‘তৃতীয় বাংলাদেশ স্বল্পদৈর্ঘ্য ও প্রামাণ্য চলচ্চিত্র উৎসবে’ সেরা প্রামাণ্যচিত্রসহ চার বিভাগে পুরস্কার পেয়েছে রাসেল রানা দোজা’র প্রামাণ্যচিত্র ‘হাউসের ধুয়া’। এ ছাড়া তার ‘সোনারতরী’ নামে একটি প্রামাণ্যচিত্র সরকারি অনুদানও পেয়েছে। এসব নিয়ে তিনি কথা বললেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সুদীপ্ত সাইদ খান।
‘হাউসের ধুয়া’ সেরা প্রামাণ্যচিত্রসহ চার বিভাগে পুরস্কৃত হলো। আপনার অনুভূতি জানতে চাই….
কাজের স্বীকৃতি সত্যিই আনন্দের। হাউসের ধুয়া চলচ্চিত্রটি শিল্পকলার চলচ্চিত্র উৎসবের চারটি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পাওয়ায় সত্যি আমি অনেক আনন্দিত।
প্রামাণ্য চলচ্চিত্রটির বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানতে চাই...
হাউসের ধুয়া চলচ্চিত্রটি প্রাচীন লোকসংস্কৃতির একটি ধারা ধুয়া গান এবং একে কেন্দ্র করে গ্রামীণ জনপদের লোকজনদের উৎসাহ, উৎকণ্ঠা, সম্পৃক্ততা এবং এই গানটি কেন্দ্র করে পারস্পরিক আন্তরিকতা ও সম্প্রীতির সাথে মানুষের যাপিত জীবনের চিত্র তুলে আনা হয়েছে এবং এই গানের সাথে শিল্পীদের অতীত অভিজ্ঞতার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
কেন এই সাবজেক্ট বেছে নিলেন?
সত্যি কথা বলতে আমাদের লোকসংস্কৃতি নিয়ে আমার ভীষণ রকমের দুর্বলতা আছে। ছোটবেলায় যাত্রা গান, কিচ্ছা গান, লাচারি গান খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। আমার মনে হয়েছে এগুলো নিয়ে চলচ্চিত্রে কাজ করার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। সেই জায়গা থেকে এই সাবজেক্টটি বেছে নেওয়া।
নিজেদের তৈরি ক্রেনে হচ্ছে দৃশ্যধারণ
‘হাউসের ধুয়া’ নির্মাণের পেছনের গল্পটা কেমন ছিল?
এই গানগুলির পরিবেশনা একেবারে ছোটবেলায় আমি দেখেছি। আমার দাদাদের (দাদা,ও দাদার ভাইদের) একটি দলও ছিল, তারাও এই গানগুলি পরিবেশন করত। বড় হয়েও আমি দাদার কণ্ঠে অনেক ধুয়া গান (খালি গলায়) শুনেছি। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউট এ (চলচ্চিত্র অধ্যয়ন ও প্রশিক্ষণ) পড়ার সময় আমার শিক্ষক চলচ্চিত্র নির্মাতা শামীম আক্তার ম্যাম আমাকে লোকজ বিষয় নিয়ে কাজ করতে ব্যাপক উৎসাহ দেন। আমাদের এলাকার বড় ভাই রবিউল আলম এর পরামর্শে এই বিষয়টি নিয়ে পড়াশোনা শুরু করি। আমার সহপাঠী রুদ্র কাউসার এবং আগের ব্যাচের বড় ভাই দেবাশীষ দাস ব্যাপক ভাবে উৎসাহিত করেন। এরপর আমার বাবার সহযোগিতায় ধুয়া গানের একটি দলকে সংগঠিত করতে থাকি। এভাবেই আমার একটি দীর্ঘ সময় পার হতে থাকে ধুয়া শিল্পীদের সঙ্গে। এরপর তৃতীয় সেমিস্টারে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করতে বলা হয় আমাদের, সেখানে আমি এই সাবজেক্টের প্রস্তাবনা দিই। আমার তত্ত্বাবধায়ক শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা মানজারে হাসীন মুরাদ স্যার, সাবজেক্ট পছন্দ করলেও সময় স্বল্পতা ও বাজেটের অপর্যাপ্ততার কথা বলে কাজটি খুবই চ্যালেঞ্জিং হবে বলেন। পরবর্তীতে আমি সেটিকেই চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলাম এবং স্যারের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজটি আমি সম্পন্ন করেছিলাম।
এটি নির্মাণের সময় কি ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছিল?
