্যে মহানগরীতে সংক্রমণ বেশি। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত খুলনায়। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে একটু কমেছে। চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী অঞ্চলে সংক্রমণ বাড়ছে। এখন সংক্রমণ সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়েছে, শুধু সীমান্ত এলাকায় সীমাবদ্ধ নয়। তবে ঘনীভূত সংক্রমণ খুলনা বিভাগেই বেশি। সেটা সীমান্ত এলাকার প্রভাবে হয়েছে। আর গত ঈদে ঢাকা থেকে বিভিন্ন জেলায় যাওয়ার প্রভাবও পড়েছে।

এখনকার পরিস্থিতি বেশি আশঙ্কামূলক : প্রথম ঢেউয়ের তুলনায় চলমান দ্বিতীয় ঢেউ বেশি আশঙ্কামূলক বলে মনে করছেন ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কারণ প্রথম ঢেউ ও দ্বিতীয় ঢেউয়ের শুরুর আগে পর্যন্ত সংক্রমণ পরিস্থিতি শহরকেন্দ্রিক ছিল। শহরে মানুষের যাতায়াত সহজেই ও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা গেছে। ফলে সংক্রমণ কমে গেছে দুই সপ্তাহের মাথায়। এবার সংক্রমণ ছড়িয়ে গেছে গ্রাম-গ্রামান্তরে। এবারের চ্যালেঞ্জটা ভিন্ন ও কঠিন। তবে গ্রামের একটা সুবিধা হলো সেখানে মানুষ একে অপরকে চেনে ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে যদি একে অপরের জন্য এগিয়ে আসে, তাহলে সহজেই নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। আশা করা যায় কমিউনিটিকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকবে ও স্বাস্থ্যবিধি-নিষেধ মেনে চলবে। কারণ তারা চোখের সামনেই তো দেখতে পাচ্ছে আক্রান্ত ও মৃত্যু।’

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিধিনিষেধ মানার পরামর্শ দিয়ে এ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘জনস্বাস্থ্যের বিষয়টা জোর জবরদস্তি করে হবে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাস্তায় থাকবে। জনগণ যাতে স্বাস্থ্যবিধি মানতে পারে, সে ব্যাপারে সহযোগিতা করতে পারে। বিধিনিষেধ মানার ক্ষেত্রে যেন একটা উদাহরণ সৃষ্টি। এর জন্য তৃণমূল পর্যায়ে সব শ্রেণির প্রতিনিধিকে সম্পৃক্ত করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন থেকেও যদি আমরা ব্যবস্থা নেই এবং তা সঠিকভাবে মানা হয়, তারপরও আগামী দুই সপ্তাহ পর্যন্ত রোগীর সংখ্যা কমবে না। দুই সপ্তাহ পর রোগী ও তিন সপ্তাহ পর মৃত্যু কমার লক্ষণ দেখা যাবে। কাজেই এই দুই-তিন সপ্তাহ সংক্রমণ বাড়ার ঝুঁকি এমনিতেই আছে। আর যেসব জেলায় এক সপ্তাহ আগে বিধিনিষেধ প্রয়োগ করেছে, সেখানে আর এক সপ্তাহ পর থেকে ফল পাওয়া যাবে।’