ব্রাজিল ফুটবলের ইতিহাস, ঐতিহ্য, গরিমা বা আবেগ যাই বলুন, তা মারাকানা স্টেডিয়াম। এই ঐতিহ্য দেশটিকে যেমন দু’হাত ভরে দিয়েছে, আবার দুঃখের সাগরেও ভাসিয়েছে। মারাকানায় চারটি ফুটবল আসরের ফাইনাল খেলেছে ব্রাজিল। তার মধ্যে জিতেছে তিনবার। একটি করে কোপা আমেরিকা, অলিম্পিক ফাইনাল, কনফেডারেশন্স কাপ সেলেকাওরা জিতেছে বিশাল এই স্টেডিয়ামের সবুজ গালিচায়। কিন্তু সবচেয়ে দামি যে ট্রফি, বিশ্বকাপ, তা জেতা হয়নি। ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপ দিয়ে শুরু এই মারাকানায় ফাইনালে উঠেছিল ব্রাজিল। কিন্তু উরুগুয়ের কাছে হেরে কেঁদেছে তারা। তাই ব্রাজিলের জন্য মারাকানা যেমন সুখের উদাহরণ, তেমনি দুঃখেরও।
আর আর্জেন্টিনার! মারাকানা আলবিসেলেস্তেদের যে কিছুই দেয়নি। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে বিশ্বকাপ হারের বেদনায় নীল হন লিওনেল মেসিরা। আর্জেন্টিনা ওই একবারই মাঠটিতে ফাইনাল খেলে। অবশ্য এক ম্যাচের হিসাবে তো আর পাওয়া-না পাওয়ার খতিয়ান হয় না। এরপর রবিবার ভোরে মারাকানায় দ্বিতীয় ফাইনাল খেলতে নামছে আর্জেন্টিনা। এবার কোপা আমেরিকায়। আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় আর ব্রাজিলের পঞ্চম। এখন দেখার ব্যাপার, দ্বিতীয় দেখায় মারাকানা মেসিকে দু’হাত ভরে দেয় না ব্রাজিলকেই আবার মাথা উঁচু করে আসর শেষের সুযোগ দেয়।
দেশের হয়ে শিরোপা জেতা সব ফুটবলারেরই চাওয়া। তারকা ফুটবলারদের জন্য সেই চাওয়াটা আরও বেশি। লিওনেল মেসির যে আক্ষেপটা ক্যারিয়ারজুড়েই। আর্জেন্টিনার হয়ে অলিম্পিক সোনা জিতেছেন ২০০৮-এ। কিন্তু এরপর অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘই হচ্ছে। সময়ের সেরা প্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো দেশের জার্সিতে একটি নয়, দুটি শিরোপা জিতেছেন। ২০১৬ ইউরো এবং ২০১৮ ইউরোপিয়ান নেশন্স কাপ। কিন্তু মেসির যে তিন ফাইনালে (২০১৫, ২০১৬ কোপা আমেরিকা; ২০১৪ বিশ্বকাপ) উঠেও হাত শূন্য। তার চেয়ে তরুণ নেইমারও দেশের হয়ে শিরোপা জিতেছেন। মেসির মতোই অলিম্পিক স্বর্ণ। ২০১৬ অলিম্পিকে নিজেদের ঐতিহ্য মারাকানাতেই জার্মানিকে পেনাল্টি শুটে হারিয়ে। মারাকানায় ব্রাজিলের তা তৃতীয় ফাইনালে দ্বিতীয় শিরোপা। এর আগে ২০১৩ কনফেডারেশন্স কাপে স্পেনের বিপক্ষে ৩-০। আর সবশেষ ২০১৯-এ কোপা আমেরিকায় পেরুর বিপক্ষে ৩-১ গোলে।
চলতি কোপায় মারাকানায় আবার ফিরছেন নেইমার ও মেসি। মারাকানায় নেইমার একবার নেমে একবারই জিতেছেন। কিন্তু মেসি একবার নেমে সেবারই হতাশ হয়েছেন। মেসির মারাকানা আক্ষেপ ২০১৪ সালে। খুব চেষ্টা করেও জার্মানিকে হারাতে পারেননি। নির্ধারিত সময় শেষে অতিরিক্ত সময়ের ১১৫ মিনিটে মারিও গোৎজের গোলে চতুর্থ বিশ্বকাপ হাতে তোলে জার্মানরা। মেসির শূন্যে চেয়ে থাকা সেদিন কোটি আর্জেন্টাইন ভক্তকে কাঁদিয়েছিল। ২০১৬ সালে ঠিক তার উল্টো হয় মারাকানায়। জার্মানির বিপক্ষেই অলিম্পিক ফাইনালে নেইমারের পেনাল্টি গোলে ৫-৪ ব্যবধানে জিতে স্বর্ণপদক নিশ্চিত হয় ব্রাজিলের। দেশের হয়ে প্রথম শিরোপা জয়ের আনন্দে নিজে তো বটেই কোটি ব্রাজিল সমর্থককে কাঁদিয়েছেন নেইমার। কোপার ফাইনাল উপলক্ষে দুই মহাতারকা ফিরছেন মারাকানায়। দ্বিতীয়বারে কার চোখে জল আর কার ঠোঁটে হাসি সেটাই দেখার অপেক্ষায় পুরো ফুটবলবিশ্ব।
তবে আক্ষেপ থাকবে এক জায়গায়। মারাকানা যে আজ থাকবে শূন্য। মেসি-নেইমারের খেলা চাক্ষুষ দেখার সুযোগ থাছে না কারও। এর জন্য দায়ী করোনাভাইরাস। করোনার কারণেই প্রায় ৮০ হাজারের বেশি দর্শক ধারণক্ষমতার মারাকানার গ্যালারি থাকবে খালি। তবে এ নিয়ে ব্রাজিলের মন খারাপের কারণ নেই। আসরটিই তো হওয়ার কথা ছিল না তাদের মাটিতে। করোনার কারণেই ব্রাজিলে হচ্ছে ৪৭তম কোপা। দৈবক্রমে মেসি-নেইমার যে মারাকানায় নামছেন সেটাই তো ঢের বেশি।