আজ টিমসহ কানে সাদ-বাঁধন

প্রতিবার বিশ্বের অন্যতম চলচ্চিত্র উৎসব ‘কান’ অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের দর্শক অপেক্ষায় থাকে সমাপনী দিনের। কে কোন বিভাগে পুরস্কার জিতল সেটা জানার আশায়। যাদের একটু বেশি আগ্রহ তারা অপেক্ষা করে রেড কার্পেটে কোন তারকা কী পোশাক পরল সেটি দেখতে। কিন্তু এবারের চিত্র ভিন্ন। বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে দেশের একদল তরুণ শিল্পী-কলাকুশলী ফ্রান্সে বেশ আগেই পৌঁছে গেছেন। প্রথমবারের মতো কানের প্রতিযোগিতা বিভাগে অফিশিয়ালি সিলেকশন পেয়েছে দেশের তরুণ নির্মাতা আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের সিনেমা ‘রেহানা মরিয়ম নূর’। এর কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন জনপ্রিয় তারকা আজমেরী হক বাঁধন। কানের উদ্বোধনী দিনে তাদের অংশগ্রহণ করা নিয়ে অনেকের মধ্যে আগ্রহ কাজ করছিল। কিন্তু গতকাল বাংলাদেশ সময় বেলা সাড়ে চারটার দিকে কানের উদ্বোধনী দিনেই ফ্রান্স থেকে বাঁধন জানালেন তারা উদ্বোধনী দিনে অংশ নেবেন না। একেবারে ‘রেহানা মরিয়ম নূর’-এর উদ্বোধনী প্রদর্শনীর দিন অর্থাৎ আজ কানের লাল গালিচায় দেখা যাবে তাদের। কিন্তু তার আগে বাঁধন বেশ বিষন্নতায় ভুগছেন। কারণ কী? তিনি বলেন, ‘ঠিক মনও না, আসলে আমার শরীরটা খারাপ। সেটা এখানে এসে নয়, ঢাকা থেকেই। বলতে পারেন, কানের খবরটি পাওয়ার পর থেকে। শরীর খারাপ হলে তো মনটাও খারাপ থাকে। কভিড সিম্পটম নয় কিন্তু। এখানে আসার আগে টেস্ট করালাম। টানা ১০ দিন বাড়িবন্দি আছি। কানে যাব বলে গত ৫ জুলাই আবার টেস্ট করালাম। কভিড সিম্পটম নয়। আমার মূল সমস্যা হচ্ছে ক্রনিক ডিপ্রেশন। মানসিক চাপ এত বেশি নিয়ে ফেলেছি, রিকভার করতে পারছি না। বরং দিন যত যাচ্ছে, চাপটা আরও বাড়ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্যারিস শহরের অদূরে একটা বাংলো বাড়িতে ছিলাম। তার জন্যও মায়া জন্মে গেছে। পিছুটান বড় ভয়ংকর। সবচেয়ে বড় মায়ার জালটা তো ছিঁড়তে হলো ঢাকায়। বাচ্চাটা, বাবা আর মাকে রেখে এতগুলো দিন এতটা দূরে এসে আর তো থাকিনি। মায়া বড় কঠিন অসুখ। এখানে এসে এই বাড়িটাকেও কত আপন আর নিরাপদ মনে হয়েছে। কতগুলো দিন-রাত সাতজন মানুষ একসঙ্গে আছি। ঝগড়া, গল্প, অভিমান, উচ্ছ্বাস, উৎকণ্ঠা সবই ছিল এই দিনগুলোতে। এসব ফেলে আবার যেতে হচ্ছে নতুন শহরে, কান-তীরে। মায়ার তো আসলে শেষ নেই। এটাই বুঝি জীবন।’

