কর্তারা ফুলেফেঁপে কর্মীদের পোশাকে টান

রেলপথের পুনরুজ্জীবন এবং বাংলাদেশ রেলওয়েকে ঢেলে সাজানোর ঘোষণা দিয়ে ২০১১ সালের ডিসেম্বরে রেলপথ মন্ত্রণালয় নামে স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয় গঠন করা হয়। কিন্তু আগে-পরে মিলিয়ে সবশেষ গত ১১ বছরে রেলপথের উন্নয়নে সরকার ৭৫ হাজার কোটি টাকা খরচ করলেও লোকসান কমেনি বাংলাদেশ রেলওয়ের। গত অর্থবছরে শুধু রেলের পরিচালনেই লোকসান বা অপারেটিং লস হয়েছে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। দেশি-বিদেশি বিপুল বিনিয়োগের পরও রেলওয়ে লাভজনক না হওয়ার কারণ হিসেবে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও কেনাকাটায় সীমাহীন দুর্নীতি, অপরিকল্পিতভাবে প্রকল্প গ্রহণ ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতিকে দায়ী করা হচ্ছে। বছরখানেক আগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) রেলওয়ের দুর্নীতির ১০টি উৎস চিহ্নিত করে রেলপথ মন্ত্রণালয়কে প্রতিবেদন দিয়ে ১৫ দফা সুপারিশও করেছে। কিন্তু দুর্নীতির তদন্তে রেলের বড় কর্তাদের কারোর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। দুর্নীতির চালচিত্রও পাল্টায়নি।

বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত নানা প্রতিবেদন থেকে বোঝা যায় রেলওয়েতে দুর্নীতির সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন ব্যয়। এরপর রয়েছে রেলের জমি ও সম্পদের অপব্যবহার ইত্যাদি। একইসঙ্গে রেলওয়ের কেনাকাটায় দুর্নীতি বহুল আলোটিত একটি বিষয়। কেনাকাটায় রেলের দুর্নীতি যে কতটা মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে সেটা জানা যাচ্ছে রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির কাছ থেকেই। গত বছরের অক্টোবরে রেলের টেন্ডার প্রক্রিয়ার দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে একটি উপকমিটি গঠন করে সংসদীয় কমিটি। সেই সূত্রে জানা যায়, দরপত্রের মাধ্যমে কেনাকাটা (এলটিএম) পদ্ধতিতে একটি চক্র সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে বলে তাদের কাছে তথ্য এসেছে। মোট ৩৮টি লাইসেন্সধারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এই কাজ করছে। তবে নামে ৩৮টি প্রতিষ্ঠান হলেও প্রকৃতপক্ষে ৫ থেকে ৭ জনই এসব প্রতিষ্ঠানের মালিক বাকিগুলো তাদের নিকটাত্মীয়দের নামে লাইসেন্স করা প্রতিষ্ঠান। পরষ্পরের যোগসাজশে রেলের কর্মকর্তা আর ঠিকাদাররা নানা অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে ফুলেফেঁপে উঠলেও কারোর বিরুদ্ধেই কোনো অভিযোগের বিচার হচ্ছে না। কোনো পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে তাদের দৌরাত্ম্য এমনই মাত্রাহীন হয়ে পড়েছে যে, এখন রেলওয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মীদের পোশাকেও টান দিচ্ছেন তারা!

মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরে ‘পোশাকের খবর নেই বিল তোলা সারা’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ রেলওয়ের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের পোশাক কেনাকাটায় দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মেডিকেল শাখার চতুর্থ শ্রেণির ২২৩ পরিচ্ছন্নতাকর্মীর বার্ষিক পোশাক সরবরাহ না করেই কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বিল উত্তোলন করে নিয়েছেন ঠিকাদাররা। উপরন্তু পোশাকের বদলে নগদ টাকা দিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন ঠিকাদার ও কর্মকর্তারা। সেখানেও পোশাকের জন্য প্রকৃত বরাদ্দের সমপরিমাণ টাকার বদলে অর্ধেক টাকা নিয়ে চুপ থাকতে চাপপ্রয়োগ করা হচ্ছে এই পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের। এসব নিয়ে মেডিকেল শাখার এই পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা গত সপ্তাহে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সদর দপ্তর সিআরবিতে বিক্ষোভ করেছেন। নিয়মানুযায়ী চতুর্থ শ্রেণির এই কর্মীদের এক বছর গ্রীষ্মকালীন পোশাক এবং আরেক বছর শীতকালীন পোশাক দেওয়া হয়। গ্রীষ্মকালীন পোশাকের জন্য কর্মীপ্রতি সব মিলিয়ে বরাদ্দ ৯ হাজার ৩০০ টাকা। আর শীতকালীন পোশাকের জন্য বরাদ্দ ৭ হাজার ৬০০ টাকা। এবার শীতকালীন পোশাক দেওয়ার কথা থাকলেও পোশাক না দিয়ে বরাদ্দের অর্ধেকেরও কম সাড়ে ৩ হাজার টাকা করে নিতে বলা হয় পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের। এই পরিস্থিতিতে করোনাকালে যথাযথ পোশাক ছাড়াই নিয়মিত কাজ করতে বাধ্য হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রেলের মেডিকেল শাখার এই পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা।

রেললাইন, স্টেশন, রেল-কারখানা এবং বিপুল জমিসহ বাংলাদেশ রেলওয়ের অবকাঠামোই এখনো দেশের সবচেয়ে বৃহত্তম অবকাঠামো। কিন্তু এতসব সম্পদ ও সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও রেলওয়ে যেমন লোকসান ঠেকাতে পারছে না তেমনি যাত্রী ও পণ্য পরিবহন সেবার মানোন্নয়ন কিংবা আয়বৃদ্ধি কোনোটাই করতে পারছে না। সংগত কারণেই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, রেলের উন্নতির অন্তরায় তাহলে কোথায়? কারা আটকে রাখছে রেলের অগ্রযাত্রা? গত এক দশকে রেলে ছোট-বড় ৬৪টি প্রকল্প সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭টি ২০০০ সালের পর নেওয়া হয়। বাকিগুলো আগেই নেওয়া হলেও শেষ হয়েছে ২০০৯ সালের পর। লক্ষ করার মতো বিষয় হলো রেলের যা কিছু বড় প্রকল্প তার প্রায় সব কটিই বিদেশি অর্থায়নে বাস্তবায়িত হয়েছে। বিদেশিদের উচ্চ সুদের ঋণে অবকাঠামো উন্নয়ন হচ্ছে আর সীমাহীন দুর্নীতি ও বিপুল অপচয়ের বোঝাটা জনগণের ঘাড়ে চাপছে। রেলওয়ের উচিত ছিল দুর্নীতি কমিয়ে যাত্রী ও পণ্য সেবা বাড়িয়ে নিজস্ব আয়বৃদ্ধির পথে হাঁটা। রেললাইন ও সেবা সম্প্রসারণ করা। কিন্তু সেই পথে না হেঁটে নীতিনির্ধারক আর বড়কর্তারা এখন রেলের জমি ভাড়া দেওয়া, পাঁচতারা হোটেল, হাসপাতাল ও শপিং মল নির্মাণ করে আয় বাড়ানোর কথা ভাবছেন! অন্যদিকে, দুর্নীতি-অনিয়মের রাশ না টানায় জবাবদিহিহীন রেলে এখন নিজের কর্মীদের পোশাকেই টান পড়ছে।