নানান প্রতিকূলতার মধ্যে কাজটি সম্পূর্ণ করতে হয়েছে, বাজেটের স্বল্পতা তো ছিলই এ ক্ষেত্রে আমার বাবা বেশ ভালো অঙ্কের টাকা লগ্নি করেন। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউট এর ছাত্রদের একটি বড় দল চলচ্চিত্রটি নির্মাণকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়। প্রচণ্ড শীতের সময়ে কাজটি করতে হয়েছে এবং টিমের সকলের আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল আমার বাড়িতেই। আমার মা নিজেও ওতপ্রোতভাবে এই কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। চলচ্চিত্রটিতে একটি ক্রেন শট এর ব্যবহারের কথা বাবাকে শেয়ার করতেই তিনি আমাকে আশ্বস্ত করেন এবং দেশীয় প্রযুক্তিতে সুতার দিয়ে (বাঁশ কাঠের) একটি ক্রেন আমাকে বানিয়ে দেন। আমার বাবার ঐকান্তিক চেষ্টায় এবং শিল্পী ও কলাকুশলীদের আন্তরিকতায় কাজটি আমরা ভালোভাবেই সম্পূর্ণ করতে সক্ষম হই।
এই প্রামাণ্যচিত্র কি আন্তর্জাতিক মানের? নির্মাতা হিসেবে কি মনে করেন?
এটির মূল্যায়ন আমি নিজে করতে চাই না। এটির মূল্যায়ন করবেন দর্শক, সমালোচক, চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। তবে কাজটি যতটুকু পেরেছি টিমের সবাই যত্ন নিয়ে করার চেষ্টা করেছি।
সম্প্রতি আপনার ‘সোনার তরী’ নামের একটি প্রামাণ্যচিত্র সরকারি অনুদান পেল। সোনারতরীর বিষয়বস্তু নিয়ে জানতে চাই…
সোনার তরী চলচ্চিত্রটিও বাংলার লোকসংস্কৃতি নিয়েই। এটির পেছনেও বেশ লম্বা একটা সময় গবেষণা করতে হয়েছে আমাকে। আশা করি চলচ্চিত্রটি আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির স্বরূপ সন্ধানে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।
‘হাউসের ধুয়া’ প্রামাণ্য চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য
‘সোনারতরী’র নির্মাণ প্রক্রিয়া কবে নাগাদ শুরু হবে? এর কলাকুশলীদের সম্পর্কে জানতে চাই…
বর্ষার শুরুর দিকেই করার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু করোনার এই বৈরী পরিস্থিতির কারণে এখন ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না কবে নাগাদ কাজ শুরু করব। তবে পরিস্থিতির উন্নতি হলে খুব তাড়াতাড়ি কাজটি শুরু করব। আর ‘সোনার তরী’র শিল্পীরা সব স্থানীয় লোকজন আর কলাকুশলী আমার নির্বাচিত ব্যক্তিরা যারা অনেকেই আমার আগের চলচ্চিত্রটিতে কাজ করেছিলেন।
আপনি মঞ্চ অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, অভিনয় বাদ দিয়ে নির্মাণে এলেন কেন?
মঞ্চকে বাদ দিয়ে চলচ্চিত্রে এসেছি এটা একদমই ঠিক না। মঞ্চ আমার ভালোবাসার জায়গা আমি মঞ্চের সঙ্গে এখনো সম্পৃক্ত আছি। কাজ করছি আরণ্যক নাট্যদলের একজন নাট্যকর্মী হিসেবে। তবে হ্যাঁ চলচ্চিত্রে পড়াশোনার কারণে কিছুদিন দলে অনিয়মিত হয়ে পড়েছিলাম। আশা করি সামনে আবারও নিয়মিত হতে পারবো।
ভবিষ্যতে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের ইচ্ছে আছে কিনা?
অবশ্যই আছে, সেটির জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার চেষ্টা করছি। দেখা যাক চেষ্টার কতটা সফলতা আনতে পারি।