ট্রেনে প্যারিস থেকে কানের দূরত্ব প্রায় ৭০০ কিলোমিটার। বাঁধন বললেন, ‘উদ্বোধনী আয়োজনে আমরা থাকছি না। সেজন্যই ট্রেন জার্নিটা বেছে নিলাম আমরা! উৎসবের নিয়ম হচ্ছে অফিশিয়াল সিলেকশনের অংশ আঁ সাতের্ঁ রিগায় চূড়ান্ত হওয়া সব ছবির নির্মাতা, প্রধান শিল্পী ও প্রযোজক স্বাভাবিক নিয়মেই উদ্বোধনী আসরে বিশেষ আমন্ত্রণ পান। আমরাও পেয়েছি। কিন্তু সেটাতে আমরা অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এই না যাওয়ার সিদ্ধান্ত কিন্তু টিম-সাদের টিম স্পিরিটের অন্যতম অংশ। আমরা শুরু থেকে এভাবেই চলছি। ভাবুন একবার, একসঙ্গে আমরা সাতজন মানুষ এলাম। এ পর্যন্ত আমাদের সবকিছু একসঙ্গে। কে ডিরেক্টর কে ডিওপি কে কত বড় তারকা সেটি এখানে একেবারেই বাক্সবন্দি বিষয়। কানের রীতি অনুযায়ী উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নিলে আমি, নির্মাতা আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ আর প্রযোজক জেরেমি চুয়া নিতে পারি এখনো। তাহলে আমাদের সঙ্গে যারা এতটা পথ এলেন সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার শৈব, কালারিস্ট চিন্ময়, প্রোডাকশন ডিজাইনার উজ্জ্বল, সিনেমাটোগ্রাফার তুহিন আর এক্সিকিউটিভ প্রডিউসার বাবু; তাদের কী হবে! তারা হোটেলে আর আমরা লাল গালিচায়, সেটিকে সাদ সমর্থন করেন না। সে জন্যই আমাদের এই সিদ্ধান্ত। এতে আমাদের মধ্যে কোনো দুঃখ নেই, বরং স্বস্তি আছে। আমি তো আর বাঁধন নেই, রেহানা বলছি।’

আজ কানের পালে দো ফেস্টিভ্যাল ভবনের সাল দুবুসি প্রেক্ষাগৃহে বেলা ১১টা ১৫ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় দুপুর ৩টা ১৫ মিনিট) প্রথম প্রদর্শন হবে ‘রেহানা মরিয়ম নূর’। তখন টিমসহ উপস্থিত থাকবেন বাঁধন। তিনি বলেন, ‘আজ কানে উপস্থিত থাকছি, এটা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। শুধু তাই নয়, ১৬ জুলাই আঁ সাতের্ঁ রিগা বিভাগের অ্যাওয়ার্ড ডিক্লারেশনের সময় বাংলাদেশ থেকে অডিয়েন্সে থাকব আমরা আটজন। এই সাতজনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে আমাদের সহ-প্রযোজক রাজীব মহাজনেরও।’

আঁ সাতের্ঁ রিগা বিভাগে আসলে একটি অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়। যেটা ১৬ জুলাই ঘোষণা করা হবে। মানে উৎসব শেষের আগের দিন। আর সেই অ্যাওয়ার্ডটি মূলত দেওয়া হয় সবগুলো ছবি থেকে সেরা অভিনয়শিল্পীকে। ফলে এই স্বীকৃতিটি অর্জন করা যেমন কঠিন, তেমন ওজনদারও। এবার সারা পৃথিবীর আড়াই হাজার সিনেমা থেকে এই বিভাগে জায়গা পেয়েছে মাত্র ৪৪টি। এর মধ্যে একটি হলো ‘রেহানা মরিয়ম নূর’। বাংলাদেশের প্রথম ছবি। এবারের আসরের এই বিভাগের একমাত্র সোনার হরিণটি আসতে পারে বাঁধনের হাতেই। তিনি বলেন, ‘এমনটা হলে সেটা আমার জন্য পরম পাওয়া। তবে এখানে অংশ নেওয়া প্রতিটি ছবিই এই পুরস্কারের দাবি রাখে। আমরাও প্রত্যাশা করছি। সাত সমুদ্র তেরো নদী ভেসে ভেসে আসার কারণটাও তাই। আমার শুধু একটু বাড়তি উদ্দেশ্য আছে, সেটি হলো বড়পর্দায় ছবিটি প্রথমবারের মতো দেখা! তবে যাই হোক অথবা না হোক অল ক্রেডিট গৌজ টু মাই ডিরেক্টর। ধরুন, আমিই পেলাম। একটু ফ্যান্টাসি করি, মনটাও ভালো না। সেরা পারফরমার হিসেবে আমি পেলাম স্বীকৃতিটা। কিন্তু সেটি তো নির্মাতা আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের পারফরম্যান্সের কারণে। আমি তো তার চাওয়াটাকে অনুসরণ করেছি মাত্র। আর কিছুই করিনি। ফলে সেরার স্বীকৃতি পেলেও সেটির মালিক আসলে আমি নই। সাদ ও তার পুরো টিমের ফসল সেটি।’